অন্ধকার অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি আর যেন না ঘটে
প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস ছিল ৩০ আগস্ট। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালিত হয় গুমের শিকার মানুষদের স্মরণ করতে। একই সথে গুমের মতো ভয়াবহ অপরাধ বন্ধে রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিতে এ দিবস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গুমের বিরুদ্ধে বিশ্বজনমত গড়ে তোলাও এ দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য। এ বছরের প্রতিপাদ্য ছিল 'ভিক্টিমস ফার্স্ট, অ্যাকশন্স নাউ'। অর্থাৎ ভুক্তভোগীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশের জন্য দিবসটির তাৎপর্য আরও গভীর। কারণ গত দেড় দশকে এ দেশে গুম ছিল ভয়াবহ রাজনৈতিক বাস্তবতা। শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা, কর্মী এবং ভিন্নমতের অনেক মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। অনেককে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয়েছে। এরপর তাদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। গুমের ভয়াবহতার সবচেয়ে নির্মম দিক হলো অনিশ্চয়তা। একজন মানুষ নিখোঁজ হলে তার পরিবার জানে না তিনি জীবিত নাকি মৃত। পরিবার স্বাভাবিকভাবে শোকও পালন করতে পারে না। সন্তানের কাছে বাবা ফিরে আসবেন কি না, স্ত্রী স্বামীকে আবার দেখতে পাবেন কি না, বাবা মা তাদের সন্তানকে ফিরে পাবেন কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর মেলে না। এই মানসিক যন্ত্রণা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে। এই অনিশ্চয়তা একটি পরিবারকে প্রতিদিন নতুন করে যন্ত্রণা দেয়। হাসিনা আমলের গুমের জন্য গোপন বন্দিশালা 'আয়নাঘর' নামে পরিচিতি পেয়েছে। সেখানে মানুষকে বছরের পর বছর আটকে রাখা হয়েছিল। কেউ কেউ গণঅভ্যুত্থানের পর ফিরে এসেছেন। অনেকে এখনও নিখোঁজ। আন্তর্জাতিক আইনেও গুমকে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম সনদের ৭(২) অনুচ্ছেদে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গুমকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ফলে গুমের ঘটনা তদন্ত করা এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাণীতে গুমের প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করে বিচার কার্যক্রম শুরু করার কথা বলা হয়েছে। একই সথে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য পৃথক আইনি কাঠামো তৈরির উদ্যোগের কথাও জানানো হয়েছে। গুমের ঘটনায় যারা সরাসরি জড়িত ছিলেন, তাদের পরিচয় ও রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনতে হবে। জবাবদিহির মুখোমুখি করতে হবে নির্দেশদাতা এবং সহযোগীদেরও। প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভবিষ্যতে কোনো সরকার যেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে গুমের মতো অপরাধ করতে না পারে। ক্ষমতা পরিবর্তনের সথে বিচার পরিবর্তন হলে চলবে না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক ব্যবহারের বাইরে রাখতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি। আদালতের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার সুরক্ষার ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস আমাদের সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়। কোনো রাষ্ট্রের ক্ষমতা মানুষের জীবনের চেয়ে বড় নয়। কোনো রাজনৈতিক মতের কারণে একজন মানুষ হারাতে পারেন না তার বাক ও চিন্তার স্বাধীনতা। বাংলাদেশের মাটিতে গুমের সেই অন্ধকার অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি আর যেন না ঘটে। কোনো পরিবারকে যেন আর কোনো দিন তার প্রিয়জনের অপেক্ষায় অনন্তকাল কাটাতে না হয়। এ জন্য শুধু বর্তমান অপরাধের বিচার যথেষ্ট নয়। এমন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় ও আইনি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে ভবিষ্যতের কোনো শাসক গুমকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সাহস না পান।
