অনলাইন জুয়া তরুণ প্রজন্মকে অদৃশ্য ফাঁদে নিঃস্ব করছে
মো. আজহারুল ইসলাম
প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতির সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা যেমন অনেক সহজ হয়েছে, তেমনি বেড়েছে নানা ধরনের অনলাইন অপরাধ ও মারাত্মক আসক্তির ঝুঁকি। এর মধ্যে অনলাইন জুয়া বর্তমানে আমাদের সমাজে একটি অত্যন্ত গুরুতর সামাজিক সমস্যা হিসেবে সামনে এসেছে। ডিজিটাল রূপান্তরের সুফলকে একশ্রেণির অপরাধী চক্র নিজেদের পকেট ভরার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে তথ্যের অবাধ প্রবাহের এই যুগে উপকারের চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক অবক্ষয়ের শঙ্কা বাড়িয়ে তুলছে অনলাইন জুয়ার এই নতুন ও অদৃশ্য বিশ্ব।
মুঠোফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম দেশের তরুণদের দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রলোভন দেখিয়ে জুয়ার দিকে তীব্রভাবে আকৃষ্ট করছে। অতি অল্প সময়ে এবং বিনা পরিশ্রমে ধনী হওয়ার কাল্পনিক স্বপ্ন দেখিয়ে তরুণদের ভুল পথে চালিত করা হচ্ছে। শুরুতে এটি নিছক বিনোদন বা সামান্য অর্থ দিয়ে শখের বশে খেলার বিষয় মনে হলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি অনেকের জীবনে মারাত্মক ও অনিরাময়যোগ্য এক আসক্তিতে পরিণত হচ্ছে।
অনলাইন জুয়ার সবচেয়ে ভয়াবহ ও ক্ষতিকর দিক হলো এর অবাধ সহজলভ্যতা। একসময় জুয়া খেলতে নির্দিষ্ট গোপন স্থানে বা ক্যাসিনোতে যেতে হতো; কিন্তু এখন একটি স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই ঘরে বসে কিংবা পড়ার টেবিলে থেকেও এতে অনায়াসে যুক্ত হওয়া সম্ভব। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা এই প্ল্যাটফর্মগুলো খোলা থাকায় ব্যবহারকারীরা যেকোনো মুহূর্তে জুয়ায় অংশ নিতে পারছে। প্রযুক্তির এই অনাকাঙ্ক্ষিত নাগালের কারণেই তরুণদের এই আসক্তি থেকে দূরে রাখা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকা নানা আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন, সাইন-আপ বোনাস ও সহজে জেতার মিথ্যা প্রলোভন মানুষকে এই বড় ঝুঁকিপূর্ণ খেলায় নামতে উৎসাহিত করে। কেউ কেউ শুরুতে অ্যালগরিদমের ফাঁদে পড়ে অল্প অর্থ জিতে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে এবং পরবর্তী সময়ে আরও বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করতে থাকে। প্রথম দিকের এই কৃত্রিম জয় মস্তিষ্কে ডোপামিন হরমোন নিঃসৃত করে, যা পরবর্তীতে অনবরত জুয়া খেলার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে।
অনলাইন জুয়ায় যখন ব্যবহারকারীরা হারতে শুরু করে, তখন শুরু হয় এক মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক খেলা। একপর্যায়ে হারানো টাকা ফেরত পাওয়ার অন্ধ আশায় তারা বারবার আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে থাকে এবং এতে ক্ষতির পরিমাণ কেবল বহুগুণ বাড়তেই থাকে। সঞ্চয় শেষ হয়ে যাওয়ার পর তারা বন্ধু-বান্ধব, স্বজন ও অনলাইন লোন অ্যাপ থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হয়। অনলাইন জুয়ার এই চরম আর্থিক ক্ষতি শেষপর্যন্ত অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারকে একেবারে রাস্তায় বসিয়ে দিচ্ছে।
ফেসবুক, ইউটিউব ও বিভিন্ন গেমের মাঝে পপ-আপ বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে জুয়ার সাইটগুলোর প্রচার চালানো হচ্ছে। এমনকি বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ও কথিত কনটেন্ট ক্রিয়েটররা মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এসব বেটিং অ্যাপের প্রচার চালাচ্ছে। তারা জুয়াকে একটি 'স্মার্ট' বা আধুনিক খেলা হিসেবে তরুণদের সামনে তুলে ধরছে। এই ধরণের বিভ্রান্তিকর প্রচারণার ফলে সাধারণ তরুণরা বুঝতে পারে না যে তারা একটি সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক প্রতারণাচক্রের ফাঁদে পা দিচ্ছে।
অনলাইন জুয়ার লেনদেন সাধারণত প্রচলিত ব্যাংকিং চ্যানেলে হয় না। বিকাশ, নগদ বা রকেটের ভুয়া একাউন্ট কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে এই লেনদেন করা হয়। এর ফলে প্রতিদিন দেশ থেকে শত শত কোটি টাকা ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক রিজার্ভের ওপর এটি এক চরম আঘাত। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর চোখ ফাঁকি দিতে অপরাধীরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ডোমেইন ও এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করছে, যা তাদের সনাক্ত করা আরও কঠিন করে তুলেছে।
অনলাইন জুয়ায় আসক্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে নিজের পরিবার ও সমাজ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সব সময় ফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকা এবং হারের চিন্তায় মানসিক চাপে থাকার ফলে পারিবারিক কলহ নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। জুয়ার টাকা জোগাড় করতে অনেক সময় ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি বা বিক্রি করার মতো ঘটনাও ঘটে। বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে এবং পরিবারের শান্তি পুরোপুরি বিনষ্ট হয়।
জুয়ার বিশাল আর্থিক দেনা এবং হারের গ্লানি তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যকে চরমভাবে পঙ্গু করে দেয়। অনবরত মানসিক চাপ, অনিদ্রা, প্যানিক অ্যাটাক এবং তীব্র বিষণ্ণতা আসক্তদের গ্রাস করে। অনেক ক্ষেত্রে দেনার হাত থেকে বাঁচতে এবং সামাজিকভাবে অপমানিত হওয়ার ভয়ে তরুণরা আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নেয়। অনলাইন জুয়া শুধু পকেটের টাকা কাড়ে না, বরং একজন মানুষের সুস্থ চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতা ও বাঁচার ইচ্ছাকে নীরবে ধ্বংস করে দেয়।
জুয়া খেলার দেনা পরিশোধ করতে গিয়ে অনেক তরুণ পরবর্তীতে অন্যান্য নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। চুরি, ছিনতাই, জালিয়াতি, ব্ল্যাকমেইলিং এমনকি কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে সহিংস কর্মকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ততা বাড়ছে। যে তরুণদের দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার কথা, তারা আজ সামান্য কিছু জুয়ার টাকার জন্য আইনের মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, অনলাইন জুয়া বর্তমান সময়ের কিশোর অপরাধ বাড়ার অন্যতম প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষ কারণ হিসেবে কাজ করছে।
স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বর্তমানে অনলাইন জুয়ার অন্যতম প্রধান শিকার। টিফিনের টাকা, টিউশনির ফি কিংবা পরীক্ষার ফরম পূরণের টাকা জুয়ায় উড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা অহরহ ঘটছে। এর ফলে ক্লাসে মনোযোগ হ্রাস পাচ্ছে এবং ঝরে পড়ার হার বাড়ছে।
রাতে জেগে জুয়া খেলা এবং দিনে ঘুমানোর কারণে তাদের পুরো জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। মেধাবী শিক্ষার্থীরাও এই মরণনেশার কারণে তাদের উজ্জ্বল একাডেমিক ক্যারিয়ার ধ্বংস করে ফেলছে।
এই প্রযুক্তিনির্ভর সময়ে জুয়ার সাইটগুলোতে বিটকয়েন বা ইউএসডিটি-র মতো ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার বহুগুণ বেড়েছে। ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন বেনামী হওয়ায় অপরাধীদের শনাক্ত করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। সাধারণ তরুণরা মনে করে ডিজিটাল কারেন্সিতে জুয়া খেলা হয়তো নিরাপদ ও আধুনিক। কিন্তু বাস্তবে তারা এমন এক আন্তর্জাতিক সাইবার সিন্ডিকেটের শিকার হচ্ছে, যেখান থেকে টাকা ফেরত পাওয়ার কোনো আইনি সুযোগ বা নিশ্চয়তা থাকে না।
বাংলাদেশে প্রচলিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা সংশ্লিষ্ট সাইবার আইনের অধীনে জুয়া প্রতিরোধে বিধান থাকলেও প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সাথে আইন প্রয়োগের চ্যালেঞ্জ বাড়ছে। একটি ওয়েবসাইট ব্লক করলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নতুন ডোমেইনে একই সাইট চালু হয়ে যায়। বিটিআরসি নিয়মিত শত শত সাইট ব্লক করলেও প্রযুক্তির এই ইঁদুর-বিড়াল খেলায় অপরাধীরা এগিয়ে থাকছে। তাই সাইবার মনিটরিং সেলকে আরও দক্ষ, আধুনিক ও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে এ বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক ভূমিকা পালন করতে হবে। যেসব একাউন্টে সন্দেহজনক বা অস্বাভাবিক লেনদেন হচ্ছে, সেগুলো তাৎক্ষণিকভাবে ব্লক করে তদন্তের আওতায় আনা উচিত। এজেন্ট ব্যাংকিং বা পার্সোনাল একাউন্টের অবৈধ ব্যবহার কঠোরভাবে মনিটর করতে হবে। জুয়ার অর্থ লেনদেনের পথ যদি বন্ধ করা যায়, তবে দেশে এই অবৈধ অনলাইন জুয়ার বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
সন্তানরা ইন্টারনেটে কী করছে এবং তাদের ফিন্যান্সিয়াল ওয়ালেটে কী ধরণের লেনদেন হচ্ছে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের তীক্ষ্ণ নজর রাখা প্রয়োজন। সন্তান হঠাৎ চুপচাপ হয়ে গেলে, অতিরিক্ত টাকার দাবি করলে বা রাতে জেগে ফোন ব্যবহার করলে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। বকাঝকা না করে বন্ধুর মতো কথা বলে আসক্তির প্রাথমিক পর্যায়েই সন্তানকে ফিরিয়ে আনতে হবে। পারিবারিক মূল্যবোধ ও নিয়মিত যোগাযোগই পারে সন্তানকে এই মায়াজাল থেকে রক্ষা করতে।
স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইন জুয়ার ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে নিয়মিত সেমিনার ও ওয়ার্কশপ আয়োজন করতে হবে। আইটি ক্লাবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সাইবার নিরাপত্তার সঠিক শিক্ষা দেওয়া দরকার। গণমাধ্যমকেও এ বিষয়ে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। অনলাইন জুয়া যে কেবল একটি খেলা নয়, বরং এটি একটি ডিজিটাল অপরাধ ও আর্থিক ফাঁদ, এই সত্যটি সহজ ভাষায় সবার সামনে তুলে ধরতে হবে যাতে তরুণরা প্রলোভনে না পড়ে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিটিআরসি, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সাইবার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন। এই টাস্কফোর্স কেবল দেশের অভ্যন্তরে নয়, বিদেশের বেটিং সাইটগুলোর বিরুদ্ধেও আন্তর্জাতিক সাইবার সংস্থার সহায়তায় কাজ করবে। একই সাথে জুয়ায় আসক্ত তরুণদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পেশাদার কাউন্সিলিং ও ডি-অ্যাডিকশন সেন্টারের সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অফ বাংলাদেশ
