মধ্যপ্রাচ্য : কেন বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু
এম জাহিদ হাসান
প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
একবিংশ শতাব্দীর রাজনীতিতে এমন খুব কম অঞ্চল আছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের মতো একইসঙ্গে এত গুরুত্বপূর্ণ, এত জটিল এবং এত বেশি আলোচিত। ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে বাঁকে এই অঞ্চলকে ঘিরে কোনো না কোনো পরাশক্তির প্রতিযোগিতা দেখা গেছে। কখনও প্রতিযোগিতা হয়েছে উপনিবেশবাদী শক্তির আধিপত্য বিস্তারের, কখনো স্নায়ু যুদ্ধের দুই মেরুর প্রভাব বিস্তার, আবার কখনও সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধের নাম দিয়ে সামরিক হস্তক্ষেপ। সব ক্ষেত্রেই মধ্যপ্রাচ্য যেন আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। বর্তমান সময়েও যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীনসহ বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলো এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে এবং তাদের প্রতিদ্বন্ধিদের কোনঠাসা করতে ভিন্ন ভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করছে। এখন প্রশ্ন হলো, কেনই বা এই মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে এই প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা? কেন বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের এই অঞ্চলে তাদের প্রভাব বলয় ধরে রাখতে এত আগ্রহী? এর উত্তর লুকিয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগোলিক অবস্থান, বিপুল জ্বালানি সম্পদ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথের নিয়ন্ত্রণ এবং বিরোধী শক্তির দমনে এক কৌশলগত কারণ। আজকের বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রতিদিন কোটি কোটি ব্যারেল তেল এবং বিপুল পরিমান পণ্যবাহী জাহাজ পদ্ধপ্রাচ্চের জলপথ হয়ে সারা বিশ্বে সাপ্লাই হয়। ফলে এই অঞ্চলে কোনো রাজনৈতিক উত্তেজনা দেখা দিলেই তার প্রভাব সারা বিশ্বের প্রতিটি দেশেই পড়ে। রাতারাতি তেলের দাম বেড়ে যায়, শেয়ারবাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতিশীলতা ব্যাহত হয়। এই কারণেই মধ্যপ্রাচ্যকে কেবল, আঞ্চলিক রাজনৈতিক ক্ষেত্র বললে ভুল হবে, বরং এই অঞ্চল বিশ্বরাজনীতিতে একটি নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্র।
মধ্যপ্রাচ্যের এই গুরুত্বের কারণ হলো এর বিপুল জ্বালানি সম্পদ। বিশ্বের মোট তেলের ও গ্যাসের পরিমানের প্রায় ৫০ শতাংশ এই অঞ্চলে রয়েছে। সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত, কাতার, এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো রাষ্ট্রগুলো দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অন্যতম নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে বেশ কয়েকটি বড় বড় যুদ্ধ হয়েছে এই জ্বালানি তেলের দামকে কেন্দ্র করে। ১৯৭৩ সালে আরব দেশগুলো ইসরায়েলকে সমর্থনকারী পশ্চিমা দেশগুলোর উপর বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের উপর Oil Embergo আরোপ করে। ১৯৭৯-১৯৮১ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের কারণেও আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দেয়। ১৯৯০-১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ একটা উৎকৃষ্ট উদহারণ। এই যুদ্ধ শুরুই হয় ইরাক কর্তৃক তেলের দাম কমানোর কারণে। বর্তমান ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের কারণে তেলের বাজারের অস্থিরতা আমাদের চোখের সামনেই বিদ্যমান। বিশ্বের শিল্পায়ন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন এখনো জ্বালানি তেল-গ্যাসের উপর কতটা নির্ভিরশীল তা যুদ্ধকালীন সময়ের পত্রিকার পাতা উল্টালে দেখা যায় আগামী অনেক বছর তেলের উপর নির্ভরশীল থাকবে এবং এটি বিশ্বের অর্থনীতি অনেক বছর পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করবে। আগামী কয়েক দশক জ্বালানি তেল ও গ্যাস আন্তর্জাতিক অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে থাকবে। জ্বালানি তেল ও গ্যাসের উপর এই নির্ভরশীলতার কারণে বিশ্ব পরাশক্তিগুলোকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি আরো আগ্রহী করে তুলছে। কারণ যারাই মধ্যপ্রাচ্যের এই জ্বালানির নিরাপদ প্রবাহ নিশ্চিত করতে পারবে, তারাই বিশ্ব রাজনীতি-অর্থনীতিতে বিরোধীদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারবে।
মদ্ধপ্রাচ্য কেবল তেলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এমনটা না, বরং এই অঞ্চলের জলপথগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। অন্যদিকে এটি আবার ইরানের একক দখলে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এই করিডোরের গুরুত্ব কতটুকু তা চলমান আমেরিকা-ইরান যুদ্ধে বাস্তব প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। এই প্রণালীকে কেন্দ্র করে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে স্বার্থগত চুক্তি হচ্ছে বার বার। কিন্তু দেশদুটির স্বার্থসিদ্ধি না হওয়ার ফলে চুক্তি কার্যকর হচ্ছে না। একইভাবে সুয়েজ খাল এশিয়া ও ইউরোপের সংযোগস্থল। এই দুই মহাদেশের বাণিজ্য এই প্রণালীর উপর নির্ভরশীল। তাই পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোকে সবসময় মিসরের সাথে কৌশলগত সৌহার্দপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়। এই দুটি প্রণালীর মতো বাবা এল মান্দেব প্রণালীও গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রণালীর বড় একটা অংশ হুতি বিদ্রোহীদের দখলে রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য আঞ্চলিক শক্তির সমন্বয়ে গঠিত কম্বাইন্ড মেরিটাইম ফোর্সেস এর নজরদারিতে আছে। বর্তমানে হুথিদের আক্রমণ এবং এর জবাবে আন্তর্জাতিক শক্তি ও সৌদি জোটের পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপের কারণে এই অঞ্চলটিতে বর্তমানে ব্যাপক অস্থিরতা বিরাজ করছে। এই তিনটি প্রণালী পুরো বিশ্বের রাজনীতি ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়েই এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
