উন্নয়নের আলোয় অদৃশ্য মানুষগুলো
মো. রেজাউল করিম রনি
প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
পৃথিবী প্রতিদিন বদলাচ্ছে। প্রযুক্তি এগিয়ে যাচ্ছে, নগরীর আকাশে একের পর এক বহুতল ভবন উঠছে, মানুষের হাতে আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বিস্ময়কর প্রযুক্তি। অর্থনীতি, অবকাঠামো ও যোগাযোগব্যবস্থায় আমরা উন্নয়নের গল্প বলছি। কিন্তু এই উন্নয়নের ঝলমলে আলোর বাইরে এমন এক বিশাল জনগোষ্ঠী রয়ে গেছে, যাদের জীবনসংগ্রাম আমাদের চোখের সামনেই অথচ অনেকটা অদৃশ্য।
তাদের কেউ রাস্তায় ঘুমায়, কেউ রেললাইনের পাশে ঘর বানিয়ে বসবাস করে, কেউ ভোর হওয়ার আগেই কাজে বেরিয়ে পড়ে। কেউ ইট ভাঙে, কেউ মাথায় করে নির্মাণসামগ্রী বহন করে, কেউ বাজারে বোঝা টানে। আর তাদেরই কারও কারও সন্তান বই-খাতা হাতে স্কুলে যাওয়ার বয়সে হাতে তুলে নেয় কাজের বোঝা।
শিশুশ্রম আমাদের সমাজের সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতাগুলোর একটি। একটি শিশু যখন বিদ্যালয়ে যাওয়ার পরিবর্তে হোটেলের টেবিল পরিষ্কার করে, কারখানায় কাজ করে, রাস্তায় পণ্য বিক্রি করে কিংবা নির্মাণস্থলে শ্রম দেয় তখন শুধু একটি শিশুর শৈশবই নষ্ট হয় না ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি দেশের ভবিষ্যৎ।
আমরা প্রায়ই শিশুশ্রমের ছবি দেখি, কিছুক্ষণ আবেগী হই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিই, তারপর নিজেদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাই। কিন্তু সেই শিশুটির জীবন কি বদলায়? প্রশ্নটি এখানেই। একটি শিশুর সবচেয়ে বড় অধিকার হলো নিরাপদ শৈশব, শিক্ষা, পুষ্টি, খেলাধুলা ও ভালোবাসা। অথচ দারিদ্র্য, পারিবারিক সংকট, বেকারত্ব, অপ্রতুল সামাজিক সুরক্ষা এবং শিক্ষার ব্যয়ের কারণে বহু শিশু অল্প বয়সেই শ্রমবাজারে ঢুকে পড়ে। শিশুটির হাতে যখন ইটের বোঝা দেখি, তখন শুধু শিশুটিকে দায়ী করা যায় না। তার পেছনে থাকে একটি অসহায় পরিবার, একটি দুর্বল সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং কখনও কখনও আমাদের সম্মিলিত উদাসীনতা।
একজন শিশুশ্রমিককে কাজ থেকে সরিয়ে শুধু তার হাতে বই তুলে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না।
তার পরিবারকে আয় করার সুযোগ দিতে হবে, শিক্ষাকে সহজলভ্য করতে হবে এবং শিশুশ্রমে নিয়োগদাতাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ঢাকার ফুটপাত, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল কিংবা বড় শহরের ব্যস্ত সড়কে প্রতিদিন অসংখ্য শিশুকে দেখা যায়। কেউ ফুল বিক্রি করে, কেউ পানি বা পণ্য বিক্রি করে, কেউ মানুষের কাছে হাত পাতে। দিনের শেষে তাদের ঠিকানা হয় ফুটপাত, স্টেশন কিংবা কোনো অন্ধকার কোণ। আমরা তাদের পথশিশু বলে পাশ কাটিয়ে যাই।
কিন্তু তারা কি সত্যিই পথের?
তাদেরও পরিবার আছে, স্বপ্ন আছে, ভয় আছে, ভালোবাসার প্রয়োজন আছে। পার্থক্য শুধু আমাদের সন্তানদের জন্য যে নিরাপত্তা ও সুযোগ আমরা নিশ্চিত করতে পারি, তাদের অনেকের জন্য সেটুকুও নিশ্চিত হয় না। একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু মাথাপিছু আয় বা বড় সেতু দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড হলো সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা মানুষটির জীবন কতটা নিরাপদ হয়েছে।
রেললাইনের পাশে বসবাসকারী পরিবারগুলোর জীবন আমাদের নগর বাস্তবতার আরেকটি নির্মম চিত্র। যেখানে প্রতিদিন ট্রেন ছুটে যায়, সেখানেই মানুষ ঘর বানিয়ে বসবাস করে। অল্প জায়গা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, বিশুদ্ধ পানির সংকট, স্যানিটেশনের অভাব এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি সবকিছু নিয়েই তাদের জীবন। তবু তারা সেখানেই থাকে। কারণ থাকার মতো নিরাপদ জায়গা নেই।
আমরা যখন ট্রেনে চড়ে শহর পেরিয়ে যাই, জানালার বাইরে হয়তো তাদের ছোট্ট ঘরগুলো চোখে পড়ে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য দৃশ্যটি আমাদের মনে দাগ কাটে। তারপর ট্রেন এগিয়ে যায়, আমরাও এগিয়ে যাই। কিন্তু তাদের জীবন থেকে যায় সেই জায়গাতেই।
এ মানুষগুলোকে উচ্ছেদ করাই সমাধান নয়। পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ মানে এক জায়গার দারিদ্র্যকে অন্য জায়গায় সরিয়ে দেওয়া। আমাদের শহরের উঁচু ভবন, রাস্তা, বাজার, কারখানা সবকিছুর পেছনে রয়েছে অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষের ঘাম। ভোরে শ্রমের বাজারে দাঁড়িয়ে থাকা দিনমজুর জানেন না আজ কাজ পাবেন কি না। কাজ না পেলে হয়তো তার পরিবারের চুলায় আগুন জ্বলবে না। তবুও পরদিন আবার তিনি দাঁড়ান।
এ মানুষগুলো দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ, অথচ তাদের জীবন সবচেয়ে অনিশ্চিত। ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, শ্রমিকের অধিকার এবং সামাজিক সুরক্ষা এসব কোনো দয়া নয় এগুলো শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার। আমরা কখনও কখনও দরিদ্র মানুষের কষ্টকে ক্যামেরাবন্দি করি। তাদের ছবি ছড়িয়ে পড়ে। প্রশংসা আসে। কিন্তু ছবির মানুষটির জীবন কি বদলায়? ছবি মানুষের বিবেককে নাড়া দিতে পারে, কিন্তু পরিবর্তন আনতে প্রয়োজন নীতি, পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ। সাংবাদিক, আলোকচিত্রী, লেখক কিংবা সামাজিক কর্মীদের দায়িত্ব শুধু মানুষের কষ্ট দেখানো নয় সেই কষ্টের পেছনের কারণগুলোও সামনে আনা। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু সমস্যার কথা শোনা নয় সমাধানের পথ তৈরি করা।
বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে দারিদ্র্য ও বৈষম্য পুরোপুরি দূর করা সহজ নয়। কিন্তু তাই বলে আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না। শিশুশ্রম বন্ধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারের জন্য সামাজিক সুরক্ষা বাড়াতে হবে। পথশিশুদের জন্য শুধু আশ্রয়কেন্দ্র নয়, শিক্ষা, খাবার, চিকিৎসা ও পরিবারভিত্তিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। রেললাইন ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলোর জন্য নিরাপদ আবাসন ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। দিনমজুর ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ন্যায্য মজুরি, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তার সুযোগ বাড়াতে হবে।
লেখক : কলামিস্ট।
