উপকূলের বিকল্প কৃষি : ভাসমান চাষ হতে পারে জলবায়ু অভিযোজনের মডেল
শেখ হাসান মামুন
প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জমি নেই, অথচ কৃষি থেমে নেই। চারদিকে পানি, কিন্তু পানির বুকেই ভেসে আছে সবুজ বীজতলা। কচুরিপানা, টোপাপানা ও বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ দিয়ে তৈরি ভাসমান ধাপে জন্ম নিচ্ছে লাউ, করলা, কুমড়া, বেগুন, মরিচ, পুঁই, টমেটোসহ নানা সবজির চারা। পিরোজপুরের নাজিরপুরের দেউলবাড়ী দোবরা ও বৈঠাকাটা বিলাঞ্চলের এই দৃশ্য শুধু একটি ঐতিহ্যবাহী কৃষিপদ্ধতির পরিচয় নয়; জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান অভিঘাতের মধ্যে টিকে থাকার এক অসাধারণ মানবিক অভিযোজনের বার্তা।
বর্ষার পানিতে যখন প্রচলিত কৃষিজমি তলিয়ে যায়, তখন কৃষকের সামনে সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়ায় খাদ্য উৎপাদন ও জীবিকা। অথচ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পিরোজপুরের বিলাঞ্চলের মানুষ পানির সঙ্গে লড়াই না করে পানিকেই কৃষির সহায়ক শক্তিতে পরিণত করেছেন। মাটির পরিবর্তে ভাসমান ধাপ তৈরি করে তারা প্রমাণ করেছেন, কৃষির জন্য শুধু জমিই প্রয়োজন নয়, প্রয়োজন জ্ঞান, উদ্ভাবন ও পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রযুক্তি। এ লোকজ কৃষিপদ্ধতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এখানেই।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, অতিবৃষ্টি, বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা বাংলাদেশের উপকূলীয় কৃষিকে ক্রমেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। ভবিষ্যতে অনেক এলাকায় চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কমে গেলে প্রচলিত কৃষি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তাই জলমগ্ন এলাকায় কীভাবে কৃষি চালু রাখা যায়, তার উত্তর খুঁজতে এখনই বিনিয়োগ করতে হবে বিকল্প কৃষিতে। পিরোজপুরের ভাসমান কৃষি সেই উত্তর খোঁজার একটি বাস্তব উদাহরণ। স্থানীয় কৃষকের অভিজ্ঞতাকে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করা গেলে এর সম্ভাবনা আরও বহুগুণ বাড়তে পারে। হাইড্রোপনিক্স, উন্নত বীজ, লবণসহিষ্ণু ফসল, পানি ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক বাজারব্যবস্থার সমন্বয়ে গড়ে তোলা যেতে পারে জলবায়ু-সহনশীল ভাসমান কৃষির নতুন মডেল। এ ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব শুধু কৃষকদের প্রণোদনা দেওয়া নয়; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা। কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, স্থানীয় সরকার, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও কৃষকদের সমন্বয়ে দেশের জলাবদ্ধ ও উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে ভাসমান কৃষির সম্ভাবনা চিহ্নিত করতে হবে। কোথায় কোন ফসল হবে, কতটা উৎপাদন সম্ভব, কীভাবে সংরক্ষণ ও বাজারজাত করা যাবে, এসব বিষয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা জরুরি। একই সঙ্গে এ কৃষির সঙ্গে যুক্ত কৃষকদের ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানকে স্বীকৃতি দিতে হবে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু উন্নত প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়; স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও প্রকৃতিকে বোঝার ক্ষমতাও এর গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। পিরোজপুরের কৃষকের হাতে থাকা সেই জ্ঞানকে গবেষণার মাধ্যমে সংরক্ষণ ও উন্নত করে দেশের অন্যান্য জলমগ্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। এখানে বাংলাদেশের জন্য রয়েছে আরও বড় একটি শিক্ষা। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায় তুলনামূলকভাবে কম হলেও এর ক্ষতির অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর অভিযোজন সক্ষমতা বাড়ানোই হতে পারে জলবায়ু ন্যায্যতার অন্যতম বাস্তব প্রয়োগ। আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তাই শুধু অবকাঠামো নির্মাণে নয়, স্থানীয়ভাবে পরীক্ষিত ও কার্যকর অভিযোজন প্রযুক্তি সম্প্রসারণেও ব্যয় করা প্রয়োজন।
পিরোজপুরের ভাসমান কৃষি বিশ্বকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়, জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা মানে শুধু দুর্যোগ ঠেকানো নয়; পরিবর্তিত পরিবেশের মধ্যেও মানুষের খাদ্য, জীবিকা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার পথ তৈরি করা। আজকের ভাসমান ধাপ আগামী দিনের বৃহত্তর জলবায়ু-সহনশীল কৃষির ভিত্তি হতে পারে। বাংলাদেশের উপকূল থেকে শুরু করে বিশ্বের অন্যান্য জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ জলমগ্ন অঞ্চলে এ অভিজ্ঞতা গবেষণা, প্রযুক্তি ও নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে একটি স্থানীয় কৃষিজ্ঞান পরিণত হতে পারে বৈশ্বিক অভিযোজনের মডেলে। পিরোজপুরের বিলের পানিতে ভেসে থাকা সবুজ ধাপ তাই শুধু কৃষকের জীবিকার প্রতীক নয়, এটি ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য একটি সম্ভাব্য বার্তা: পানি বাড়লেও কৃষি থামবে না, যদি মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই না করে প্রকৃতিকে বুঝে তার সঙ্গে অভিযোজনের পথ তৈরি করতে পারে।
লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক
