বায়োটেকনোলজি : আগামীর শিল্পবিপ্লব
বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল
প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একসময় শিল্পবিপ্লব মানে ছিল বাষ্পীয় ইঞ্জিন, বিদ্যুৎ কিংবা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের আবিষ্কার| পরে তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন রূপ দান করে| এখন বিশ্ব পুনরায় আরেকটি বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে| সেটি হল জীবপ্রযুক্তি বা বায়োটেকনোলজির বিপ্লব| বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের অনেকেই মনে করছেন, আগামী কয়েক দশকে অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প উৎপাদন এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেবে বায়োটেকনোলজি|
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জিনোমিক্স, বায়োইনফরমেটিক্স, সিনথেটিক বায়োলজি এবং বায়োম্যানুফ্যাকচারিংয়ের সমন্বয়ে এমন এক নতুন শিল্পব্যবস্থা গড়ে উঠছে, যা শুধু উৎপাদনের ধরনই নয়, মানবজীবনের ভবিষ্যত বদলে দিবে| বায়োটেকনোলজি বলতে জীব, কোষ, অণুজীব কিংবা তাদের জৈব উপাদান ব্যবহার করে মানুষের প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা উদ্ভাবনের বিজ্ঞানকে বোঝায়| একসময় এর ব্যবহার সীমাবদ্ধ ছিল দই, পনির বা রুটি তৈরির মতো গাঁজনভিত্তিক প্রযুক্তিতে|
আজ সেই জীবপ্রযুক্তি ক্যান্সারের আধুনিক চিকিৎসা, জিন থেরাপি, উন্নত বীজ উদ্ভাবন, পরিবেশবান্ধব শিল্পপণ্য, জৈব জ্বালানি, বায়োপ্লাস্টিক এমনকি বিরল রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রেও অপরিহার্য হয়ে উঠেছে| অর্থাৎ, বায়োটেকনোলজি এখন আর একটি একক বৈজ্ঞানিক শাখা নয়; এটি ভবিষ্যতের অর্থনীতি ও শিল্পের ভিত্তি| কোভিড-১৯ মহামারি জীবপ্রযুক্তির শক্তিকে বিশ্ববাসীর সামনে নতুনভাবে তুলে ধরেছে| কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভাইরাসের জিনোম উন্মোচন, অল্প সময়ের মধ্যে এমআরএনএ-ভিত্তিক টিকা উদ্ভাবন এবং দ্রুত ডায়াগনস্টিক প্রযুক্তি উন্নয়নের মাধ্যমে জীবপ্রযুক্তি কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষা করেছে|
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বৈজ্ঞানিক সাময়িকী নেচারে প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখানো হয়েছে, আধুনিক জিনোম প্রযুক্তি ও বায়োটেকনোলজিতে দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ না থাকলে এত দ্রুত প্রতিক্রিয়া সম্ভব হতো না| এ অভিজ্ঞতা উন্নত দেশগুলোকে জীবপ্রযুক্তিতে আরও বেশি বিনিয়োগে উৎসাহিত করেছে| বর্তমানে শিল্প খাতেও এক নীরব বিপ্লব চলছে| প্রচলিত কারখানাগুলো যেখানে জীবাশ্ম জ্বালানি ও রাসায়নিকের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে নতুন প্রজন্মের বায়োম্যানুফ্যাকচারিং অণুজীব, এনজাইম এবং কোষ ব্যবহার করে ওষুধ, শিল্প রাসায়নিক, জৈব জ্বালানি, খাদ্য উপাদান ও পরিবেশবান্ধব কাঁচামাল উৎপাদন করছে|
এতে উৎপাদন ব্যয় কমে, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পায় এবং টেকসই শিল্পায়নের পথ তৈরি হয়| অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা মনে করে, শিল্প জীবপ্রযুক্তি আগামী দশকগুলোতে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে এবং বায়োইকোনমি হবে নতুন প্রবৃদ্ধির ভিত্তি| কৃষিক্ষেত্রে জীবপ্রযুক্তির অবদান আরও সুদূরপ্রসারী|
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে খরা, লবণাক্ততা, নতুন রোগবালাই ও উৎপাদন অনিশ্চয়তা বাড়ছে| এ বাস্তবতায় বিজ্ঞানীরা জীবপ্রযুক্তির মাধ্যমে এমন ফসল উদ্ভাবন করছেন, যা কম পানিতে টিকে থাকতে পারে, রোগ প্রতিরোধ করতে সক্ষম এবং অধিক ফলন দেয়| টিস্যু কালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে উন্নতমানের চারা উৎপাদন, জৈব সার ও জৈব কীটনাশকের ব্যবহার এবং অণুজীবভিত্তিক মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি, সবই আধুনিক জীবপ্রযুক্তির অর্জন|
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে টেকসই কৃষি নিশ্চিত করতে জীবপ্রযুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক প্রযুক্তি| চিকিৎসাবিজ্ঞানে জীবপ্রযুক্তি যেন এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে| ক্যান্সারের ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা , ইমিউনোথেরাপি, জিন থেরাপি এবং ক্রিসপার জিন সম্পাদনা প্রযুক্তির মাধ্যমে জিন সম্পাদনা এখন আর কল্পকাহিনি নয়; বাস্তব গবেষণাগার থেকে ধীরে ধীরে হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থায় প্রবেশ করছে| বিরল জিনগত রোগ নিরাময়ে জিনভিত্তিক চিকিৎসা নতুন আশা জাগাচ্ছে|
ভবিষ্যতে একজন রোগীর জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করে তার জন্য সবচেয়ে কার্যকর ওষুধ নির্বাচন করা সম্ভব হবে, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ধারণাকেই বদলে দিবে| জীবপ্রযুক্তির সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংযোগ এ পরিবর্তনকে আরও গতিশীল করছে| আজ কোটি কোটি জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ, নতুন ওষুধের সম্ভাব্য অণু শনাক্তকরণ, প্রোটিনের গঠন পূর্বাভাস এবং রোগের বিস্তার বিশ্লেষণে অও ব্যবহৃত হচ্ছে| ফলে ভবিষ্যতের জীবপ্রযুক্তি হবে তথ্যনির্ভর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সমৃদ্ধ এবং আরও দ্রুত উদ্ভাবনক্ষম|
বিশ্ব অর্থনীতিতেও জীবপ্রযুক্তির গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে| যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুর জীবপ্রযুক্তিকে কৌশলগত শিল্প হিসেবে বিবেচনা করছে| বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (উল্লেখ করেছে, টেকসই উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় জীবপ্রযুক্তি আগামী দশকের অন্যতম প্রধান প্রযুক্তি হবে| বাংলাদেশের জন্যও জীবপ্রযুক্তি একটি বড় সম্ভাবনা| দেশের ওষুধ শিল্প এরইমধ্যে শতাধিক দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে| কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো লবণাক্ততা ও রোগসহনশীল বিভিন্ন ফসলের জাত উদ্ভাবনে কাজ করছে|
টিস্যু কালচারের মাধ্যমে কলা, আলু, অর্কিডসহ বিভিন্ন উদ্ভিদের উন্নত চারা উৎপাদন বাড়ছে| একই সঙ্গে পাট থেকে পরিবেশবান্ধব জৈবপণ্য, বায়োফার্টিলাইজার এবং বায়োপেস্টিসাইড তৈরির গবেষণাও এগিয়ে চলছে| এসব উদ্যোগকে শিল্প পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারলে দেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে| তবে শুধু গবেষণাগার থাকলেই হবে না; প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ| বর্তমানে জীবপ্রযুক্তি এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে জীববিজ্ঞান, রসায়ন, কম্পিউটার বিজ্ঞান, পরিসংখ্যান এবং ডেটা বিশ্লেষণের সমন্বিত দক্ষতা প্রয়োজন| বিশেষ করে বায়োইনফরমেটিক্স, জিনোম ডেটা বিশ্লেষণ, বায়োস্ট্যাটিস্টিক্স, মেশিন লার্নিং এবং গবেষণা ব্যবস্থাপনায় দক্ষ তরুণদের চাহিদা বিশ্বজুড়ে বাড়ছে|
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তঃবিষয়ক শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ বাড়ানো গেলে দেশের শিক্ষার্থীরাও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করতে পারবে| বাংলাদেশের জন্য এখনই সময় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের| বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে আধুনিক গবেষণাগার স্থাপন, গবেষণায় সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্প-বিশ্ববিদ্যালয় সহযোগিতা, স্টার্টআপ সহায়তা এবং বায়োটেকনোলজি নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন অত্যন্ত প্রয়োজন| একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্কে অংশগ্রহণ এবং দক্ষ গবেষক তৈরির মাধ্যমে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় জীবপ্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে|
বাষ্পীয় ইঞ্জিন শিল্পযুগের সূচনা করেছিল, বিদ্যুৎ উৎপাদনকে গতিশীল করেছিল, আর তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্বকে ডিজিটাল যুগে নিয়ে এসেছে| এখন জীবপ্রযুক্তি সেই ধারাবাহিকতার নতুন অধ্যায়| এটি শুধু উন্নত ওষুধ, উচ্চফলনশীল ফসল কিংবা পরিবেশবান্ধব শিল্পপণ্যের প্রযুক্তি নয়; এটি একটি নতুন অর্থনীতি, নতুন কর্মসংস্থান এবং টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি| তাই বায়োটেকনোলজিকে শুধু একটি বৈজ্ঞানিক বিষয় হিসেবে নয়, জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে|
গবেষণায় বিনিয়োগ, উদ্ভাবনের পৃষ্ঠপোষকতা এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে পারলে বায়োটেকনোলজি সত্যিই হতে পারে আগামীর শিল্পবিপ্লবের প্রধান চালিকাশক্তি|
লেখক : শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ
