নদী বাঁচলে বাঁচবে দেশ
জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন
প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ একটি ব-দ্বীপ রাষ্ট্র, যার ধমনী ও শিরা হলো এর নদ-নদী। প্রাচীনকাল থেকেই এ দেশের সভ্যতা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং জীবনযাত্রা আবর্তিত হয়েছে নদীকে কেন্দ্র করে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, এককালের প্রমত্তা নদীগুলো আজ অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। 'নদী বাঁচলে বাঁচবে দেশ'—এ স্লোগানটি আজ শুধু একটি দেয়ালিকা বা সেমিনারের বিষয় নয়, বরং এটি আমাদের টিকে থাকার লড়াইয়ের প্রধান শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। নদীমাতৃক এই দেশে নদীগুলো যদি তাদের প্রবাহ হারায়, তবে বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে সবুজ শ্যামলিমার চিহ্ন মুছে যেতে খুব বেশি সময় লাগবে না।
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশে একসময় জালের মতো ছড়িয়ে ছিল প্রায় সাত শতাধিক নদ-নদী। বর্তমানে সেই সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে এসেছে। অনেক নদী আজ শুধু কাগজে-কলমে টিকে আছে, বাস্তবে সেখানে ধু-ধু বালুচর অথবা ধানক্ষেত। পদ্মা, মেঘনা, যমুনার মতো বড় নদীগুলোও নাব্যতা সংকটে ধুঁকছে। বর্ষাকালে নদীগুলো রুদ্রমূর্তি ধারণ করলেও শুষ্ক মৌসুমে তারা মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে। ড্রেজিং বা খননকার্যের অভাব এবং উজান থেকে আসা পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়া এই সংকটের অন্যতম কারণ। নদী শুকিয়ে যাওয়ার ফলে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে এবং দেশি প্রজাতির মাছ আজ বিলুপ্তির পথে।
নদী বিপর্যয়ের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো দখল ও দূষণ। এক শ্রেণির প্রভাবশালী অসাধু চক্র নদীর পাড় দখল করে কলকারখানা, ঘরবাড়ি ও বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তুলছে। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ কিংবা বালু নদীর দিকে তাকালে আজ চেনার উপায় নেই যে এগুলো একসময় স্বচ্ছ পানির আধার ছিল। শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য, পয়ঃনিষ্কাশনের বর্জ্য এবং পলিথিন-প্লাস্টিকের ভারে নদীগুলোর তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ট্যানারি ও টেক্সটাইল খাতের অপরিশোধিত রাসায়নিক বর্জ্য নদীর পানিকে কুচকুচে কালো ও বিষাক্ত করে তুলেছে, যা জলজ প্রাণীর জন্য যমদূত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর, আর কৃষি সরাসরি নদীর ওপর নির্ভরশীল। নদীগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় সেচ কাজ ব্যাহত হচ্ছে। ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত বিপর্যয়ের সংকেত। অন্যদিকে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে ফসলি জমি চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। নৌপথ বাংলাদেশের সবচেয়ে সাশ্রয়ী পরিবহন ব্যবস্থা। নদীগুলো নাব্যতা হারালে পণ্য পরিবহন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যায়, যা জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক প্রভাবে বাংলাদেশ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। হিমালয়ের বরফ গলা পানি এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি—এই দুইয়ের মাঝে ঢাল হিসেবে কাজ করে আমাদের নদীগুলো। নদী যদি তার ধারণক্ষমতা হারায়, তবে অতিবৃষ্টির ফলে সৃষ্ট বন্যার প্রকোপ বাড়বে এবং পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হওয়ায় পানি দ্রুত লোকালয়ে ঢুকে পড়বে। নদী শাসন ও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ নদী ভাঙনের শিকার হয়ে নিঃস্ব হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নদীগুলোকে পুনর্জীবিত করার কোনো বিকল্প নেই।
বাংলাদেশের উচ্চ আদালত নদীকে 'জীবন্ত সত্তা' হিসেবে ঘোষণা করেছে, যা নদী রক্ষায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। তবে আইনের প্রয়োগ এবং মাঠ পর্যায়ের তদারকি এখনও আশানুরূপ নয়। নদী রক্ষায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। সাধারণ মানুষকে বোঝাতে হবে যে, নদীকে দূষিত করা মানে নিজের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করা। পাঠ্যপুস্তকে নদী ও পরিবেশ শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে নদী রক্ষা কমিটিগুলোকে আরও সক্রিয় করতে হবে। দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং উচ্ছেদ অভিযান নিয়মিত পরিচালনা করা জরুরি।
নদী বাঁচাতে হলে দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই পরিকল্পনা প্রয়োজন। সরকারকে ড্রেজিং কার্যক্রম জোরদার করতে হবে এবং ড্রেজ করা মাটি যাতে আবার নদীতে ফিরে না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি শিল্পকারখানায় বর্জ্য শোধনাগার বাধ্যতামূলক করতে হবে। এছাড়া, অভিন্ন নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করতে হবে। দেশের নদীগুলোর একটি ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করে নিয়মিত স্যাটেলাইট মনিটরিংয়ের মাধ্যমে দখল ও দূষণ রোধ করা সম্ভব।
নদী শুধু একটি জলাধার নয়, নদী বাংলাদেশের প্রাণ। এ প্রাণস্পন্দন থেমে গেলে এ দেশ মরুভূমিতে পরিণত হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে হলে আমাদের নদীগুলোকে তাদের হারানো যৌবন ফিরিয়ে দিতেই হবে। সরকার, প্রশাসন এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে আমাদের নদীগুলোকে রক্ষা করতে। মনে রাখতে হবে, নদী বাঁচলে পরিবেশ বাঁচবে, আর পরিবেশ বাঁচলেই কেবল বাংলাদেশ দীর্ঘকাল পৃথিবীতে টিকে থাকবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
