মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়া
মো. শাহিন আলম
প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
সম্প্রতি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যকার প্রস্তাবিত ‘মক্কা ডিফেন্স প্যাক্ট’ বা প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তিতে বাংলাদেশ যুক্ত হতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। যদিও এটি এখনও চূড়ান্ত নয় কিন্তু বিষয়টিকে ঢাকা অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখছে বলেই জানা গেলো। এরও আগে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির (বর্তমানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী-২) একটা সাক্ষাৎকারে এই আগ্রহের কথা প্রথম বলেছিলেন। সেই সাক্ষাৎকারের সূত্র ধরেই গত ২১ আগস্ট নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়ে দেন, মক্কা চুক্তির বিষয়টা তারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। তার তিন দিন পর মন্ত্রিসভায় রদবদল হলো, আর কবিরই পদোন্নতি পেয়ে হলেন প্রতিমন্ত্রী। নতুন চেয়ারে বসেই তিনি সেই একই কথা আরও দৃঢ় ভাষায় আবার বললেন। অর্থাৎ প্রতিবেশীর অস্বস্তি জানার পরও ঢাকা পিছু হটেনি।
এখন প্রশ্ন হলো, এ আগ্রহের পেছনে ঢাকা আসলে কী পেতে চাইছে এবং দিল্লির-ই বা অস্বস্তি কোথায়। ঢাকার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বাস্তব জায়গাটা শ্রমবাজার। বাংলাদেশের বিদেশগামী শ্রমিকদের অর্ধেকেরও বেশি কর্মরত উপসাগরীয় অঞ্চলে; শুধু সৌদি আরবেই বর্তমানে প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি বসবাস ও কাজ করছেন, যাঁরা প্রতিবছর পাঁচ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি রেমিট্যান্স দেশে পাঠান- জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি এই অর্থপ্রবাহ। সৌদি আরবের সঙ্গে নিরাপত্তা ও কৌশলগত সম্পর্ক যত গভীর হবে, ততই সেই শ্রমিকদের সুরক্ষা, নতুন নিয়োগের সুযোগ আর ভিসা-প্রক্রিয়া সহজ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। এটা কোনো বিমূর্ত কূটনৈতিক লাভ নয়, বরং লাখো পরিবারের রুটিরুজির সঙ্গে সরাসরি জড়িত একটা বিষয়। প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সৌদি সফরে যদি বিনিয়োগ বা শ্রমবাজার নিয়ে নতুন কোনো সমঝোতা হয়, সেটা এ বৃহত্তর সম্পর্ক-নির্মাণেরই স্বাভাবিক ফল হবে। এ সম্পর্কের গভীরতা শুধু বর্তমান শ্রমশক্তির সুরক্ষাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং জনশক্তি রপ্তানির চরিত্রটাও বদলে দিতে পারে। এত দিন বাংলাদেশ মূলত অদক্ষ বা স্বল্পদক্ষ শ্রমিক পাঠিয়ে এসেছে; কৌশলগত সম্পর্ক গভীর হলে মেগা প্রকল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি সেবা খাতে উচ্চদক্ষ পেশাজীবী নিয়োগে অগ্রাধিকার পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
পাশাপাশি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্কের গভীরতা বাড়লে সংকটকালেও ভিসা স্থগিত হওয়ার ঝুঁকি কমবে, নতুন শ্রম কোটা পাওয়াও সহজ হবে। আর যৌথ প্ল্যাটফর্মের সুবিধা নিয়ে আকামা বা বসবাস অনুমতি, বেতন কাঠামোর নিশ্চয়তা এবং কর্মক্ষেত্রের আইনি সুরক্ষা নিয়ে উচ্চপর্যায়ে আলোচনার পথও সহজ হয়ে ওঠবে।
দ্বিতীয় জায়গাটা মুসলিম বিশ্বের সংহতি, যাকে নিছক আবেগ বলে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।
প্রতিমন্ত্রী নিজে যেভাবে মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার কথা বলেছেন, তার একটা বাস্তব রাজনৈতিক মূল্যও আছে। বাংলাদেশের মতো মুসলিমপ্রধান একটা দেশে সরকারের প্রতি জনসমর্থন তৈরিতে এই ধরনের পদক্ষেপ কাজে লাগে, আর সেটাকে শুধু রাজনৈতিক কৌশল বলে খারিজ করে দেওয়াও ঠিক নয়, কারণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সংযোগ বাংলাদেশের সমাজে সত্যিকারের একটা জায়গা দখল করে আছে। পাশাপাশি বাস্তব কূটনৈতিক লাভও আছে।
মুসলিম বিশ্বের একটি প্রভাবশালী জোটের কাছাকাছি থাকলে ওআইসির মতো ফোরামে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর জোরালো হতে পারে, বিশেষত রোহিঙ্গা সংকটের মতো ইস্যুতে সমর্থন আদায়ে, যেখানে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মনোযোগ চাইছে। যদিও ওআইসি দীর্ঘদিন থেকেই প্রেসবিজ্ঞপ্তির বাইরে বাস্তব কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে, তারপরও একটি সীমিত ফোরামের সমর্থনও একেবারে মূল্যহীন নয়, বিশেষত যখন বিকল্প ফোরামের সংখ্যাও সীমিত।
তৃতীয় জায়গাটা হলো প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি। তুরস্কের ড্রোন ও অস্ত্র উৎপাদন শিল্পে যে অগ্রগতি হয়েছে, তার সঙ্গে সংযোগ বাংলাদেশের সামরিক আধুনিকায়নের জন্য একটা বাস্তব সুযোগ তৈরি করতে পারে। এখন পর্যন্ত এই খাতে বাংলাদেশ মূলত পশ্চিমা বা চীনা উৎসের ওপর নির্ভরশীল; তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এই নির্ভরতাকে বহুমুখী করার একটা পথ খুলে দিতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত স্বাধীনতার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
আসলে মক্কা চুক্তি নিছক সেনা মোতায়েনের বন্দোবস্ত নয়, বরং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও সরবরাহের একটা বড় বাজারও তৈরি করবে। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাত সেখানে শুধু সরঞ্জামের ক্রেতা নয়, বরং ইউনিফর্ম, বুট, প্রাথমিক চিকিৎসা সামগ্রী ও নানা লজিস্টিকস সহায়তা সরবরাহকারী হিসেবেও অংশ নেওয়ার সুযোগ পেতে পারে। সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, সীমান্ত পর্যবেক্ষণ ও অবকাঠামো রক্ষার কাজেও বাংলাদেশি প্রকৌশলী ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক বিশেষজ্ঞদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের পথ খুলতে পারে।
এর বাইরে কৌশলগত বিনিয়োগ ও যৌথ উদ্যোগের সম্ভাবনাও উপেক্ষা করার মতো নয়। সৌদি আরবের পিআইএফের মতো উপসাগরীয় সার্বভৌম সম্পদ তহবিলগুলো বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগ করছে, আর প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সম্পর্কের গভীরতা এই মূলধন বাংলাদেশে টেনে আনা সহজ করতে পারে। বিদ্যুৎ, অফশোর জ্বালানি অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য শক্তি ও অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলোর অন্যতম প্রধান উদ্বেগ খাদ্য নিরাপত্তা হওয়ায় বাংলাদেশ তাদের জন্য চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের একটা সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে, যা কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য একটা মোক্ষম সুযোগ।
পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা আর সহজ শর্তের ঋণপ্রাপ্তিও এই সম্পর্কের সম্ভাব্য লাভের তালিকায় থাকতে পারে। বিশ্ববাজারের অস্থিরতার সময় অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ নিশ্চিত রাখা বাংলাদেশের জন্য বরাবরই একটা চ্যালেঞ্জ; প্রতিরক্ষা অংশীদারদের জন্য সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ প্রায়ই বিলম্বিত মূল্য পরিশোধের সুবিধা বা বিশেষ ছাড় দিয়ে থাকে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে পারে। একইসঙ্গে মক্কা ব্লকের মূল চালিকাশক্তি সৌদি আরব হওয়ায় ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্টের মতো সংস্থা থেকে সহজ শর্তে উন্নয়ন ঋণ পাওয়াও তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
এ বিভিন্ন জায়গা একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, এর পেছনে অর্থনীতি, রাজনীতি আর নিরাপত্তা, তিন স্তরেই বাস্তব যুক্তি আছে। কিন্তু এই লাভের হিসাবের পাশে আরেকটা বিষয়ও রাখা দরকার যে, চুক্তিটা আসলে কী দিতে পারবে, তার সীমা কতটুকু।
মক্কা চুক্তির জন্ম যদিও আকস্মিক কোনো ঘটনায় নয়। গত কয়েক মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যা ঘটে চলেছে অর্থ্যাৎ ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত, গাজায় দীর্ঘায়িত যুদ্ধ, হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়া- এসব মিলিয়ে সৌদি নীতিনির্ধারকদের মনে একটা বিষয় দানা বেঁধেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র যাকে এত দিন প্রধান নিরাপত্তা নিশ্চয়তা বলে ধরা হতো, সেই নির্ভরতা এখন কতটা টেকসই। এই জায়গা থেকেই গত ৭ আগস্ট মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান একটা চুক্তিতে সই করে, যেখানে এই চুক্তিতে সাক্ষরকারী কেউ আক্রান্ত হলে সেটা বাকিদের ওপরও আক্রমণ বলে গণ্য হবে। এবং তিন দেশ তিন ধরনের শক্তি নিয়ে এসেছে আলোচনার টেবিলে, যেখানে সৌদির অর্থ, তুরস্কের প্রযুক্তি, পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা। কাগজে-কলমে এই মিলনটা তাই বেশ ভারী দেখায়।
তবু এই তিন দেশের মধ্যে সত্যিকারের অভিন্ন কোনো শত্রু আছে কি না, সে প্রসঙ্গ কিন্তু থেকেই যায়, আর সেই প্রসঙ্গের ওপরই নির্ভর করছে চুক্তিটা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে। এই চুক্তি স্বাক্ষরের পরও হুতিদের হামলা থামেনি। গত ১৪ আগস্ট আরামকোর একটি তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলা হয়েছে, আর ১৮ আগস্ট সৌদি নৌবাহিনীর জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে হুতিরা। অথচ এসব হামলার জবাবে তুরস্ক বা পাকিস্তানের সেনা মোতায়েনের কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। সুতরাং চুক্তির সামরিক অংশটা যে এখনও বাস্তবে পরীক্ষিত হয়নি, তা বলা যায়।
এখন বাংলাদেশ যদি এ চুক্তিতে যুক্ত হয়, তাহলে সেই বাস্তবতাও তার জন্য প্রযোজ্য হবে অর্থ্যাৎ কোনো আক্রমণের মুখে তাৎক্ষণিক সামরিক সহায়তার নিশ্চয়তা এখনই ধরে নেওয়ার কারণ নেই। যদিও শুরুতে এটা মূলত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় আর প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতার কাঠামো হিসেবেই কাজ করবে বলে ধারণা করা যায়, যা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
আরেকটা বাস্তবতা হলো উপসাগরীয় অঞ্চলের ভেতরকার নিজস্ব ফাটল। সৌদি আরব আর সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে বহুদিনের যে মতভেদ চাপা ছিল, মক্কা চুক্তির পর সেটা প্রকাশ্যে চলে এসেছে, কারণ আমিরাত ইসরায়েলের সঙ্গে যে ঘনিষ্ঠতা আড়ালে গড়ে তুলছিল, এই চুক্তি তাতে সরাসরি ধাক্কা দিয়েছে। এমনকি মিসরকে জোটে টানার প্রশ্নেও তিন প্রতিষ্ঠাতা দেশের মধ্যে মতের মিল নেই।
তবে এখানে একটা উপস্থাপনাগত বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। চুক্তিটিকে যদি নিছক একটা ইসলামিক ন্যাটো বা ধর্মভিত্তিক সামরিক ব্লক হিসেবে তুলে ধরা হয়, তাহলে তা অহেতুক মেরুকরণের জন্ম দিতে পারে এবং অমুসলিম প্রতিবেশী ও পশ্চিমা অংশীদারদের কাছে ভুল বার্তা যাবে। বরং এটাকে স্বার্থভিত্তিক অর্থনৈতিক-নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করাই কৌশলগতভাবে বিচক্ষণ হবে, যেখানে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও গোয়েন্দা সহযোগিতার দিকগুলো সামনে থাকবে, সামরিক মেরুকরণের বার্তা নয়। ঢাকা কীভাবে এ সম্পৃক্ততাকে ব্যাখ্যা করে, তার ওপরও অনেকখানি নির্ভর করবে বাকি বিশ্ব একে কীভাবে দেখবে।
প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, কারণ বাংলাদেশের সীমান্তের প্রায় পুরোটাই ভারতবেষ্টিত। নদী, সীমান্ত, বিদ্যুৎ, সড়ক, রেল, সমুদ্রবন্দর, উত্তর-পূর্ব ভারতের যোগাযোগ এবং নেপাল-ভুটানে বাংলাদেশের প্রবেশ- প্রায় সবক্ষেত্রেই ভারত অপরিহার্য। সুতরাং, ভৌগোলিক কারণে আমরা ভারতকে অস্বীকার করতে পারি না, এইটা সত্য। কিন্তু সম্পর্ক মানে তো একমুখীকরণ নয়, কিংবা আমরা কোনো করদণ্ডরাজ্যেরও অংশ নই। জুলাই-অভ্যুত্থান পরবর্তী লেন্সে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক স্বভাবতই নতুনভাবে রচিত হবে সেটাই স্বাভাবিক এবং জনমতের সঙ্গেও প্রাসঙ্গিক। এখন ভারতের অস্বস্তির জায়গাটা মূলত তুরস্ককে ঘিরে, কারণ তুরস্কের ড্রোন প্রযুক্তি সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার সময়ও পাকিস্তানের হাতে পৌঁছেছিল বলে জানা যায়। বাংলাদেশ যদি এমন একটা জোটে যুক্ত হয় যার একটা সদস্য দেশের সঙ্গে ভারতের নিজেরই উত্তেজনার ইতিহাস আছে, তাহলে দিল্লির চোখে সেটা একেবারে নিরপেক্ষ কোনো পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হবে না। এই বাস্তবতা মেনেই সিদ্ধান্তটা নিতে হবে- হয় সেই কূটনৈতিক ব্যয় মেনে নিয়ে, নয়তো আরও ধীরে, আরও যাচাই করে এগিয়ে।
ভারতের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও বৃহত্তর পশ্চিমা বিশ্ব এ পদক্ষেপকে কীভাবে দেখবে, সেই বিষয়টাও কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটা সংলাপ এরইমধ্যে চালু রেখেছে, আর পোশাকশিল্পের রপ্তানি বাজার হিসেবে পশ্চিমা বিশ্বের ওপর নির্ভরতাও দীর্ঘদিনের। এমন অবস্থায় মক্কা চুক্তিতে যুক্ত হওয়াকে যদি চীন-মধ্যপ্রাচ্য অক্ষের দিকে ঢাকার ঝুঁকে পড়া বলে ভুল বার্তা যায়, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠিত সম্পর্কগুলোতেও অহেতুক চাপ তৈরি হতে পারে। তাই নতুন এ সম্পৃক্ততার পাশাপাশি একটা স্পষ্ট জোট নিরপেক্ষতা বা কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের অবস্থান বজায় রাখা জরুরি, যেখান নতুন অংশীদারত্বে যুক্ত হওয়া মানে যেন পুরোনো অংশীদারত্ব থেকে সরে আসা বোঝানো না হয়।
সবমিলিয়ে হিসাবটা দাঁড়ায় শ্রমবাজার ও দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির সুরক্ষা, মুসলিম বিশ্বের সংহতির রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মূল্য, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও শিল্পে নতুন সংযোগের সুযোগ, আর সেই সঙ্গে বিনিয়োগ ও জ্বালানি নিরাপত্তার সম্ভাবনা—এই লাভগুলো বাস্তব এবং উপেক্ষা করার মতো নয়। কিন্তু এ লাভগুলো মিলবে ধীরে ধীরে, নির্ভর করবে সম্পর্ক কতটা যত্নের সঙ্গে গড়ে তোলা হয় তার ওপর, আর চুক্তির সামরিক প্রতিশ্রুতি এখনো যতটা অপরীক্ষিত এবং জোটের ভেতরকার টানাপোড়েন যতটা বাস্তব, ততটাই সতর্কতা দাবি করে। হুমায়ুন কবির নিজেও বলেছেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে জাতীয় স্বার্থ ও আঞ্চলিক পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। সেই কথাটা যদি সত্যিই কথার কথা না হয়ে বাস্তব নীতি হয়, তাহলে প্রশ্নটা ঘুরে দাঁড়াবে মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগ দেওয়া উচিত কি না, তা নয়; বরং কীভাবে, কতটা গতিতে, আর কোন কোন শর্তে যুক্ত হলে লাভের অংশটুকু সর্বোচ্চ আর ঝুঁকির অংশটুকু সর্বনিম্ন থাকে।
লেখক : কলামিস্ট
