প্রযুক্তির আলোয় বিদ্যুৎ খাতের স্থায়ী সমাধান
আমানুর রহমান
প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রচণ্ড গরমে যখন ঘামে গা ভিজে যায় আর হঠাৎ করেই ঘরের আলো-পাখা নিভে যায়, তখন একজন সাধারণ মানুষের মনে যে হতাশা তৈরি হয়, তার চেয়ে যন্ত্রণাদায়ক আর কিছু হতে পারে না। রাতের বেলা যখন একটি শিশু ঘামতে ঘামতে জেগে ওঠে, তখন বাবা-মায়ের অসহায়ত্ব আমাদের বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাকেই নির্দেশ করে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনা হলো- এর মোট উৎপাদন সক্ষমতা এবং চাহিদার মধ্যকার বিশাল ফারাক।
বর্তমানে আমাদের মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩২ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি। অথচ গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহেও সর্বোচ্চ চাহিদা থাকে ১৬ থেকে ১৮ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে। যেমন, ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৭,০৯৯ মেগাওয়াট। অর্থাৎ, কাগজে-কলমে আমাদের উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে আমরা নিয়মিত লোডশেডিংয়ের শিকার হচ্ছি। এর মূল কারণ উৎপাদনকেন্দ্রের অভাব নয়; বরং জ্বালানিসংকট, গ্রিডের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, ডলার-সংকটের কারণে আমদানি করা এলএনজি বা কয়লার জোগান নিশ্চিত করতে না পারা এবং সঠিক পূর্বাভাস ব্যবস্থার অভাব।
এ জটিল সমস্যার সমাধানে প্রথাগত পদ্ধতির বদলে এখন আধুনিক প্রযুক্তির আলো ছড়াচ্ছে 'প্রেডিক্টিভ অ্যানালিটিক্স' বা পূর্বাভাসমূলক তথ্য বিশ্লেষণ। এটি আমাদের জাতীয় গ্রিডকে একটি বুদ্ধিমান ও সক্রিয় ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে সক্ষম।
একটি শক্তিশালী পূর্বাভাস ব্যবস্থা তৈরি করতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও নির্ভুল তথ্যের, যা শুধু অনুমানের ওপর ভিত্তি করে নয়; বরং কঠোর গাণিতিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে অর্জিত হবে। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)-এর জন্য একটি তথ্যনির্ভর কাঠামো তৈরির মাধ্যমে একটি ইন্টারেক্টিভ 'গ্রেডিও') ড্যাশবোর্ড দিয়ে গ্রিডের স্থিতিশীলতা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। ২০১৯ সালের ২১ নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (বিপিডিবি)-এর ১,৮৬৭টি দৈনিক প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত তথ্যভাণ্ডার দেশের নয়টি বিভাগের চাহিদা, উৎপাদন ও লোডশেডিংয়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
পাইথন প্রোগ্রামিংয়ের সুনিপুণ ব্যবহার এবং বিউটিফুল স্যুপ ও পিডিএফ প্লাম্বার-এর মতো লাইব্রেরি কাজে লাগিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংগৃহীত এ তথ্যগুলো আমাদের বিদ্যুৎ খাতের দৈনন্দিন পরিস্থিতির এক জীবন্ত দলিল, যা ভবিষ্যতের সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হতে পারে। করোনা মহামারির মতো বৈশ্বিক দুর্যোগের সময় বিদ্যুৎ খাতে কী প্রভাব পড়েছিল, তার এক অনন্য ইতিহাসও এ ডেটাসেটে সংরক্ষিত আছে, যা নীতিনির্ধারকদের জন্য অমূল্য সম্পদ।
শুধু কতটুকু বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলো, তা জানাই যথেষ্ট নয়; বরং কী কারণে উৎপাদন ব্যাহত হলো, তা চিহ্নিত করাও জরুরি। এই ডেটাসেট ও প্রতিবেদনে বিদ্যুৎ খাতের এমন কিছু বাস্তব ও জটিল চলক (Variables) যুক্ত করা হয়েছে, যা সাধারণত আলোচনায় আসে না। যেমন- ঢাকার দৈনিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রা সরাসরি বিদ্যুতের চাহিদার সাথে সম্পর্কিত। তাপমাত্রা বাড়লে এসি ও ফ্রিজের ব্যবহার বাড়ে, যা গ্রিডে হঠাৎ চাপ সৃষ্টি করে। পাশাপাশি রয়েছে গ্যাস ও তরল জ্বালানির ঘাটতির কারণে কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হলো তার হিসাব, কয়লা সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এবং কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর কমে যাওয়ার ফলে জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনে প্রভাব পড়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য। ধরা যাক, কোনো একদিন গ্যাসের সংকটের কারণে ১,৩৪৯ মেগাওয়াট এবং কয়লার অভাবে ৪৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হলো।
মেশিন লার্নিং মডেলগুলো এ ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করে আগামীতে কখন এবং কতটুকু জ্বালানির ঘাটতি তৈরি হতে পারে, তা আগে থেকেই সতর্ক করে দিতে পারে। এর ফলে নীতিনির্ধারকেরা সাময়িক বা প্রতিক্রিয়াশীল সিদ্ধান্তের বদলে পূর্বপ্রস্তুতিমূলক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবেন, যা লোডশেডিং কমাতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে। একটি তৈরি পোশাক কারখানায় যখন লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়, তখন যে বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়, তা এ সূক্ষ্ণ পূর্বাভাসের মাধ্যমে অনেকাংশেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব। মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে বিদ্যুতের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। তাই গাণিতিক মডেলগুলোতে মানুষের আচরণ, সংস্কৃতি ও অভ্যাসকেও স্থান দেওয়া হয়েছে। ডেটাসেটে সাধারণ ছুটির দিন, একাধিক দিনব্যাপী উৎসব (যেমন- ঈদ বা পূজা) এবং রমজানের মতো বিশেষ সময়গুলোকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে; কারণ এসব সময়ে মানুষের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরন সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে যায়। সেহরি ও ইফতারের সময় কিংবা ঈদের কেনাকাটার সময় বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে বিদ্যুতের যে অস্বাভাবিক চাহিদা তৈরি হয়, তা আগে থেকে জানা থাকলে সাবস্টেশনগুলোকে প্রস্তুত রাখা যায়।
'লং শর্ট-টার্ম মেমোরি' বা 'রিকারেন্ট নিউরাল নেটওয়ার্ক'-এর মতো উন্নত ডিপ লার্নিং মডেল ব্যবহার করে গবেষকেরা দেখিয়েছেন যে, বাংলাদেশের বিদ্যুতের চাহিদার পূর্বাভাসে ত্রুটির হার মাত্র ৩.৯৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব। যখন একজন কারখানার মালিক বা একজন শিক্ষার্থী আগে থেকেই জানতে পারেন যে আগামীকাল কখন লোডশেডিং হবে বা হবে না, তখন তাদের কাজের পরিকল্পনা গ্রহণ সহজ হয় এবং মানসিক প্রশান্তি বাড়ে। প্রযুক্তির এই মানবিক রূপটিই মূলত একটি দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চাবিকাঠি, যা শুধু যন্ত্রের নয়; বরং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে নিবেদিত। অবশ্য এ প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ বাস্তবে রূপ দিতে গেলে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো ঘণ্টাভিত্তিক সূক্ষ্ণ তথ্যের অভাব। বর্তমানে দৈনিক ভিত্তিতে তথ্য পাওয়া গেলেও জাতীয় গ্রিডকে সম্পূর্ণরূপে স্মার্ট করতে হলে তাৎক্ষণিক ডেটা প্রসেসিং সিস্টেমের প্রয়োজন। তবুও বর্তমান প্রতিবেদনগুলো প্রমাণ করে যে, আমাদের হাতে যে তথ্য আছে তা দিয়েই আমরা পিজিসিবি এবং বিপিডিবি-এর গ্রিড ব্যবস্থাপনা অনেক বেশি বিজ্ঞানসম্মত করতে পারি। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কতগুলো প্ল্যান্ট বন্ধ রাখা হবে, তা আগে থেকেই মডেলের মাধ্যমে এমনভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব, যেন 'পিক আওয়ার' বা সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে কোনো উৎপাদনকেন্দ্র অচল না থাকে।
লোডশেডিংয়ের কারণে আমাদের যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, তা এ পূর্বাভাসমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে অনেকাংশেই রোধ করা সম্ভব। দিনশেষে, একটি দেশের প্রকৃত উন্নতি পরিমাপ করা হয় তার নাগরিকদের জীবনমানের মানদণ্ডে। আমরা যখন 'প্রেডিক্টিভ অ্যানালিটিক্স'-এর মতো আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে আমাদের জাতীয় গ্রিডকে একটি দৃঢ় ও নির্ভরযোগ্য কাঠামোতে পরিণত করতে পারব, তখন আর কোনো শিশুর পড়াশোনা কিংবা কোনো হাসপাতালের জরুরি সেবা হঠাৎ করে অন্ধকারে থমকে যাবে না। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারই পারে প্রতিটি ঘরে নিরবচ্ছিন্ন আলো পৌঁছে দিতে এবং সেই আলোই হতে পারে আমাদের সমৃদ্ধ আগামীর প্রতীক-যেখানে অন্ধকার শুধু রাতের একটি স্বাভাবিক রূপ, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত শাস্তি নয়।
লেখক : কবি ও কলামিস্ট
