নদী ভাঙন ও চরাঞ্চলের মানুষ
শাহাদাৎ সরকার
প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
বর্ষার ঘোলা জল যখন দু-কূল উপচে পড়ে, শান্ত নদী তখন হয়ে ওঠে ভাঙনের নির্মম প্রতীক| দূর থেকে প্রমত্তা নদীর স্রোত যতই রূপময় মনে হোক, কূলবর্তী মানুষের কাছে তা আতঙ্কের নাম| থরথর করে কাঁপে নদীতীর আর তার সঙ্গে কাঁপে ভিটেমাটিতে আঁকড়ে থাকা প্রান্তিক মানুষের বুক| মুহূর্তের মধ্যে একখণ্ড আবাদি জমি, লালিত স্বপ্ন আর পূর্বপুরুষের স্মৃতির ভিটেমাটি বিলীন হয়ে যায় নদীগর্ভে| নদী ভাঙন বাংলাদেশের কোনো নতুন প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়| এটি নদীতীর ও চরাঞ্চলের লাখো মানুষের কাছে এক চিরন্তন দীর্ঘশ্বাস|
দেশের প্রমত্তা নদী যমুনা, পদ্মা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র এবং তিস্তা অববাহিকার কুড়িগ্রাম, সিরাজগঞ্জ, শরীয়তপুর ও চাঁদপুরের মতো জেলাগুলো প্রতি বছরই ভাঙনের চরম ঝুঁকিতে থাকে| সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (CEGIS) এবং আন্তর্জাতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নদী ভাঙনের ফলে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫০ হাজার থেকে ৬৮ হাজার মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়| তবে প্লাবনভূমি ও চরাঞ্চল মিলে পরোক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত ও নদী ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা বছরে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ পর্যন্ত ছাড়িয়ে যায়|
বিভিন্ন সরকারি ও পরিবেশ গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর দেশের নদীতীরবর্তী অঞ্চলে গড়ে প্রায় ৩ হাজার ২০০ হেক্টরের বেশি আবাদি ও বসতজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে| এই নদীগ্রাসে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও অবকাঠামো ধ্বংসের কারণে বার্ষিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা| এই ক্ষতি শুধু অর্থের হিসাব নয়| এটি একটি পরিবারের সঞ্চয়, একজন কৃষকের জমি এবং একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ হারানোর হিসাব|
নদী ভাঙনের নির্মম শিকার হয়ে বাস্তুচ্যুত এসব মানুষের অনেকেরই শেষ ঠাঁই হয় দেশের প্রধান শহরগুলোতে, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার কোনো স্যাঁতসেঁতে বস্তি, খাসজমি, ফুটপাত কিংবা দূরবর্তী কোনো বাঁধের ওপর| যাদের গ্রামে নিজস্ব খেতখামার ছিল, নদীভাঙনের পর তারাই হয়ে পড়েন নিঃস্ব দিনমজুর| গ্রামের স্বাভাবিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে উৎখাত হয়ে অচেনা শহরে টিকে থাকার এই অমানবিক লড়াই শুধু একটি পরিবারের জীবনযাত্রা বদলে দেয় না বরং তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও ঠেলে দেয় চরম অনিশ্চয়তার মুখে| ছিন্নমূল এসব পরিবারের শিশুরা শিক্ষার মৌলিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় এবং অল্প বয়সেই শিশুশ্রমে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়|
এখন প্রশ্ন ওঠে, দীর্ঘদিন ধরে চলা এই নদীভাঙনের স্থায়ী ও টেকসই প্রতিকার কি সত্যিই সম্ভব নয়? প্রযুক্তি ও জলবায়ু-বিজ্ঞানের এই যুগে নদী ভাঙন পুরোপুরি রোধ করা কঠিন হলেও এর ক্ষয়ক্ষতি বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব| কিন্তু নদীভাঙন মোকাবিলায় আমাদের ব্যবস্থাপনার অন্যতম দুর্বলতা হলো আমরা ভাঙন শুরু হওয়ার পর আপৎকালীন সাময়িক ব্যবস্থা নিই কিন্তু শুকনো মৌসুমে স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা বিজ্ঞানসম্মত দীর্ঘমেয়াদী মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে উদাসীন থাকি| বর্ষা মৌসুমে তড়িঘড়ি করে জিওব্যাগ ফেলে নদীর তাণ্ডব ঠেকানো যে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দিতে পারে না তা প্রতি বছরের অভিজ্ঞতাতেই বারবার প্রমাণিত হয়েছে|
বাস্তবতা হলো, নদী রক্ষা বাঁধের টেকসই সমাধানের পথে প্রকৌশলগত সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম ও দুর্নীতিও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে| বিভিন্ন নদী রক্ষা প্রকল্পে অনিয়ম, নিম্নমানের কাজ ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ দীর্ঘদিনের| স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে| বর্ষা শেষ হলে বা শুকনো মৌসুমে পরিকল্পিত ড্রেজিং ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের মতো দীর্ঘমেয়াদি কাজের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সংস্কারেই গুরুত্ব দেওয়া হয়| বর্ষা এলে জরুরি সংস্কারের নামে স্বল্পমেয়াদি ও নিম্নমানের কাজে অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও ওঠে| নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে নির্মিত দুর্বল বাঁধ পরবর্তী বর্ষার পানির চাপেই ক্ষতিগ্রস্ত বা ভেঙে পড়ে| ফলে প্রতিবছর বাঁধ মেরামতে সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও স্থায়ী সমাধান অধরাই থেকে যায় আর এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় নদীতীরের সাধারণ মানুষকে| এ অনিয়ম, রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী বলয় ও দুর্নীতির দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি| নদী ভাঙনের মতো দীর্ঘস্থায়ী দূর্যোগ মোকাবিলায় প্রথমত দুর্নীতি বন্ধে কঠোর জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে| নদী বাঁধ নির্মাণ, সংস্কার এবং ড্রেজিংয়ের প্রতিটি স্তরে পূর্ণ স্বচ্ছতা, ই-টেন্ডারিং এবং রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি| তদারকির দায়িত্ব শুধু স্থানীয় পর্যায়ের ওপর না রেখে পেশাদার প্রকৌশলী ও স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করতে হবে| দ্বিতীয়ত, ড্রেজিং বা নদী খনন প্রক্রিয়াকে সুনির্দিষ্ট ও বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে| নদীর নাব্যতা, প্রবাহপথ ও পলি ব্যবস্থাপনার বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ড্রেজিং করতে হবে| পরিকল্পিতভাবে প্রাথমিক ও নিয়মিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর নাব্য ফিরিয়ে এনে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহপথ বজায় রাখার উদ্যোগ নিতে হবে| উত্তোলিত পলি ও মাটির যথাযথ ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে| তৃতীয়ত, নদীর গতিপ্রকৃতি বুঝে স্থানীয় জনগণকে যুক্ত করে অংশগ্রহণমূলক বাঁধ রক্ষা ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন| নদীর পাড়ে স্থানীয় ও জলসহিষ্ণু উদ্ভিদ রোপণের মাধ্যমে প্রাকৃতিক প্রতিরোধও গড়ে তুলতে হবে| পাশাপাশি ভাঙনকবলিত এলাকার বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনে বিশেষ জলবায়ু তহবিল ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কার্যকরভাবে জোরদার করা আবশ্যক| এর পাশাপাশি ভাঙনপ্রবণ এলাকায় আগাম সতর্কতা ও ঝুঁকি মানচিত্র তৈরির মাধ্যমে মানুষকে সময়মতো নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে|
লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
