পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা আলাদা
তৌসিফ রেজা আশরাফী
প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
একটি দেশের উন্নয়নকে বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো পরিসংখ্যানের দিকে তাকানো। প্রবৃদ্ধি কত, দারিদ্র্যের হার কত, মূল্যস্ফীতি কত, মাথাপিছু আয় কত, কর্মসংস্থান কত বেড়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কত, এসব সংখ্যা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতার একটি চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরে। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায় পরিসংখ্যানের এই বাংলাদেশ আর মানুষের প্রতিদিনের জীবনে দেখা বাংলাদেশ কি একই?
পরিসংখ্যান মিথ্যা বলে না। কিন্তু পরিসংখ্যান সব সত্যও বলে না। কারণ একটি সংখ্যার পেছনে থাকে লাখো মানুষের ভিন্ন ভিন্ন জীবন, ভিন্ন ভিন্ন আয়, ভিন্ন ভিন্ন ব্যয় এবং ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, দেশে দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এসেছিল। গ্রামীণ অঞ্চলে এই হার ছিল ২০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ।
এটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। কিন্তু পরবর্তী সময়ের কিছু গবেষণা আমাদের সামনে অন্য একটি চিত্রও হাজির করেছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) ও বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির সহায়তায় পরিচালিত একটি গবেষণায় পাঁচটি জেলার ৩ হাজার ১৫০টি পরিবারের তথ্য বিশ্লেষণ করে ২০২৪ সালে দারিদ্র্যের হার ২৩ দশমিক ১১ শতাংশে ওঠার চিত্র পাওয়া যায়। একই গবেষণায় খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ২০২২ সালের ৩৮ দশমিক ০৮ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ৪৬ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে।
অবশ্য এখানে একটি সতর্কতা জরুরি। বিআইডিএসের এই গবেষণাটি জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্যের সরকারি হিসাবের সরাসরি বিকল্প নয়। গবেষণাটি নির্দিষ্ট পাঁচটি জেলার ওপর পরিচালিত। তাই দুটি সংখ্যাকে সরাসরি তুলনা করে বলা ঠিক হবে না যে বাংলাদেশের জাতীয় দারিদ্র্য ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২৩ দশমিক ১১ শতাংশে উঠেছে। কিন্তু এটি যে একটি সতর্ক সংকেত, তাতে সন্দেহ নেই। কারণ দারিদ্র্য শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। দারিদ্র্য হলো মাসের শেষ সপ্তাহে বাজারের তালিকা ছোট হয়ে যাওয়া। দারিদ্র্য হলো সন্তানের চাহিদা আর পরিবারের সামর্থ্যের মধ্যে প্রতিদিনের হিসাব। দারিদ্র্য হলো অসুস্থতার সময় চিকিৎসা পিছিয়ে দেওয়া।
একটি পরিবারের হাঁড়িতে যখন খাবার কমে যায়, তখন অর্থনীতির বড় বড় সূচক তার কাছে ছোট হয়ে আসে। এখানেই আসে মূল্যস্ফীতির প্রশ্ন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দেশের সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্যেও মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চমাত্রায় থাকার চিত্র দেখা যাচ্ছে। অর্থনীতির ভাষায় ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ একটি নির্দিষ্ট সূচক। কিন্তু একজন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের কাছে মূল্যস্ফীতি কোনো শতাংশ নয়। সেটি হলো বাজারের ব্যাগে আগের চেয়ে কম পণ্য থাকা। অর্থনীতিবিদ মূল্যস্ফীতিকে শতাংশে মাপেন, সাধারণ মানুষ সেটিকে মাপে বাজারের ব্যাগে। একই টাকা দিয়ে যদি আজ একটি পরিবার গত বছরের তুলনায় কম চাল, ডাল, তেল, মাছ বা সবজি কিনতে পারে, তাহলে তার কাছে মূল্যস্ফীতির প্রকৃত অর্থ পরিসংখ্যানের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট। এখানে আমাদের উন্নয়নের ধারণাটিও নতুন করে ভাবতে হবে। জিডিপি বাড়া গুরুত্বপূর্ণ। মাথাপিছু আয় বাড়াও গুরুত্বপূর্ণ। অবকাঠামো নির্মাণও জরুরি। কিন্তু উন্নয়নের শেষ মানদণ্ড কি শুধু এগুলো?
একটি সেতু নির্মিত হয়েছে, একটি মহাসড়ক হয়েছে, একটি নতুন ভবন হয়েছে, একটি শিল্পকারখানা হয়েছে, এগুলো উন্নয়নের দৃশ্যমান চিহ্ন। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন করতে হবে, সেই উন্নয়ন সাধারণ মানুষের জীবনকে কতটা সহজ করেছে?
উন্নয়নের প্রকৃত পরীক্ষা হলো কত টাকা খরচ হয়েছে তা নয়, সেই ব্যয়ের পর একজন সাধারণ মানুষের জীবন কতটা সহজ হয়েছে।
এ প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয় খাদ্যনিরাপত্তা। কোনো পরিবার যদি নিয়মিত খাবার জোগাড় করতে পারে, তাহলে সেটি শুধু অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয় নয়, রাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তারও একটি সূচক। বিআইডিএসের গবেষণায় খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার যে ঊর্ধ্বমুখী চিত্র এসেছে, সেটি তাই বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। অন্যদিকে রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক বোঝার জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো দুর্নীতি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর ২০২৫ সালের জাতীয় খানা জরিপে দেখা গেছে, সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার অন্তত একটি সেবা খাতে দুর্নীতির অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতার কথাও জানিয়েছে।
এখানে পরিসংখ্যানটি শুধু একটি সংখ্যা নয়। এর পেছনে রয়েছে পাসপোর্ট করতে যাওয়া একজন মানুষ, জমির কাগজের জন্য ঘুরতে থাকা একজন নাগরিক, হাসপাতালে সেবা নিতে যাওয়া একটি পরিবার কিংবা সরকারি কোনো দপ্তরে কাজ করাতে গিয়ে হয়রানির শিকার হওয়া মানুষ।
দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি শুধু রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় নয় এর চেয়েও বড় ক্ষতি হলো নাগরিকের রাষ্ট্রের ওপর আস্থার ক্ষয় হওয়া।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাংলাদেশের অবস্থান খুব স্বস্তিদায়ক নয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতি ধারণা সূচক ২০২৫-এ বাংলাদেশের স্কোর ১০০-এর মধ্যে ২৪ এবং অবস্থান ১৮২ দেশের মধ্যে ১৫০তম।
এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কোন বাংলাদেশকে দেখব? একদিকে পরিসংখ্যানের বাংলাদেশ। সেখানে দারিদ্র্য কমেছে, উন্নয়ন হয়েছে, অর্থনীতির আকার বেড়েছে, অবকাঠামো উন্নত হয়েছে।
অন্যদিকে বাস্তবতার বাংলাদেশ। সেখানে বাজারের দাম নিয়ে উদ্বেগ আছে, খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে, কর্মসংস্থান নিয়ে দুশ্চিন্তা আছে, সরকারি সেবা পেতে হয়রানির অভিযোগ আছে।
এই দুই বাংলাদেশকে মুখোমুখি দাঁড় করানোই এই আলোচনার উদ্দেশ্য নয়। বরং দরকার পরিসংখ্যান ও বাস্তবতাকে একসঙ্গে দেখা।
কারণ পরিসংখ্যান ছাড়া রাষ্ট্র অন্ধ। আর মানুষের বাস্তবতা ছাড়া পরিসংখ্যান অসম্পূর্ণ। পরিসংখ্যান রাষ্ট্রের আয়না, কিন্তু মানুষের জীবন সেই আয়নার সামনে দাঁড়ানো বাস্তব মুখ।
তাই আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে শুধু জিডিপি, প্রবৃদ্ধি কিংবা অবকাঠামো নয়, মানুষের জীবনযাত্রার মানকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে আরও লক্ষ্যভিত্তিক করতে হবে। সরকারি সেবায় দুর্নীতি ও হয়রানি কমাতে হবে। একই সঙ্গে পরিসংখ্যান সংগ্রহ ও প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, নির্ভুলতা এবং জনগণের আস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, রাষ্ট্রকে শুধু জানতে হবে না কতজন মানুষ দরিদ্র; জানতে হবে কেন তারা দরিদ্র। শুধু জানতে হবে না মূল্যস্ফীতি কত; জানতে হবে কোন শ্রেণির মানুষের ওপর তার অভিঘাত কত বেশি। শুধু জানতে হবে না কতজন সরকারি সেবা পেয়েছে; জানতে হবে কতজন সেই সেবা পেতে গিয়ে হয়রানির শিকার হয়েছে।
কারণ একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই দৃশ্যমান হয়, যখন রাষ্ট্রের পরিসংখ্যান আর মানুষের অভিজ্ঞতার মধ্যে দূরত্ব কমে আসে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সরল বাংলাদেশ কতটা এগিয়েছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো বাংলাদেশের মানুষ কতটা স্বস্তিতে এগোতে পারছে। পরিসংখ্যানের বাংলাদেশ আমাদের সম্ভাবনার কথা বলে। আর বাস্তবতার বাংলাদেশ আমাদের দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়।
লেখক : কলামিস্ট ও লেখক
