মেধাবী শিক্ষার্থীর পাশাপাশি অভিভাবকের স্বীকৃতিও জরুরি

নজরুল রাসেল

প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে মাধ্যমিক শিক্ষার মান, শিক্ষার্থীদের শিখনফল, মূল্যবোধ ও আচরণগত বিকাশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে| ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল সেই উদ্বেগকে আরও স্পষ্ট করেছে| সাধারণত এ অবস্থার জন্য আমরা শিক্ষাক্রম, পাঠ্যবই, মূল্যায়নপদ্ধতি কিংবা শিক্ষকের পেশাগত দক্ষতাকে দায়ী করি| এসব উপাদানের গুরুত্ব অবশ্যই রয়েছে; তবে শিক্ষাবিজ্ঞানের গবেষণা (ব্রনফেনব্রেনার, ১৯৭৯; এপস্টাইন, ২০১৮) দেখায়, একজন শিক্ষার্থীর বিকাশ কোনো একক প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভর করে না| পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক পরিবেশের সম্মিলিত প্রভাবেই শিশুর জ্ঞান, ব্যক্তিত্ব ও মূল্যবোধ গড়ে ওঠে| তাই শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে আলোচনায় পরিবারকে প্রান্তে রেখে টেকসই সমাধান খোঁজা সম্ভব নয়|

শিশুর প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তার পরিবার| ভাষা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা, অধ্যবসায়, সময়ানুবর্তিতা ও শেখার আগ্রহের ভিত্তি গড়ে ওঠে ঘরেই| ব্রনফেনব্রেনারের (১৯৭৯) পরিবেশগত ব্যবস্থা তত্ত্ব অনুযায়ী, শিশুর বিকাশে পরিবার সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ও প্রভাবশালী পরিবেশ| পাশাপাশি, ভিগোটস্কির (১৯৭৮) সামাজিক-সাংস্কৃতিক তত্ত্ব দেখায় যে, শিশুর জ্ঞানীয় বিকাশ সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটে এবং পরিবার সেই মিথস্ক্রিয়ার প্রথম ক্ষেত্র| এছাড়া, বান্দুরার (১৯৭৭) সামাজিক শিখন তত্ত্ব অনুসারে শিশুরা পর্যবেক্ষণ ও অনুকরণের মাধ্যমে আচরণ শেখে; ফলে দায়িত্বশীল, শৃঙ্খলাপরায়ণ ও শিক্ষাবান্ধব অভিভাবক নিজের অজান্তেই সন্তানের জন্য জীবন্ত পাঠ্যবই হয়ে ওঠেন| সুতরাং, একজন শিক্ষার্থী ভালো ফলাফল করলে তার পেছনে শিক্ষকের পাশাপাশি অভিভাবকের দীর্ঘমেয়াদি শ্রম, সময় ও মূল্যবোধগত বিনিয়োগও সমানভাবে কাজ করে| কিন্তু অভিভাবকের ক্ষেত্রে আমাদের সামাজিক স্বীকৃতির সংস্কৃতি এখনও সেই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়| আমরা সাধারণত ভালো ফলাফলকে শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত অর্জন কিংবা শিক্ষকের সাফল্য হিসেবে দেখি| অথচ গবেষণা বলছে, অভিভাবকের ইতিবাচক সম্পৃক্ততা শিক্ষার্থীর শিক্ষাগত অর্জন, আত্মবিশ্বাস, উপস্থিতি এবং দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত| হুভার-ডেম্পসি ও স্যান্ডলার (২০০৫) দেখিয়েছেন, সন্তানের পড়াশোনার খোঁজ নেওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, শেখার জন্য উৎসাহ দেওয়া এবং ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি করা-এসবই শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ| একজন সফল শিক্ষার্থীর পেছনে যেমন একদল নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক থাকেন, তেমনি থাকেন একজন সচেতন মা, দায়িত্বশীল বাবা এবং শিক্ষাবান্ধব পরিবার|

প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান সময়ে অভিভাবকের এই ভূমিকার গুরুত্ব আরও বেড়েছে| সারা বিশ্বেই স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন বিনোদন এবং ডিজিটাল বিভ্রান্তি শিশু-কিশোরদের মনোযোগ ও সময়কে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি প্রতিযোগিতার মুখে ফেলেছে| ইউনেস্কো (২০২১)-এর রিপোর্টে বলছে, যেসব পরিবার সন্তানদের প্রযুক্তি ব্যবহারে দিকনির্দেশনা দেয়, তাদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলে, পড়াশোনা ও বিনোদনের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করে, তাদের সন্তানদের শিক্ষাগত ও আচরণগত বিকাশ তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক হয়| তাই বর্তমানে সন্তানের জ্ঞান, শৃঙ্খলা ও মূল্যবোধ গঠনে অভিভাবকের ভূমিকা কমেনি; বরং বৃদ্ধি পেয়েছে|

বাংলাদেশের বাস্তবতায় অভিভাবকের এই ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ|

বিশেষ করে মাধ্যমিক স্তর এমন একটি সময়, যখন শিক্ষার্থীরা শৈশব থেকে কৈশোরে প্রবেশ করে এবং বয়ঃসন্ধিকালের প্রভাবে তাদের চিন্তা, আচরণ ও মূল্যবোধ দ্রুত পরিবর্তিত হয়| এই সময়ে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্দেশনা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পরিবারের ধারাবাহিক সহযোগিতা| একজন শিক্ষার্থী প্রতিদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কয়েক ঘণ্টা কাটায়, কিন্তু দিনের বড় অংশ কাটায় পরিবারের সঙ্গে| ফলে তার আচরণ, আত্মবিশ্বাস, পড়াশোনার অভ্যাস এবং নৈতিক বিকাশে পরিবারের প্রভাব অনিবার্য|

বাংলাদেশের পারিবারিক সংস্কৃতিতে, বিশেষ করে মায়েরা সন্তানের শিক্ষাজীবনে অসাধারণ অবদান রাখেন| মাকে বলা হয় সন্তানের প্রথম শিক্ষক| অনেক ক্ষেত্রে বাবারাও আর্থিক দায়িত্বের পাশাপাশি সন্তানের শিক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন| সন্তানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া, পরীক্ষার প্রস্তুতি, মানসিক সংকট মোকাবিলা, নৈতিক শিক্ষা, সময় ব্যবস্থাপনা- এসব ক্ষেত্রে তাঁদের অবদান বছরের পর বছর ধরে অব্যাহত থাকে| তাই, শিক্ষার্থীর সাফল্যকে শুধু তার ব্যক্তিগত মেধার ফল হিসেবে দেখা একটি অসম্পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি| সন্তানের একটি ভালো ফলাফলের পেছনে থাকে মা-বাবার দীর্ঘদিনের নীরব শ্রম| কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে এই নীরব শ্রম কখনোই দৃশ্যমান হয় না|

এই বাস্তবতা বিবেচনায় আমাদের মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পুরস্কার ও স্বীকৃতি প্রদানের প্রচলিত সংস্কৃতি নিয়ে নতুনভাবে ভাবার সময় হয়েছে| বর্তমানে অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের মেধাবী শিক্ষার্থীদের সম্মানিত করে, যা অবশ্যই প্রয়োজনীয়| কিন্তু একই সঙ্গে শিক্ষার্থীর সাফল্যের পেছনে থাকা পরিবারকেও স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি| শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারি উদ্যোগে প্রতি শিক্ষাবর্ষে মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকদের জন্যও 'সেরা মা', 'আদর্শ বাবা', 'সচেতন অভিভাবক', 'শিক্ষাবান্ধব পরিবার' কিংবা 'শিক্ষা বিকাশে অবদানকারী অভিভাবক'-এর মতো সম্মাননা চালু করা যেতে পারে| এটি শুধু প্রতীকী আয়োজন হবে না; বরং পরিবারকে শিক্ষার আনুষ্ঠানিক অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পদক্ষেপ হবে|

তবে এই স্বীকৃতি শুধু পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়| শিক্ষার্থীর শৃঙ্খলা, নিয়মিত উপস্থিতি, নৈতিক আচরণ, নেতৃত্বগুণ, সৃজনশীলতা, সহযোগিতামূলক মনোভাব এবং ধারাবাহিক উন্নয়নও মূল্যায়নের অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত| একই সঙ্গে সম্মাননার জন্য অভিভাবক নির্বাচন প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক| সীমিত আর্থিক সামর্থ্যের পরিবারও অনেক সময় অসাধারণ ত্যাগ স্বীকার করে সন্তানের শিক্ষাকে এগিয়ে নেয়| তাই এমন কোনো ব্যবস্থা করা যাবে না, যা সামাজিক বা অর্থনৈতিক বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দেয়| বরং এই উদ্যোগের লক্ষ্য হবে শিক্ষাকে নম্বরের সংকীর্ণ ধারণা থেকে বের করে আচরণ, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার বিস্তৃত পরিসরে নিয়ে যাওয়া| মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এ বিষয়ে একটি জাতীয় নির্দেশিকা প্রণয়ন করতে পারে, যাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অভিন্ন নীতিমালার আলোকে এ ধরনের কর্মসূচি পরিচালনা করতে পারে|

অভিভাবকের অবদানকে আনুষ্ঠনিক স্বীকৃতি দেওয়ার এই উদ্যোগের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে| আমরা জানি, সামাজিক স্বীকৃতি মানুষের অন্তর্নিহিত প্রেরণাকে শক্তিশালী করে এবং ইতিবাচক আচরণের পুনরাবৃত্তি ঘটায়| বান্দুরার (১৯৭৭) সামাজিক শিখন তত্ত্ব অনুযায়ী মানুষ অন্যের আচরণ দেখে শেখে এবং ইতিবাচক আচরণের সামাজিক স্বীকৃতি সেই আচরণকে আরও শক্তিশালী করে| যখন কোনো অভিভাবক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা সরকারের কাছ থেকে সম্মাননা পাবেন, তখন অন্য অভিভাবকেরাও সন্তানের শিক্ষাজীবনে আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হতে উৎসাহিত হবেন| একই সঙ্গে শিক্ষার্থীর কাছেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছাবে- তার সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি একটি পারিবারিক অর্জন|

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই উদ্যোগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অভিভাবকের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে| বর্তমানে অনেক অভিভাবকের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ শুধু ফল প্রকাশ, অভিযোগ বা শৃঙ্খলাজনিত ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ| অথচ যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়মিত ইতিবাচক স্বীকৃতির সংস্কৃতি গড়ে তোলে, তাহলে অভিভাবক নিজেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রকৃত অংশীদার হিসেবে মনে করবেন| এতে শিক্ষকের প্রতি আস্থা বাড়বে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-অভিভাবক যোগাযোগ জোরদার হবে এবং শিক্ষার্থীর সমস্যা সমাধানেও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া সহজ হবে|

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনও এই ধারণার পক্ষে শক্তিশালী যুক্তি দেয়| ওইসিডি (২০২১), ইউনেস্কো (২০২৪) এবং ইউনিসেফ (২০২৩) এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে অভিভাবকের সম্পৃক্ততাকে শিক্ষার মান উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে| অর্থাৎ পরিবারকে শিক্ষার আনুষ্ঠানিক অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব কোনো আবেগনির্ভর আহ্বান নয়; এটি আন্তর্জাতিক গবেষণা, নীতিগত চিন্তা এবং আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি বাস্তবধর্মী উদ্যোগ|

আর এই উদ্যোগ শুধু শিক্ষার্থীদের শিখনফল নয়, তাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্কেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে| বর্তমানে প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে পারিবারিক যোগাযোগের সময়ও কমিয়ে দিয়েছে| অনেক পিতা-মাতা কর্মব্যস্ত; অবসর সময়ে আবার স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা ডিজিটাল বিনোদন তাঁদের মনোযোগের বড় অংশ দখল করে রাখে| ফলে একই ছাদের নিচে থেকেও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অর্থবহ আলাপ, একসঙ্গে পড়াশোনা কিংবা শিক্ষাবিষয়ক আলোচনা ক্রমেই কমে যাচ্ছে| কাজেই, শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করলে সন্তানদের সঙ্গে অভিভাবকদের গুণগত সময়ের ব্যাপ্তি এবং শিক্ষাবিষয়ক আলোচনা বৃদ্ধি পাবে| ফলে সন্তান ও মা-বাবার পারস্পরিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে|

আমরা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার সংকটের সমাধান খুঁজেছি শিক্ষাক্রম, পাঠ্যবই, মূল্যায়নপদ্ধতি কিংবা শিক্ষক প্রশিক্ষণের মধ্যে| এগুলোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই| কিন্তু পরিবারকে শিক্ষার অন্যতম অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা না করলে সেই সংকটের সমাধান হবে না| একজন শিক্ষার্থী শুধু পাঠ্যবই থেকে শেখে না; সে পরিবার থেকেও শেখে| তাই শিক্ষার প্রকৃত সংস্কার শুরু হবে তখনই, যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকার পরিবারকে শুধু রেজাল্ট কার্ডের স্বাক্ষরকারী হিসেবে নয়, শিক্ষার সহযাত্রী হিসেবে বিবেচনা করবে| আজ আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শিক্ষাকে শুধু শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পরিবারকেন্দ্রিক একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়া| শিক্ষার্থীর সাফল্যে একই মঞ্চে সন্তানের পাশাপাশি তার মা-বাবার অবদানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি জানানো সেই আন্দোলনের একটি শক্তিশালী সূচনা হতে পারে|

 

লেখক : কলামিস্ট