হিমালয়ের বুক থেকে মৃত্যুর স্রোত

ডা. মাহতাব হোসাইন মাজেদ

প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নেপালের হিমালয়- প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের এক অনন্য প্রতীক। তুষারাবৃত পর্বত, গভীর উপত্যকা, নদী ও ঝরনার দেশ হিসেবে নেপাল বিশ্বের পর্যটক, পর্বতারোহী ও তীর্থযাত্রীদের কাছে দীর্ঘদিনের আকর্ষণ। কিন্তু ২০২৬ সালের ২৬ আগস্ট সেই হিমালয়ই যেন তার অন্য এক রূপ দেখাল। মুহূর্তের মধ্যে বরফ, পাথর, কাদা ও পানির ভয়ংকর স্রোত নেমে এসে বদলে দিল বহু জনপদের চেহারা। ধ্বংস হলো সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বসতি; বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল সীমান্তবর্তী অঞ্চল। ২৮ আগস্ট পর্যন্ত নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের হিসাবে, দেশটিতে ৪৬৯ জন নিহত এবং ৯৭৭ জন নিখোঁজ। চীনের তিব্বত অঞ্চলে আরও ৩ জন নিহত ও ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ফলে দুই অঞ্চল মিলিয়ে নিশ্চিত নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৭২, আর নিখোঁজ ১,৫৩৫ জন।

এ পরিসংখ্যান শুধু কয়েকটি সংখ্যা নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি জীবন, একটি অসমাপ্ত গল্প। আর নিখোঁজদের তালিকা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে- এ দুর্যোগের প্রকৃত মানবিক ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র হয়তো এখনও সামনে আসেনি।

২৬ আগস্ট সকালে নেপাল-চীন সীমান্তের হিমালয় অঞ্চলে আকস্মিকভাবে বরফ ও পাথরের বিশাল অংশ ধসে পড়ে। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে ভূমিকম্প বলে মনে করা হলেও পরবর্তী ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বড় ধরনের হিমবাহ-শিলা ধস থেকেই শক্তিশালী ভূকম্পন-সদৃশ কম্পন তৈরি হয়েছিল। স্যাটেলাইট বিশ্লেষণও বরফ ও পাথরের ধসকে ভয়াবহ জলপ্রবাহের সম্ভাব্য সূচনা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ ধসের ফলে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর, মাটি ও ধ্বংসাবশেষ নদীর দিকে নেমে আসে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং পরে সেই বাধা ভেঙে গেলে বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ দ্রুত ভাটির দিকে ছুটে যায়। এটাই পরিণত হয় ভয়াবহ হড়পা বান বা ফ্ল্যাশ ফ্লাডে। প্রাথমিক স্রোত লহেন্দে খোলায় প্রবেশ করে, সেখান থেকে ভোতে কোশি ও পরে ত্রিশূলী নদীতে পানি ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ বাড়ে। ত্রিশূলী নদীতে মাত্র ৩০ মিনিটে পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া যায়।

সাধারণ বন্যা ও হড়পা বানের মধ্যে বড় পার্থক্য হলো সময়। সাধারণ বন্যায় পানি ধীরে ধীরে বাড়তে পারে এবং মানুষ অনেক সময় আগাম প্রস্তুতির সুযোগ পায়। কিন্তু হিমবাহ-উদ্ভূত হড়পা বান অত্যন্ত দ্রুতগতির হতে পারে।এ ক্ষেত্রে পানি একা আসেনি। তার সঙ্গে ছিল পাথর, কাদা, বরফ, গাছপালা ও বিভিন্ন ধরনের ধ্বংসাবশেষ। ফলে প্রবাহটি কার্যত একটি চলমান ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।রাস্তা, সেতু, গাড়ি, বাড়ি ও নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন স্থাপনা এই স্রোতের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে উদ্ধারকারীদের জন্যও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

নেপালের এ বিপর্যয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রীর নিখোঁজ হওয়া।নেপালের পর্যটন বিভাগের ২৭ আগস্টের হিসাবে, ৩৪টি দেশের ৬৬৮ জন পর্যটকের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। তাদের মধ্যে ভারতের ১৭৭ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৯০ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪ জন, যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন এবং কানাডার ২৫ জন ছিলেন। তিব্বতের গ্যিরং এলাকায় আরও ৫৫৮ জন নিখোঁজ, যাদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। এ সংখ্যা দেখিয়ে দেয়, দুর্যোগটির প্রভাব শুধু স্থানীয় মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; আন্তর্জাতিক পর্যটন ও তীর্থযাত্রার ওপরও এর বড় প্রভাব পড়েছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি শুধু প্রাণহানি দিয়ে হিসাব করা যায় না। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও উৎপাদনব্যবস্থায় আঘাত দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষতি তৈরি করে। নেপালের জাতীয় পরিকল্পনা কমিশন ও জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে আলাদা সমীক্ষা শুরু করেছে। প্রাথমিক হিসাবে বন্যায় ১৫টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আনুমানিক ৪৩১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বন্ধ হয়ে গেছে। রাসুওয়াগাড়ি, চিলিমে ও সানজেন জলবিদ্যুৎকেন্দ্র বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অর্থাৎ দুর্যোগটি তাৎক্ষণিক প্রাণহানির পাশাপাশি নেপালের বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও দীর্ঘস্থায়ী চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

নেপালের দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি উদ্ধারকাজকে আরও জটিল করে তুলেছে। বন্যার পানিতে রাস্তা ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক এলাকায় স্থলপথে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। তবু সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য উদ্ধারকারী সংস্থার হাজারো সদস্য তল্লাশি ও উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছেন। ধ্বংসস্তূপ, কাদা ও বিচ্ছিন্ন যোগাযোগের কারণে অভিযান অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে। এদিকে নতুন করে বিপদের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। বন্যা ও ভূমিধসের ফলে সৃষ্ট একটি ব্যারিয়ার লেক বা বাধাপ্রাপ্ত হ্রদের পানির পরিমাণ ২৫ লাখ ঘনমিটারের বেশি হয়ে ওঠায় ভাটিতে নতুন বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতির কারণে কিছু এলাকায় উদ্ধার অভিযানও সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয় এবং মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এখানে বিজ্ঞানসম্মত সতর্কতা জরুরি। কোনো একটি নির্দিষ্ট হিমবাহ ধসকে সরাসরি এবং একমাত্র জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলা ঠিক হবে না। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে হিমালয়ের হিমবাহ ও পার্বত্য পরিবেশ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে- এ নিয়ে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের সতর্কতা রয়েছে। উচ্চ তাপমাত্রা বরফ গলার গতি বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে বরফ ও পারমাফ্রস্টের পরিবর্তন পাহাড়ের কিছু অংশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। এর ফলে হিমবাহ ধস, ভূমিধস, তুষারধস ও হিমবাহ-উদ্ভূত বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নেপাল গত প্রায় ৩০ বছরে তার হিমবাহের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে। এটি হিমালয়ের দ্রুত পরিবর্তিত পরিবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান। তাই নেপালের বর্তমান বিপর্যয়কে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখলে বৃহত্তর বাস্তবতাটি আড়ালে পড়ে যাবে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের সবচেয়ে ভয়ংকর বৈশিষ্ট্য হলো- একটি ঘটনা শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি বিপদের জন্ম হতে পারে। হিমবাহ ধস ও ভূমিধসের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে অস্থায়ী হ্রদ তৈরি হয়। সেই হ্রদের বাঁধ দুর্বল হলে হঠাৎ পানি বেরিয়ে গিয়ে দ্বিতীয় দফায় ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি করতে পারে। ২৮ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তে এমন একটি ব্যারিয়ার লেকের পানি বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে সতর্কতা জারি করা হয়। ফলে উদ্ধারকর্মীদের নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হয়েছে।

নেপালের এ ঘটনা শুধু নেপালের সমস্যা নয়। হিমালয়ের নদীগুলো ভারত ও বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত। ত্রিশূলী নদী পরবর্তী সময়ে নারায়ণী নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভারতে গ-ক নামে প্রবাহিত হয়। ফলে উজানের বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রভাব নিম্ন অববাহিকাতেও পড়তে পারে। ভারতের বিহার, উত্তর প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডের কিছু এলাকায় নদীর পানি বৃদ্ধির আশঙ্কায় মানুষ সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল।

বাংলাদেশের জন্যও এখান থেকে শিক্ষা নেওয়ার অনেক কিছু আছে। আমরা নদীমাতৃক দেশ। পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও উজানের পানির প্রবাহ—এসবের সঙ্গে আমাদের ভৌগোলিক সম্পর্ক রয়েছে। নেপালের এ বিপর্যয় থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো- দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধু উদ্ধারকারী বাহিনী শক্তিশালী করলেই হবে না; দুর্যোগের আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করতে হবে। হিমবাহ, হিমবাহ-সংলগ্ন হ্রদ ও পাহাড়ি নদীগুলো নিয়মিত স্যাটেলাইট ও ড্রোনের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। কোথায় নতুন হ্রদ তৈরি হচ্ছে, কোথায় বরফ বা পাহাড় অস্থিতিশীল, কোন নদীতে আকস্মিক পানি বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে- এসব তথ্য দ্রুত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজন স্থানীয় জনগণের জন্য কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা। মোবাইল বার্তা, সাইরেন, স্থানীয় প্রশাসন ও দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে প্রাণহানি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

মানুষ যতই প্রযুক্তিতে উন্নত হোক, প্রকৃতির শক্তিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাই উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশ ও ভূপ্রকৃতির সীমাবদ্ধতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে, পাহাড়ের স্থিতিশীলতা নষ্ট করে কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ করে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ উন্নয়ন সম্ভব নয়। নেপালের হিমালয় আমাদের জন্য তাই শুধু পর্যটনের সৌন্দর্য নয়; এটি একটি জীবন্ত পরিবেশব্যবস্থা, যার পরিবর্তনের প্রভাব বহু দূরের মানুষের জীবনেও পৌঁছাতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, নেপালের এই ভয়াবহ বিপর্যয়কে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর ভেতরে লুকিয়ে আছে পরিবর্তিত জলবায়ু, হিমবাহের দ্রুত পরিবর্তন, পাহাড়ের ভঙ্গুরতা এবং নদী অববাহিকার ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মতো গভীর বাস্তবতা। হিমালয়ের পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রভাব শুধু নেপালের সীমান্তে থেমে থাকবে না; এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে গোটা দক্ষিণ এশিয়ায়।

তাই এখন প্রয়োজন আবেগের চেয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক প্রস্তুতি, অপরিকল্পিত উন্নয়নের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা এবং দুর্যোগের পর প্রতিক্রিয়ার বদলে আগাম ঝুঁকি শনাক্ত ও মোকাবিলার সক্ষমতা গড়ে তোলা। হিমবাহ পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কতা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দায়িত্বশীল বসতি পরিকল্পনা, পাহাড় ও নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ সংরক্ষণ এবং আন্তঃদেশীয় দুর্যোগ সহযোগিতা- এসবকে সময়ের দাবি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

হিমালয় শুধু বরফে ঢাকা একটি পর্বতমালা নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের জীবন, জীবিকা, নদী ও পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই হিমালয়ের পরিবর্তনকে উপেক্ষা করা মানে নিজেদের ভবিষ্যৎ ঝুঁকিকেও উপেক্ষা করা। প্রকৃতিকে জয় করার অহংকার নয়- প্রকৃতিকে বোঝা, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা এবং দুর্যোগ আঘাত হানার আগেই প্রস্তুত হওয়াই এখন মানবতার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

 

লেখক : কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক