ভেজাল খাদ্যের বিরুদ্ধে আমাদের নীরব আত্মসমর্পণ

হাবিবুর রহমান সাগর

প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষের সবচেয়ে মৌলিক প্রয়োজন খাদ্য। ক্ষুধা নিবারণ আর শরীরকে শক্তি জোগানোর জন্যই আমরা প্রতিদিন বাজারে যাই, টাকা খরচ করে খাবার কিনি, নিজের ও পরিবারের সদস্যদের হাতে তুলে দিই। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি নীরব বিশ্বাস কাজ করে আমরা ধরে নিই, যা কিনছি তা আমাদের ক্ষতি করবে না। কিন্তু বাংলাদেশে আজ এই বিশ্বাসটাই সবচেয়ে বড় ঝুঁকির নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারের রঙিন, চকচকে সাজানো পণ্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে এমন কিছু, যা ধীরে ধীরে শরীরের ভেতরে বিষের মতো কাজ করে। ভেজাল খাদ্য এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয় এটি একটি কাঠামোগত সংকট, যা আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে একসঙ্গে আঘাত করছে। সমস্যাটি নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে সংবাদমাধ্যমে ভেজাল খাদ্যের খবর প্রকাশিত হচ্ছে, প্রশাসন অভিযান চালাচ্ছে, জরিমানা আদায় হচ্ছে, কখনও কখনও কারখানা সিলগালা করা হচ্ছে। তারপরও প্রশ্নটি থেকেই যায় এত আইন, এত অভিযান, এত জরিমানার পরও কেন বাজার থেকে ভেজাল সম্পূর্ণ দূর হচ্ছে না? পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যায়, সমস্যাটি কতটা গভীর। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাত্র সাত মাসে সারাদেশে এক হাজার দুইশ দশটি খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এই সংখ্যাটি শুনতে বড় মনে হলেও, বাংলাদেশের মতো প্রায় সতেরো কোটি মানুষের একটি দেশে, যেখানে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ খাদ্যপণ্য উৎপাদিত ও বিক্রি হচ্ছে, তার তুলনায় এই নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা নিতান্তই সামান্য। অন্য একটি পরীক্ষায় দেখা গেছে, পরীক্ষিত নমুনার প্রায় ৩৩ শতাংশেরও বেশি খাবারে ভেজাল বা দূষণের প্রমাণ মিলেছে অর্থাৎ প্রতি তিনটি নমুনার একটিতেই সমস্যা ধরা পড়ছে। রমজান মাসে বিশেষ অভিযানে সাড়ে সাতশর বেশি নমুনার মধ্যে প্রায় পঞ্চাশটিতে ভেজাল পাওয়া গেছে, একটি কারখানা সিলগালা করতে হয়েছে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে মিলিয়ে তেরো লাখের বেশি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ সংখ্যাগুলো শুধু সরকারি পরিসংখ্যান, বাস্তবতা আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন। কারণ যেসব নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে, তা মূলত শহরাঞ্চল এবং বড় বাজারকেন্দ্রিক। গ্রামাঞ্চলে, মফস্বল শহরে বা ছোট বাজারে কী পরিমাণ ভেজাল পণ্য বিক্রি হচ্ছে, তার কোনো নির্ভরযোগ্য জাতীয় জরিপ নেই। ফলে যে সংখ্যাগুলো আমরা দেখছি, তা বরফখণ্ডের শুধু উপরের অংশ মাত্র। আরও একটি উদ্বেগজনক তথ্য হলো- ভোজ্যতেলের বাজার নিয়ে। সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন এই ছয় মাসে দেশে সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে পাঁচ লাখ ষাট হাজার টন, আর পাম অয়েল আমদানি হয়েছে সাত লাখ ষাট হাজার টন। অর্থাৎ সয়াবিনের চেয়ে প্রায় দুই লাখ টন বেশি পাম অয়েল দেশে ঢুকেছে। অথচ বাজারে খুচরা পর্যায়ে পাম অয়েল তেমন চোখেই পড়ে না বোতলজাত প্রায় সবকিছুতেই লেখা থাকে 'সয়াবিন তেল'। এই বৈপরীত্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, সস্তা পাম অয়েলকে সয়াবিন তেল হিসেবে বাজারজাত করে ভোক্তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে ব্যাপক মাত্রায় এবং এটি শুধু ভেজাল নয়, একধরনের সংঘবদ্ধ বাণিজ্যিক প্রতারণা। বাংলাদেশে ভেজালের তালিকা করতে বসলে তা প্রায় দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার পুরোটাই ঢেকে ফেলে। দুধে মেশানো হয় ফরমালিন, ডিটারজেন্ট ও সোডা, যাতে তা দীর্ঘ সময় নষ্ট না হয় এবং ঘন দেখায়। মাছ ও ফলমূল সংরক্ষণে ব্যবহৃত হচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক, যাতে পচন ঠেকিয়ে দীর্ঘ সময় বাজারে সতেজ রাখা যায়। মাংসে ইনজেকশনের মাধ্যমে পানি বা রাসায়নিক প্রবেশ করানো হয়, যাতে ওজন বেড়ে যায় এবং ব্যবসায়ী বেশি মুনাফা করতে পারেন। শিশুখাদ্যেও মেশানো হচ্ছে ক্ষতিকর রং ও স্টার্চ যা সবচেয়ে উদ্বেগজনক, কারণ শিশুদের শরীর এসব রাসায়নিকের ক্ষতিকর প্রভাব প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় অনেক দ্রুত ও গুরুতরভাবে বহন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় উঠে এসেছে আরও চমকে দেওয়ার মতো তথ্য রাজধানীতে বিক্রি হওয়া মিষ্টান্নের প্রায় নব্বই শতাংশেই ক্ষতিকর রং ও সংরক্ষণকারী রাসায়নিক পদার্থ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ উৎসব-পার্বণে বা অতিথি আপ্যায়নে যে মিষ্টি আমরা আনন্দের সঙ্গে খাই, তার প্রায় প্রতিটিই আসলে দীর্ঘমেয়াদে শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। একই সঙ্গে মসলা, লবণ, চিনি, কোমল পানীয়, ভাজাপোড়া ও প্রক্রিয়াজাত খাবারেও ভেজাল ও ক্ষতিকর উপাদান মেশানোর প্রবণতা ব্যাপক। তিল, গুড়, ঘি, মাওয়ার মতো ঐতিহ্যবাহী খাদ্যপণ্যেও ভেজাল ধরা পড়ছে নিয়মিত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চালানো অভিযানে এসব পণ্যে চিনি মিশ্রিত গুড়, ভেজাল হাইড্রোজ এমনকি পচা উপকরণ ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে।

লেখক : শিক্ষার্থী

জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ,জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়