দ্রুততার দৃষ্টান্ত ফিরুক
প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের মানুষের বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ছাদে নিয়ে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেওয়া হয়। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় চিকিৎসাধীন থাকার পর ১০ এপ্রিল সে মৃত্যুবরণ করে। একটি তরুণ প্রাণের এমন নির্মম পরিণতি দেশবাসীকে স্তম্ভিত করে। এই মামলার বিচারিক আদালতের দ্রুততা ছিল আশাব্যঞ্জক। নুসরাতের মৃত্যুর পর তার ভাই মামলা করেন। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন, পিবিআই মাত্র ৩৩ কার্যদিবসে তদন্ত শেষ করে। ২৯ মে ২০১৯ পিবিআই ৮০৮ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র জমা দেয়। এতে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদদৌলাসহ ১৬ জনকে আসামি করা হয়। ১০ জুন অভিযোগপত্র আমলে নেওয়া হয়। ২০ জুন ১৬ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। অর্থাৎ হত্যাকাণ্ডের মাত্র ২ মাসের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে বিচার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। এর পরও মামলার বিচার থেমে থাকেনি। দ্রুততার সঙ্গে সাক্ষ্য গ্রহণ হয়েছে। মামলায় মোট ৯২ জন সাক্ষী ছিলেন। তাদের মধ্যে ৮৭ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। সাক্ষ্য গ্রহণ এবং উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হয় মাত্র ৬১ কার্যদিবসে। ৩০ সেপ্টেম্বর আদালত রায়ের দিন নির্ধারণ করেন। ২৪ অক্টোবর নির্ধারিত দিনেই রায় ঘোষণা করা হয়। বিচারিক আদালত ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। সে রায় নিয়ে নানা প্রশ্নও ছিল। হাইকোর্টের সাম্প্রতিক রায়ে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন দেখা গেছে। হাইকোর্ট দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন। চার আসামির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। ১০ আসামিকে খালাস দিয়েছেন। এর মাধ্যমে আদালত প্রমাণের ভিত্তিতে প্রত্যেক আসামির দায় আলাদাভাবে মূল্যায়নের গুরুত্বও তুলে ধরেছেন।
এ মামলার আরেকটি দিক আমাদের বিশেষভাবে ভাবতে হবে। বিচারিক আদালতের রায় হয়েছিল মাত্র ৬১ কার্যদিবসে। সে রায়ের পর হাইকোর্টে মামলাটি নিষ্পত্তি হতে প্রায় ৭ বছর লেগেছে। ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর ডেথ রেফারেন্সের নথি হাইকোর্টে পৌঁছেছিল। অথচ শুনানি শুরু হয়েছে ২০২৬ সালের ২৮ জুলাই। ১৭ কার্যদিবস শুনানির পর ২০ আগস্ট শুনানি শেষ হয়। এরপর ২৪ আগস্ট রায় ঘোষণা করা হয়েছে।
এ ব্যবধান আমাদের বিচারব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতার কথা মনে করিয়ে দেয়। একটি মামলার তদন্ত ও বিচারিক আদালতের বিচার যদি কয়েক মাসে শেষ করা সম্ভব হয়, তাহলে উচ্চ আদালতে সেটি নিষ্পত্তিতে সাত বছর লাগা কতটা যুক্তিসংগত, সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে উচ্চ আদালতের বিচার প্রক্রিয়ার নিজস্ব নিয়ম আছে। ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ক্ষেত্রে নথিপত্র পরীক্ষা করতে হয়। আসামিদের আইনি অধিকার নিশ্চিত করতে হয়। মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুতর সাজায় আদালতকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তাই শুধু সময়ের হিসাব দিয়ে উচ্চ আদালতের বিচারকে মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না। একই সঙ্গে অকারণে দীর্ঘসূত্রতাও গ্রহণযোগ্য নয়।
নুসরাত হত্যার বিচার আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। দ্রুত তদন্ত ও বিচার সম্ভব। প্রয়োজন সদিচ্ছা, দক্ষতা এবং দায়িত্বশীলতা। এ মামলার বিচারিক আদালত সে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। এখন আমাদের প্রত্যাশা আরও পরিষ্কার। হাইকোর্টের রায়ের পর যেসব আইনি প্রক্রিয়া বাকি আছে, সেগুলো দ্রুত শেষ করতে হবে। ন্যায়বিচার শুধু রায় ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চূড়ান্ত রায় কার্যকর হওয়াও ন্যায়বিচারের অংশ।
