শিশুর শৈশব যেন হারিয়ে না যায়
ওরাইনা খাঁন চৌধুরী
প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
যে হাতে আজ বই-খাতা থাকার কথা, সেই হাতে যদি জীবিকার বোঝা ওঠে, তবে শুধু একটি শিশুর শৈশব নয়, হারিয়ে যায় আমাদের ভবিষ্যতের একটি সম্ভাবনাও। কিন্তু বাস্তবতা সব সময় এত সুন্দর নয়। আমাদের চারপাশে তাকালেই দেখা যায়, অনেক শিশু বয়সের ভারে নয়, বরং জীবনের কঠিন বাস্তবতায় বড় হচ্ছে। কারও হাতে বইয়ের বদলে ইট, কারও হাতে চায়ের কাপ, আবার কেউ রাস্তায় ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করছে। যে বয়সে তাদের স্কুলে যাওয়ার কথা, সেই বয়সেই তারা পরিবারের জীবিকার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিচ্ছে। একটি শিশুকে যখন কাজ করতে দেখি, তখন আমরা হয়তো কয়েক মুহূর্তের জন্য তার প্রতি সহানুভূতি দেখাই। কেউ হয়তো তাকে কিছু টাকা দিই, কেউ খাবার কিনে দিই। কিন্তু এরপর আমরা নিজেদের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। অথচ সেই শিশুটির জীবনের গল্পটি হয়তো অনেক দীর্ঘ। তার হয়তো স্কুলে যাওয়ার ইচ্ছা আছে, বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে চায়, পরীক্ষায় ভালো করতে চায়। কিন্তু দারিদ্র্য, পারিবারিক অসচ্ছলতা কিংবা সামাজিক বাস্তবতা তার সেই স্বপ্নগুলোকে ধীরে ধীরে মুছে দেয়। শিশুশ্রম শুধু একটি শিশুকে কাজে যুক্ত করার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার ভবিষ্যৎ। একটি শিশু দীর্ঘ সময় কাজ করলে তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক শিশু কাজের কারণে স্কুলে ভর্তি হতে পারে না, আবার কেউ স্কুলে ভর্তি হলেও নিয়মিত উপস্থিত থাকতে পারে না। একসময় পড়াশোনার সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়। ধীরে ধীরে সে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে এবং একই ধরনের কাজের মধ্যে তার জীবন আটকে যায়। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, অনেক শিশুই এমন পরিবেশে কাজ করে যেখানে তাদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যের বিষয়টি খুব একটা গুরুত্ব পায় না। নির্মাণকাজ, কারখানা, ওয়ার্কশপ, হোটেল-রেস্তোরাঁ কিংবা বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুদের দেখা যায়। ভারী জিনিস বহন করা, দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা, ধোঁয়া বা ধুলোর মধ্যে কাজ করা- এসব তাদের শারীরিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর। শুধু শারীরিক ক্ষতিই নয়, এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুর মানসিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। প্রশ্ন হলো, শিশুরা কেন কাজে নামে? এর সবচেয়ে বড় কারণ নিঃসন্দেহে দারিদ্র্য। একটি দরিদ্র পরিবারে যখন বাবা-মায়ের আয় দিয়ে সংসারের প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে, তখন শিশুকেও কাজে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অনেক পরিবার হয়তো জানে, শিশুর পড়াশোনা প্রয়োজন; কিন্তু পেটের ক্ষুধার কাছে অনেক সময় সেই প্রয়োজন হার মানে। আবার কোথাও বাবা-মায়ের অসচেতনতা, শিক্ষার অভাব কিংবা পারিবারিক ভাঙনের কারণেও শিশুরা শ্রমে যুক্ত হয়।তবে শুধু দারিদ্র্যকে দায়ী করলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সমাজেরও এখানে বড় ভূমিকা রয়েছে। আমরা অনেক সময় কম মজুরিতে শিশু শ্রমিক নিয়োগকে স্বাভাবিকভাবে দেখি। হোটেলে, দোকানে কিংবা বাসাবাড়িতে শিশু কাজ করলে আমরা প্রশ্ন করি না। বরং কম খরচে কাজ করিয়ে নেওয়ার সুযোগ হিসেবে বিষয়টিকে দেখি। আমাদের এই মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। একটি শিশুকে কাজ থেকে সরিয়ে শুধু বাড়িতে পাঠিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ সে যদি আবার ক্ষুধার মুখোমুখি হয়, তাহলে হয়তো অন্য কোথাও গিয়ে কাজ শুরু করবে। তাই শিশুশ্রম বন্ধ করতে হলে পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করতে হবে। একই সঙ্গে শিশুর পড়াশোনার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য উপবৃত্তি, বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণ, খাবার এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা আরও কার্যকর করা দরকার। শিক্ষা একটি শিশুর ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। একটি শিক্ষিত শিশু শুধু নিজের জীবনই বদলায় না, ভবিষ্যতে তার পরিবার ও সমাজের জন্যও অবদান রাখে। তাই শিশুদের স্কুলে ফিরিয়ে আনা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র- সবার দায়িত্ব। শিশুদের অধিকার রক্ষায় আমাদের আইনও রয়েছে। বাংলাদেশে শিশুশ্রম নিরসনে বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুদের নিয়োগ নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু শুধু আইন থাকলেই হবে না, আইনের যথাযথ প্রয়োগও প্রয়োজন। অনেক সময় আইন থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগ দুর্বল হওয়ায় শিশুশ্রম পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয় না। তাই নিয়মিত তদারকি এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। আমাদের নিজেদের আচরণেও পরিবর্তন আনতে হবে। আমরা যখন কোনো দোকানে গিয়ে দেখি একটি শিশু কাজ করছে, তখন শুধু তার বয়স নিয়ে অবাক না হয়ে ভাবতে হবে- সে এখানে কেন? তার স্কুলে যাওয়ার সুযোগ নেই কেন? তার পরিবার কেন তাকে কাজে পাঠিয়েছে? এ প্রশ্নগুলোই হয়তো সমস্যাটিকে গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করবে। শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তারা কোনো সস্তা শ্রমের উৎস নয়; তারা ভবিষ্যতের নাগরিক। আজ যে শিশুটি রাস্তায় ফুল বিক্রি করছে, সে হয়তো সুযোগ পেলে একজন শিক্ষক হতে পারত।
যে শিশুটি হোটেলে কাজ করছে, সে হয়তো বড় হয়ে একজন সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী কিংবা উদ্যোক্তা হতে পারত।
লেখক : শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
