স্মার্ট কৃষির যুগে বাংলাদেশ
মো. বাইজিদ শেখ
প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলার দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ, যেখানে সবুজের সমারোহ আর কৃষকের লোনা ঘাম মিলেমিশে একাকার| ভোরের কুয়াশা চিরে যে মানুষটি কাঁধে লাঙল বা পাওয়ার টিলার নিয়ে মাঠে ছোটেন, তিনি আমাদের অন্নদাতা| যুগ যুগ ধরে প্রকৃতি আর মাটির সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকা এই কৃষকদের সামনে আজ এসে দাঁড়িয়েছে এক নতুন যুগের হাতছানি 'স্মার্ট কৃষি'| ড্রোন দিয়ে সার ছিটানো, সেন্সরের মাধ্যমে মাটির আর্দ্রতা মাপা কিংবা অ্যাপের মাধ্যমে ফসলের রোগ নির্ণয় শুনতে রূপকথার মতো মনে হলেও, এটাই এখন বিশ্বজুড়ে কৃষির ভবিষ্যৎ| কিন্তু আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, রোদ-বৃষ্টিতে পোড়া সেই প্রান্তিক কৃষকের সাথে এই আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধন কতটা বাস্তবসম্মত?
বাস্তবতার নিরিখে দেখতে গেলে, স্মার্ট কৃষির ধারণাটি যতটা চকচকে, আমাদের কৃষকের দৈনন্দিন জীবন ততটাই রূঢ়| যে কৃষক মহাজনের ঋণের দায়ে বা সারের বাড়তি দাম মেটাতে গিয়ে রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেন না, তার হাতে একটি স্মার্টফোন ধরিয়ে দিলেই কি তিনি 'স্মার্ট' হয়ে যাবেন? প্রযুক্তির সক্ষমতা কেবল একটি যন্ত্র থাকা নয়; সেটি ব্যবহার করার জ্ঞান, আর্থিক সামর্থ্য এবং সেই প্রযুক্তি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা থাকা|
বর্তমানে দেশের অনেক কৃষকের হাতে স্মার্টফোন পৌঁছেছে সত্য, কিন্তু ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাবে তার ব্যবহার কেবল কথা বলা বা বিনোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ| কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নানা অ্যাপ বা কল সেন্টার থাকলেও, মাঠপর্যায়ের একজন ষাটোর্ধ্ব কৃষকের পক্ষে সেই প্রযুক্তি সহজে আত্মস্থ করা কঠিন| ফসল যখন পোকার আক্রমণে নষ্ট হয়, তখন তিনি অ্যাপে ছবি তুলে পাঠানোর চেয়ে স্থানীয় কীটনাশক বিক্রেতার ওপরই বেশি ভরসা করেন| এখানেই আবেগ আর বাস্তবতার দ্বন্দ্ব| আমরা কৃষকের হাতে প্রযুক্তির জিয়নকাঠি তুলে দিতে চাইছি ঠিকই, কিন্তু তাকে সেই জিয়নকাঠি ব্যবহারের মন্ত্র শেখানোর জন্য যে দীর্ঘমেয়াদি, ধৈর্যশীল ও মমত্ববোধের কাঠামো প্রয়োজন, সেখানে আমাদের ঘাটতি রয়ে গেছে|
কৃষকের এই প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তাদের আইনি অধিকার ও সুরক্ষার বিষয়টি| প্রযুক্তির যুগে কৃষকের তথ্য ও অধিকার সংরক্ষণে আইনি কাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ|
প্রথমত, 'কৃষি বিপণন আইন, ২০১৮' অনুযায়ী কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে| স্মার্ট কৃষির একটি বড় সুবিধা হলো সরাসরি বাজার সংযোগ| কৃষকরা যদি অ্যাপের মাধ্যমে সরাসরি জানতে পারেন ঢাকার বাজারে আজ টমেটো বা বেগুনের দাম কত, তবে মধ্যস্বত্বভোগী বা সিন্ডিকেট তাদের ঠকাতে পারবে না| কিন্তু বাস্তবতা হলো, তথ্যের অভাবে কৃষকরা আজও মাঠে ফসল ফেলে কাঁদেন| প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষকের এ আইনি অধিকার অর্থাৎ ন্যায্যমূল্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে| দ্বিতীয়ত, তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ অনুযায়ী কৃষকের অধিকার রয়েছে সরকারি প্রণোদনা, সারের মজুত এবং আবহাওয়ার আগাম বার্তা জানার| স্মার্ট কৃষি ব্যবস্থা কৃষকের এই আইনি অধিকারকে হাতের মুঠোয় এনে দিতে পারে| কিন্তু যখন কোনো কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান বা এগ্রো-টেক কোম্পানি কৃষকের জমি, ফসলের ধরন বা উৎপাদনের ডেটা সংগ্রহ করে, তখন কৃষকের 'ডেটা প্রাইভেসি' বা তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো আমাদের নেই| কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো যেন প্রযুক্তি ব্যবহারের নামে প্রান্তিক কৃষকদের চুক্তিবদ্ধ কৃষিতে বাধ্য করে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না করতে পারে, সেদিকে আইনি নজরদারি জরুরি|
তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে স্মার্ট কৃষির অন্যতম অনুষঙ্গ হলো শস্য বিমা| প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলে কৃষক পথে বসেন| প্রযুক্তির সহায়তায় স্যাটেলাইট ডেটা বা ড্রোনের ছবি ব্যবহার করে দ্রুততম সময়ে ফসলের ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে কৃষকের বিমা দাবি মেটানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে| এটি কৃষকের প্রতি কোনো করুণা নয়, বরং তার অর্থনৈতিক সুরক্ষার আইনি অধিকার|
তবে আশার কথা হলো, বাংলাদেশের কৃষিতে এখন তরুণ প্রজন্মের আগমন ঘটছে| উচ্চশিক্ষিত তরুণেরা যখন কৃষিতে আসছেন, তারা সাথে করে নিয়ে আসছেন প্রযুক্তিগত সক্ষমতা| তারা ইন্টারনেট ঘেঁটে উন্নত জাতের বীজ আনছেন, ইউটিউব দেখে আধুনিক সেচ পদ্ধতি শিখছেন এবং ফেসবুক বা ই-কমার্স ব্যবহার করে সরাসরি ক্রেতার কাছে নিরাপদ খাদ্য পৌঁছে দিচ্ছেন| এ তরুণেরাই হতে পারে আমাদের কৃষির 'স্মার্ট' রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি| সরকার যদি সমবায়ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলে, তবে গ্রামের একজন শিক্ষিত তরুণ তার প্রযুক্তিগত জ্ঞান দিয়ে পুরো গ্রামের কৃষকদের সহায়তা করতে পারবেন| তখন আর প্রতিটি কৃষককে আলাদা করে ড্রোন বা সেন্সর কিনতে হবে না, বরং সমবায়ের মাধ্যমেই তারা প্রযুক্তির সুফল ভোগ করবেন|
স্মার্ট কৃষি কোনো জাদুর কাঠি নয় যে রাতারাতি সব বদলে যাবে| এর জন্য প্রয়োজন কৃষকের প্রতি রাষ্ট্রের গভীর মমত্ববোধ| প্রযুক্তি যেন কৃষকের ঘাড়ে নতুন কোনো বোঝা বা ভয়ের কারণ না হয়, বরং তা যেন হয় তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু| কৃষকের ঘামের প্রতিটি ফোঁটার আইনি ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন যেদিন প্রযুক্তির মাধ্যমে সুনিশ্চিত হবে, যেদিন মধ্যস্বত্বভোগীর শোষণের শিকল ভেঙে কৃষক সরাসরি তার পণ্যের দাম পাবেন সেদিনই বাংলাদেশ প্রকৃত অর্থে 'স্মার্ট কৃষির' যুগে প্রবেশ করবে|
মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষগুলোকে বাদ দিয়ে কোনো উন্নয়নই টেকসই হয় না| প্রযুক্তির আলোয় আলোকিত হোক আমাদের কৃষকের উঠোন, দূর হোক তাদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা| কৃষকের মুখে হাসি ফুটলেই হাসবে বাংলাদেশ|
লেখক : শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
