আবর্জনা থেকে সম্পদ, সবুজ অর্থনীতির নতুন দিগন্ত
সোমা ঘোষ মণিকা
প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে বর্জ্যকে আমরা সাধারণত পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের সমস্যা হিসেবে দেখি। অথচ এই বর্জ্যের মধ্যেই রয়েছে কাঁচামাল, জ্বালানি, জৈবসার, কর্মসংস্থান এবং নতুন শিল্প গড়ে তোলার সম্ভাবনা। নগরায়ণ ও ভোগের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে বর্জ্যও বাড়ছে। ফলে এখন প্রশ্ন শুধু 'বর্জ্য কোথায় ফেলব' নয়; বরং 'বর্জ্য থেকে কতটা সম্পদ উদ্ধার করা যাবে', সেটিই হওয়া উচিত নীতিনির্ধারণের অন্যতম প্রধান প্রশ্ন। একটি শহরের সকাল শুরু হয় পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের শ্রমে।
বাজার, রেস্তোরাঁ, হাসপাতাল, বাসাবাড়ি ও দোকান থেকে সংগৃহীত বর্জ্য সরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু বর্জ্য অদৃশ্য হয় না। এর বড় অংশ শেষ পর্যন্ত ভাগাড়ে গিয়ে জমা হয়। সেখানে খাদ্যবর্জ্য, কাগজ, প্লাস্টিক, কাচ ও ধাতু একসঙ্গে মিশে যায়। ফলে যে জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট বা বায়োগ্যাস তৈরি করা যেত, তা দূষিত হয়; পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক, কাগজ ও ধাতুও হারায় অর্থনৈতিক মূল্য।
এখানেই বৃত্তাকার অর্থনীতির গুরুত্ব। কোনো পণ্য ব্যবহারের পর তার উপাদানকে পুনর্ব্যবহার, পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ও সম্পদ পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে আবার উৎপাদন ব্যবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়াই এ অর্থনীতির মূল ধারণা। বাংলাদেশের জন্য এটি পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি একটি সম্ভাবনাময় শিল্পখাতও হতে পারে।
বাংলাদেশে প্রতিদিন মোট কত বর্জ্য উৎপন্ন হয়, এর একক ও সর্বজনস্বীকৃত সংখ্যা নেই। কারণ গবেষণাভেদে বর্জ্যের ধরন, পরিমাপের পদ্ধতি ও ভৌগোলিক আওতা ভিন্ন। ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বাংলাদেশের গবেষণার আওতাভুক্ত প্রধান শহরগুলোতে দৈনিক ১৬ হাজার ৬৭২ টনের বেশি বর্জ্য উৎপাদনের হিসাব পাওয়া গেছে। এর ৮৭ দশমিক ৭ শতাংশ পৌর কঠিন বর্জ্য। একই গবেষণায় বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালে এসব শহরে দৈনিক বর্জ্য উৎপাদন ২ লাখ ১২ হাজার ৯২৫ টনের বেশি হতে পারে বলে মডেলভিত্তিক পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
গবেষণাটিতে আরও দেখা গেছে, এসব বর্জ্য থেকে দহনভিত্তিক প্রযুক্তিতে প্রায় ৩৯ মেগাওয়াট এবং অ্যানারোবিক ডাইজেশনের মাধ্যমে প্রায় ৮৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এগুলো বাংলাদেশের জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা নয়; নির্দিষ্ট গবেষণার আওতাভুক্ত শহর ও মডেলের ফলাফল। অন্যদিকে ২০২০ সালের একটি বিস্তৃত গবেষণা পর্যালোচনায় বাংলাদেশের নগরাঞ্চলে দৈনিক প্রায় ২৩ হাজার ৬৮৮ টন পৌর কঠিন বর্জ্য উৎপাদনের হিসাব পাওয়া যায়। এর প্রায় ৭০ শতাংশ ছিল জৈব বর্জ্য; গড় আর্দ্রতা প্রায় ৫০ শতাংশ এবং সংগ্রহ দক্ষতা প্রায় ৫৬ শতাংশ বলেও গবেষণাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংখ্যার পার্থক্য গবেষণার সময়, তথ্যের উৎস ও আওতার পার্থক্য নির্দেশ করে। তবে মূল বার্তা একটাই। বাংলাদেশে বর্জ্যের পরিমাণ ও ব্যবস্থাপনার চাপ বাড়ছে। রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট, মাছ মাংসের বর্জ্য, ফল ও সবজির খোসা, কাঁচাবাজারের পচনশীল অংশ এবং কৃষিজ অবশিষ্টাংশ বাংলাদেশের বর্জ্যের গুরুত্বপূর্ণ জৈব অংশ। এগুলো ভাগাড়ে জমে পচলে দুর্গন্ধের পাশাপাশি মিথেনসহ গ্রিনহাউস গ্যাসের উৎস হতে পারে। কিন্তু উৎসস্থলে আলাদা করে সংগ্রহ করা গেলে একই বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট, বায়োগ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।
বাংলাদেশের বর্জ্যে আর্দ্রতা বেশি হওয়ায় সব বর্জ্য সরাসরি পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা অর্থনৈতিকভাবে সমান কার্যকর নয়। তাই বর্জ্যের ধরন অনুযায়ী প্রযুক্তি নির্বাচন জরুরি। জৈব বর্জ্যের জন্য কম্পোস্ট ও অ্যানারোবিক ডাইজেশন, পুনর্ব্যবহারযোগ্য শুকনো বর্জ্যের জন্য পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ এবং উপযুক্ত অবশিষ্ট বর্জ্যের জন্য শক্তি পুনরুদ্ধার, এই সমন্বিত ব্যবস্থাই বেশি যুক্তিসংগত। বর্জ্য শিল্পের ভিত্তি হতে হবে উৎসস্থলে পৃথকীকরণ। বাসাবাড়ি, বাজার, প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানায় জৈব, পুনর্ব্যবহারযোগ্য এবং বিপজ্জনক বর্জ্য আলাদা করা গেলে পরবর্তী ধাপের ব্যয় ও জটিলতা কমে।
জৈব বর্জ্য যাবে কম্পোস্ট বা বায়োগ্যাস কেন্দ্রে। প্লাস্টিক যাবে পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায়। কাগজ ও কাচ ফিরে যাবে সংশ্লিষ্ট শিল্পে। লোহা ও অ্যালুমিনিয়াম পুনরুদ্ধার করে আবার উৎপাদনে ব্যবহার করা যাবে। আর পুনরুদ্ধারযোগ্য নয় এমন অংশ যাবে নিরাপদ ল্যান্ডফিলে। এভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শুধু পৌরসভার ব্যয়ের খাত না থেকে সম্পদ পুনরুদ্ধারের শিল্পে পরিণত হতে পারে।
বড় শহরগুলোতে আধুনিক বর্জ্য পুনরুদ্ধার কেন্দ্র গড়ে তোলা প্রয়োজন। সেখানে বর্জ্য বাছাই, পরিষ্কার, সংকোচন ও প্রক্রিয়াজাত করে শিল্পের উপযোগী কাঁচামাল তৈরি করা যাবে। এ ব্যবস্থায় অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য সংগ্রহকারীদের বাদ দেওয়া যাবে না। তারা ইতোমধ্যে প্লাস্টিক, কাগজ, ধাতু ও অন্যান্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান সংগ্রহ করে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা সরঞ্জাম, স্বাস্থ্যসেবা, নিবন্ধন ও ন্যায্য পারিশ্রমিকের মাধ্যমে তাদের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে সামাজিক নিরাপত্তার পাশাপাশি পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থাও শক্তিশালী হবে।
কাঁচাবাজার ও খাদ্যবর্জ্য থেকে কম্পোস্ট তৈরি করে কৃষিতে ব্যবহার করা যায়। এতে শহরের বর্জ্য কমবে এবং কৃষির জন্য জৈব উপাদানের জোগান বাড়বে। অ্যানারোবিক ডাইজেশনে অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে জৈব বর্জ্য ভেঙে বায়োগ্যাস তৈরি হয়, যার প্রধান জ্বালানি উপাদান মিথেন। এ গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। বড় বাজার, হোটেল, রেস্তোরাঁ ও খাদ্যপ্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের প্রকল্পের সম্ভাবনা রয়েছে।
২০২৬ সালের গবেষণায় অ্যানারোবিক ডাইজেশনে প্রায় ৮৩ মেগাওয়াট এবং দহনভিত্তিক পদ্ধতিতে প্রায় ৩৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। গবেষণাটিতে আনুমানিক সমতুল্য উৎপাদন ব্যয়ও অ্যানারোবিক ডাইজেশনের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় ৩ দশমিক ৪৫ টাকা এবং দহনভিত্তিক প্রযুক্তিতে ১০ দশমিক ৩০ টাকা ধরা হয়েছে। তবে বাস্তব প্রকল্পে প্রযুক্তি, বর্জ্যের গুণ, মান, সংগ্রহ, বিনিয়োগ ও বিদ্যুতের বিক্রয়মূল্য অনুযায়ী ব্যয় পরিবর্তিত হবে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে মাথাপিছু বার্ষিক প্লাস্টিক ব্যবহার ২০০৫ সালের ৩ কেজি থেকে ২০২০ সালে বেড়ে ৯ কেজিতে দাঁড়িয়েছে। ২০২০ সালে দেশে প্রায় ৯ লাখ ৭৭ হাজার টন প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয়েছিল, যার মাত্র ৩১ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করা হয়। ঢাকায় মাথাপিছু বার্ষিক প্লাস্টিক ব্যবহার ছিল প্রায় ২২ দশমিক ২৫ কেজি। একই সময়ে ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ৬৪৬ টন প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করা হলেও পুনর্ব্যবহার করা হয়েছিল মাত্র ৩৭ দশমিক ২ শতাংশ। এ পরিসংখ্যানের অর্থ পরিষ্কার। প্লাস্টিকের বিপুল অংশ এখনো অর্থনীতির বাইরে। পৃথক সংগ্রহ, বাছাই, পরিষ্কার, দানা তৈরি ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে এটি বড় শিল্পমূল্যশৃঙ্খলে পরিণত হতে পারে। প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনায় উৎপাদনকারীর সম্প্রসারিত দায়িত্ব বা ইপিআর গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ পণ্য বাজারে ছাড়ার পর ব্যবহারের শেষে তৈরি হওয়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উৎপাদক ও ব্র্যান্ড মালিকদেরও দায়িত্ব থাকবে। এতে পণ্য ও প্যাকেজিংয়ের নকশা, সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণে নতুন উদ্যোগ তৈরি হতে পারে। বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশে প্লাস্টিকের বৃত্তাকার অর্থনীতি এগিয়ে নিতে ইপিআরকে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে ই বর্জ্যও বাড়ছে। এতে তামা, অ্যালুমিনিয়াম ও লোহার মতো পুনরুদ্ধারযোগ্য উপাদান থাকে। আবার সীসা, পারদ ও ক্যাডমিয়ামের মতো ক্ষতিকর পদার্থও থাকতে পারে। তাই অনিরাপদভাবে পোড়ানো বা রাসায়নিক ব্যবহার করে ধাতু পৃথক করার পরিবর্তে অনুমোদিত পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, পরিবেশগত মান ও শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। বর্জ্যকে শিল্পে রূপান্তরের জন্য প্রথমে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য জাতীয় বর্জ্য তথ্যভান্ডার। এরপর ধাপে ধাপে উৎসস্থলে পৃথকীকরণ, বড় শহরে বর্জ্য পুনরুদ্ধার কেন্দ্র, পুনর্ব্যবহার ও বায়োগ্যাস খাতে অর্থায়ন, অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় যুক্ত করা এবং অব্যবহারযোগ্য বর্জ্যের জন্য বৈজ্ঞানিক ল্যান্ডফিল নিশ্চিত করতে হবে। সঙ্গে থাকতে হবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। ডিজিটাল ওজন ব্যবস্থা, বর্জ্য পরিবহনের নজরদারি, বর্জ্যের গতিপথ অনুসরণ এবং স্বাধীন নিরীক্ষা চালু করা গেলে অপচয় ও অনিয়ম কমানো সম্ভব। বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ। একদিকে ক্রমবর্ধমান বর্জ্য, বড় ভাগাড় এবং বাড়তে থাকা পরিবেশগত ক্ষতি। অন্যদিকে উৎসস্থলে পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার, কম্পোস্ট, বায়োগ্যাস, প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নিরাপদ নিষ্পত্তির সমন্বিত ব্যবস্থা। দ্বিতীয় পথটি শুধু পরিবেশ রক্ষার পথ নয়; এটি নতুন শিল্প, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের পথও হতে পারে। ২০২৬ সালের গবেষণায় প্রধান শহরগুলোর বর্জ্য থেকে ৮৩ মেগাওয়াট অ্যানারোবিক এবং ৩৯ মেগাওয়াট দহনভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে মডেলভিত্তিক সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে, তা এই খাতের সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
অতএব, প্রশ্নটি আর শুধু 'বর্জ্য কোথায় ফেলব' নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত, বর্জ্য থেকে কত সম্পদ উদ্ধার করব, কত জ্বালানি তৈরি করব, কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করব এবং কত নতুন শিল্প গড়ে তুলব?
সঠিক নীতি, নির্ভরযোগ্য তথ্য, উপযুক্ত প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের বর্জ্য আর শুধু বোঝা থাকবে না। আজকের আবর্জনাই হয়ে উঠতে পারে আগামী দিনের কাঁচামাল, জ্বালানি, কর্মসংস্থান এবং সবুজ অর্থনীতির নতুন সম্পদ।
লেখক : কলামিস্ট
