একুশ শতকের উদ্ভিদ নিমগাছ

জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন

প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন, বিষাক্ত রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে মানবজাতি যখন চরম উদ্বেগে, তখন সমাধানের এক আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে হাজার বছরের প্রাচীন বৃক্ষ ‘নিম’। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যৌথভাবে একুশ শতকের জন্য নিমকে ‘শতকের সেরা উদ্ভিদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকতার যুগে মানুষের অতি-রাসায়নিক আসক্তি যখন পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ভারসাম্য নষ্ট করছে, তখন নিমের প্রাকৃতিক ঔষধি গুণ ও পরিবেশবান্ধব ভূমিকা একে মানবজাতির জন্য অন্যতম প্রধান আশীর্বাদে পরিণত করেছে।

দক্ষিণ এশিয়া বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের গ্রামীণ জীবনযাত্রায় নিমগাছ শত শত বছর ধরে পরিচিত হলেও বর্তমানে এর বৈশ্বিক গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। মানবকল্যাণে এর বহুমুখী ব্যবহারের জন্য আন্তর্জাতিক গবেষকমহল একে বর্ণনা করছেন ‘গ্রামের প্রাকৃতিক চিকিৎসালয়’ হিসেবে। নিম গাছের কোনো অংশই ফেলে দেওয়ার মতো নয়- এর পাতা, ছাল, শিকড়, কাঠ, বীজ এবং তৈল প্রতিটিতেই লুকিয়ে রয়েছে প্রফেশনাল বায়ো-অ্যাক্টিভ কম্পাউন্ড। নিমে পাওয়া গেছে ‘অ্যাজাডিরাকটিন’, ‘নিমবিন’, এবং ‘নিম্বিডিন’-এর মতো শক্তিশালী উপাদান, যা অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল, অ্যান্টি-ভাইরাল, অ্যান্টি-ফাংগাল এবং প্রদাহবিরোধী হিসেবে কাজ করে।

কৃষিক্ষেত্রে একুশ শতকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাসায়নিক সার ও বিষাক্ত কীটনাশকের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি দূর করা। ক্রমাগত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটি তার স্বাভাবিক প্রাণশক্তি হারাচ্ছে এবং খাদ্যশৃঙ্খলে বিষাক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতি মানবদেহে ক্যান্সারের মতো মারণব্যাধির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। গবেষকরা দেখাচ্ছেন, নিমভিত্তিক জৈব-কীটনাশক এ সমস্যার সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। নিমের বীজ ও পাতা থেকে উৎপাদিত নির্যাস ক্ষতিকারক পোকা দূর করতে পারলেও মৌমাছি বা অন্যান্য উপকারী পোকা কিংবা মাটির কোনো ক্ষতি করে না। নিম খৈল দিয়ে মাটি শোধন করলে নাইট্রোজেনের অপচয় রোধ হয় এবং মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়। একুশ শতকে জৈব কৃষির দ্রুত প্রসারে নিম হয়ে উঠেছে আধুনিক কৃষকদের মূল অস্ত্র।

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং প্রসাধনী শিল্পেও নিম তার অনন্য অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে।

বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার ডলারের ত্বকের যত্ন ও প্রসাধনী পণ্যে প্রাকৃতিক উপাদান হিসেবে নিমের প্রাধান্য দিন দিন বাড়ছে। ব্রণ, একজিমা, সোরিয়াসিস বা ত্বকের নানা সংক্রামক ব্যাধিতে নিমের কার্যকরী ক্ষমতা সর্বজনবিদিত। ডেন্টাল কেয়ারে নিম ডাল ও নির্যাস ব্যবহারে মুখের দুর্গন্ধ, দাঁতের ক্ষয় এবং মাড়ির রোগ দূর হয় নিমিষেই। বহু শতাব্দী ধরে প্রথাগত আয়ুর্বেদ ও ইউনানি চিকিৎসায় এর প্রাধান্য থাকলেও আধুনিক ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলো এখন অ্যান্টি-বায়োটিকের অল্টারনেটিভ বা বিকল্প হিসেবে নিমের উপাদান নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চালাচ্ছে। কৃত্রিম কেমিক্যালের ক্ষতিকর প্রভাব মুক্ত জীবনের সন্ধানে বিশ্বব্যাপী অর্গানিক ও ভেষজ পণ্যের যে বিশাল বাজার গড়ে উঠেছে, সেখানে নিম শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে।

পরিবেশগত দিক দিয়ে বিবেচনা করলেও একুশ শতকের জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় নিমের ভূমিকা অসাধারণ। নিম একটি দ্রুত বর্ধনশীল এবং প্রতিকূল পরিবেশসহনশীল গাছ। অত্যন্ত শুষ্ক মাটি, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং কম বৃষ্টিপাতের মধ্যেও এটি অনায়াসে বেঁচে থাকতে পারে। বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণে এটি অত্যন্ত দক্ষ এবং বাতাস বিশুদ্ধ রাখতে নিমের ঝোপালো ডালপালা বিপুল পরিমাণে অক্সিজেন নির্গমন করে। মরুকরণ রোধ, মাটির ক্ষয়পূরণ এবং বায়ুমণ্ডলের ক্ষতিকর দূষণ কমাতে গ্রামীণ ও নগর বনায়নে নিম গাছ রোপণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

একুশ শতকের অন্যতম প্রধান সংকট আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব বা ‘পেটেন্ট যুদ্ধ’। নব্বইয়ের দশকে ইউরোপ ও আমেরিকার বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিমের নির্যাস ও এর ব্যবহারিক প্রয়োগকে নিজস্ব পেটেন্ট হিসেবে নিবন্ধনের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সম্মিলিত আইনি লড়াইয়ের মুখে তা বাতিল হয় এবং নিম স্বীকৃত হয় পৃথিবীর মুক্ত প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে। এটি প্রমাণ করে যে, প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় নিমের বৈশ্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব কতটা অপরিসীম।

আমাদের দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক কল্যাণে নিমগাছের বিস্তার এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করতে পারে। রাস্তার দু পাশে, বাড়ির আঙিনায় ও অনাবাদী জমিতে নিম চাষ বাড়িয়ে শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়, বরং বাণিজ্যিক নিমভিত্তিক শিল্পের (যেমন : নিম তেল, অর্গানিক সার, ভেষজ সাবান, টুথপেস্ট) বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আত্মকর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে এটি হতে পারে নতুন এক অর্থকরী উপাদান। প্রকৃতি ও বিজ্ঞানের মেলবন্ধনে একুশ শতকের নতুন যাত্রায় প্রাকৃতিক প্রতিষেধক হিসেবে নিমগাছ মানবজাতিকে একটি সুস্থ, ভারসাম্যপূর্ণ ও বিষমুক্ত ভবিষ্যৎ গড়তে পথ দেখাচ্ছে।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়