সুশীল সমাজের নীরবতা ও নেতিবাচক প্রভাব
নাজমুল হাসান
প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
একটি সমাজে অন্যায় যতটা ভয়ংকর, তার চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে সেই অন্যায়ের সামনে নেমে আসা নীরবতা। কারণ অন্যায়কারীর শক্তি শুধু তার নিজের ক্ষমতায় তৈরি হয় না, বরং চারপাশের মানুষের চুপ থাকাতেও তৈরি হয়।
একজন মানুষ একা অন্যায় করে বেশিদূর যেতে পারে না, যতক্ষণ না তার আশেপাশের মানুষ না দেখার প্রবণতায় থাকে। আর যখন সেই নীরবতার তালিকায় সমাজের সচেতন ও দায়িত্বশীল মানুষগুলোর নাম যুক্ত হয়, তখনই প্রশ্ন ওঠে- আমাদের সুশীল সমাজ কি সত্যিই সমাজের বিবেক হিসেবে তার দায়িত্ব পালন করছে?
সমাজের শিক্ষিত মানুষ, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, অর্থনীতিবিদ এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে আমরা সমাজের সচেতন নাগরিক হিসেবে ধরে নিই। তাদের কাছ থেকেই সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার আর সত্যি কথা বলার সাহস আশা করে। কিন্তু এই মানুষগুলোই যখন ব্যক্তিস্বার্থ, রাজনৈতিক চাপ, সামাজিক বিভাজন এবং আমার কী? এ মানসিকতার কাছে নিজেদের সঁপে দেন, তখন শুধু কিছু মানুষ চুপ হয়ে যায় না- বরং পুরো সমাজের বিবেকটাই নীরব হয়ে পড়ে। আর এই নীরবতার সুযোগে সেই সমাজে ধীরে ধীরে গেড়ে বসে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার। দুর্বল হতে থাকে গণতন্ত্র।
এ সমস্যাগুলো শুধু কাগজে-কলমে থেকে যায় না, বাস্তবে সামাজিক পরিবর্তনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং সাধারণ মানুষের মনে হতাশা তৈরি করে। যারা প্রতিবাদ করতে চান, তারাও একসময় ভাবতে শুরু করেন- কথা বলে লাভ কী, যেখানে সমাজের বিবেকই চুপ। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হয় সাধারণ মানুষ। তারা হারায় তাদের ন্যায্য অধিকার, তাদের মনে জন্ম নেয় ভয় আর হতাশা। দুস্থ ও গরীব মানুষেরা এই পরিস্থিতিতে আরও পিছিয়ে পড়ে, কারণ তাদের হয়ে কথা বলার মানুষগুলোই সবচেয়ে নীরব অবস্থানে থাকেন।
যাদেরকে আমরা বিবেকের কণ্ঠস্বর বা আশার কণ্ঠ হিসেবে জানি, তাদের দীর্ঘদিনের এই নীরবতা থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নেয় ফ্যাসিবাদের মতো ভয়ংকর পরিস্থিতি। যা কোনোভাবেই সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্য ভালো ফল বয়ে আনে না। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, যেসব সমাজে বুদ্ধিজীবী আর সচেতন মানুষেরা সময়মতো মুখ খোলেননি, সেসব সমাজে অন্যায় আর অব্যবস্থাপনা একসময় স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়ে গেছে।
তাই গণতন্ত্রকে সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী করতে হলে সুশীল সমাজকে ভয়, স্বার্থ ও সুবিধাবাদের ঊর্ধ্বে উঠে কথা বলতে হবে। শুধু আলোচনা সভা বা লেখালেখির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, বাস্তব পরিস্থিতিতেও পাশে দাঁড়াতে হবে সাধারণ মানুষের। সমাজের নীরব দর্শক হয়ে থাকলে চলবে না, বরং সমাজের বিবেক হয়ে দাঁড়াতে হবে। কারণ একটি সমাজ ততদিনই নিরাপদ, যতদিন তার বিবেকবান মানুষেরা সত্য বলার সাহস রাখেন।
লেখক : শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
