জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ

ড. লিপন মুস্তাফিজ

প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে জ্বালানির কোনো বিকল্প নেই। শিল্পকারখানা, কৃষি সেচ, পণ্য সরবরাহ, বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির প্রয়োজন। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে একটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবনও জ্বালানি ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। তাই জ্বালানি শুধু একটি পণ্য নয়; এটি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে পরিক্ষীত। বাংলাদেশ গত কয়েক দশক ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিদ্যুৎ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। এ অগ্রগতির পাশাপাশি জ্বালানির জন্য আমাদের আমদানি নির্ভরতাও বেড়েছে। দেশে গ্যাস উৎপাদন কমে যাবার কারণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহনের জন্য তেল ও কয়লাও আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে এসে পড়ে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পের জন্য আমদানিকৃত এলএনজির ওপর গুরুত্বপূর্ণভাবে নির্ভরশীল। সুতরাং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে তা আমাদের দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে এখন শুধু বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রশ্ন নয়। বড় প্রশ্ন হলো কীভাবে কম খরচে, নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিত করা যায় এবং একই সঙ্গে আমদানি নির্ভরতার ঝুঁকি কমানো যায়। জ্বালানি আমদানি পৃথিবীর অনেক দেশকে করতে হয়। তাই আমদানি নিজে কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন অর্থনীতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদানের জন্য একটি দেশ আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে এ বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জ্বালানি আমদানির জন্য আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, কয়লা বা এলএনজির দাম বেড়ে গেলে একই পরিমাণ জ্বালানি কিনতে আগের তুলনায় বেশি ডলার প্রয়োজন হয়। শিল্পের কাঁচামাল, মূলধনী যন্ত্রপাতি, ওষুধ, খাদ্যসহ বহু প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির জন্যও বৈদেশিক মুদ্রা দরকার। ফলে জ্বালানি আমদানির ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে অন্য আমদানির ওপরও চাপ তৈরি হয়। বিশ্বব্যাংকের একটি প্রকল্প নথি অনুযায়ী, বাংলাদেশে এলএনজি আমদানিতে বছরে প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়, যার মধ্যে আমদানি শুল্ক ও রিগ্যাসিফিকেশন ব্যয়ও রয়েছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে বিষয়টি শুধু জ্বালানি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি দেশের ডলারের চাহিদা বাড়ায়, আমদানি ব্যয় বাড়ায় এবং বৈদেশিক লেনদেনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এর প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনেও দ্রুত পৌঁছে যায়। জ্বালানির দাম বাড়লে প্রথমে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। পণ্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিতে খরচ হয় আগের তুলনায় অনেক বেশি। বৃদ্ধি পায় শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচ, সেচ খরচ। পণ্য সংরক্ষণ ও বাজারজাত করণের ব্যয়ও বেড়ে যায় অনেকসময়। এই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়ে। ফলে খাদ্যপণ্য, পোশাক, নির্মাণসামগ্রী, পরিবহন ও বিভিন্ন সেবার দাম বৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়। এভাবেই জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারের একটি মূল্যবৃদ্ধি ধীরে ধীরে দেশের অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলে। বিশ্বব্যাংক ২০২৬ সালের বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদে বলেছে, দীর্ঘস্থায়ী বৈশ্বিক অস্থিরতা বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে, জ্বালানি ভর্তুকির কারণে সরকারের আর্থিক পরিসর সংকুচিত করতে পারে এবং উচ্চ আমদানি ব্যয়ের ফলে চলতি হিসাবেও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর। কারণ তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য, পরিবহন, বাসস্থান ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় হয়। জ্বালানি ব্যয়ের কারণে বাজারে পণ্যের দাম বাড়লে তাদের প্রকৃত আয় কমে যায়। অর্থাৎ বেতন বা আয় একই থাকলেও সেই আয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য ও সেবা কেনা সম্ভব হয়। বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি ব্যবস্থায় গ্যাসের গুরুত্ব অনেক। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প দুই ক্ষেত্রেই গ্যাসের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। কিন্তু দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে আসায় এলএনজি আমদানির প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, দেশীয় গ্যাসের মজুত কমে আসার কারণে মধ্যমেয়াদে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় এলএনজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই এলএনজি আমদানি বন্ধ করে দেওয়া কোনো বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। বরং প্রয়োজন হলো সঠিক সময়ে, সঠিক দামে এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে এলএনজি সংগ্রহ করা। বিশ্বব্যাংকও ব্যয়বহুল স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এলএনজি সংগ্রহের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি কিছুটা কমানো সম্ভব। তবে দীর্ঘমেয়াদে শুধু এলএনজির ওপর নির্ভর করাও নিরাপদ নয়। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। বিশেষ করে সমুদ্রাঞ্চলে গ্যাস অনুসন্ধানের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। দেশীয় উৎসে নতুন গ্যাস পাওয়া গেলে আমদানির ওপর চাপ কমবে এবং শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহের নিশ্চয়তাও বাড়তে পারে। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গত দেড় দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিদ্যুৎপ্রাপ্তির ক্ষেত্রেও বড় অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেই বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। প্রশ্ন হলো, সেই বিদ্যুৎকেন্দ্রে পর্যাপ্ত জ্বালানি আছে কি না এবং সেই জ্বালানি কতটা সাশ্রয়ী। গ্যাসের সরবরাহ না থাকলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারে না। আবার গ্যাসের পরিবর্তে ব্যয়বহুল তরল জ্বালানি ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বেড়ে যায়। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, গ্যাস সরবরাহের নিরাপত্তার ঘাটতি বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে, কারণ বিকল্প জ্বালানিতে উৎপাদন ব্যয় বেশি। এ কারণে বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, কম খরচে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন। জ্বালানি আমদানির আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে সরকারের ওপর। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে সরকার যদি সেই বাড়তি খরচের পুরোটা ভোক্তার ওপর দিতে না চায়, তাহলে ভর্তুকির প্রয়োজন হয়। স্বল্পমেয়াদে এটি সাধারণ মানুষকে মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা থেকে কিছুটা রক্ষা করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত ভর্তুকি সরকারের আর্থিক ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। সরকারের অর্থ সীমাহীন নয়। জ্বালানি খাতে বাড়তি ভর্তুকি দিতে হলে একই অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা কিংবা অন্যান্য উন্নয়নমূলক খাতে কম ব্যয় করতে হতে পারে। বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উচ্চ জ্বালানি ব্যয় ও ভর্তুকির কারণে সরকারের আর্থিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকির কথা বলেছে। আইএমএফও ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি ভর্তুকির পরিবর্তে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তাদের মতে, সর্বজনীন ভর্তুকির সুবিধা অনেক সময় উচ্চ আয়ের মানুষও পেয়ে থাকে। বরং দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সরাসরি ও লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়া তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর। বাংলাদেশের জন্য তাই জ্বালানি মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্য প্রয়োজন। একদিকে মূল্য এমন হতে হবে যাতে জ্বালানি খাত আর্থিকভাবে টেকসই থাকে, অন্যদিকে নিম্ন আয়ের মানুষ যেন হঠাৎ বড় ধরনের মূল্যধাক্কায় পড়ে না যায়। এ ভারসাম্য তৈরি করাই নীতি নির্ধারকদের বড় চ্যালেঞ্জ। জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে শিল্পায়নের সম্পর্কও অত্যন্ত গভীর। বাংলাদেশ যদি আগামী দিনে আরও বেশি শিল্প গড়ে তুলতে চায়, রপ্তানি বহুমুখীকরণ করতে চায় এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে চায়, তাহলে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। একটি শিল্পকারখানায় প্রতিদিন যদি গ্যাস বা বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকে, তাহলে উৎপাদন ব্যাহত হয়। উৎপাদন কমে গেলে প্রতি ইউনিট পণ্যের খরচ বাড়ে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়। রপ্তানি আদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একজন উদ্যোক্তা তখন নতুন বিনিয়োগের ব্যাপারে স্বাভাবিকভাবেই সতর্ক হয়ে পড়বেন। বিশ্বব্যাংকের তথ্যেও বাংলাদেশের শিল্প খাতের ওপর অপর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের নেতিবাচক প্রভাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাই জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিষয় নয়; এটি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। আমদানি নির্ভরতার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে বেশি ডলার প্রয়োজন হয়। একই সময়ে যদি ডলারের সরবরাহ না বাড়ে, তাহলে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ সৃষ্টি হয়। এর প্রভাব বিনিময় হারেও পড়তে পারে। স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন হলে আমদানি করা জ্বালানির স্থানীয় মুদ্রায় দাম আরও বেড়ে যায়। তখন একটি চক্র তৈরি হয় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ে, বেশি ডলার প্রয়োজন হয়, ডলারের চাহিদা বাড়ে, বিনিময় হারে চাপ পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত আমদানি করা জ্বালানির স্থানীয় মূল্য আরও বেড়ে যায়। এই চক্র ভাঙতে হলে একদিকে জ্বালানি আমদানির ঝুঁকি কমাতে হবে, অন্যদিকে রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স বাড়িয়ে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ শক্তিশালী করতে হবে। এখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির গুরুত্বও বাড়ছে। বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। শিল্পকারখানার ছাদে সৌরপ্যানেল স্থাপন, বাড়ি ও প্রতিষ্ঠানে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, সৌর সেচ এবং বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে ধীরে ধীরে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর চাপ কমানো সম্ভব। তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে কিছু বাস্তব সমস্যাও রয়েছে। জমির সীমাবদ্ধতা, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা, স্টোরেজ প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ ব্যয় এসব বিষয়কে বিবেচনায় রেখেই পরিকল্পনা করতে হবে। শুধু লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেই হবে না; বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতি ও বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জ্বালানি দক্ষতা। নতুন নতুন জ্বালানি উৎস খোঁজার পাশাপাশি বর্তমানে যে জ্বালানি ব্যবহার করা হচ্ছে, তার অপচয় কমাতে হবে। শিল্পকারখানায় আধুনিক মোটর, বয়লার ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা গেলে একই পরিমাণ উৎপাদনে কম জ্বালানি প্রয়োজন হবে। ভবনগুলোতে শক্তি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায়। বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণে অপচয় কমানো যায়। গণপরিবহন উন্নত করা গেলে জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতাও বাড়ানো সম্ভব। এর অর্থ হলো, একই পরিমাণ জ্বালানি দিয়ে বেশি উৎপাদন করা। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যে জ্বালানি কিনতে আমাদের ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে, সেটি যদি দক্ষতার মাধ্যমে কম ব্যবহার করা যায়, তাহলে একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় ও উৎপাদন ব্যয় কমবে।

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখন কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়াতে হবে এবং বিশেষ করে সমুদ্রাঞ্চলে অনুসন্ধানের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, এলএনজি আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি ও প্রতিযোগিতামূলক চুক্তি বাড়াতে হবে, যাতে স্পট মার্কেটের অস্থিরতার ওপর অতিরিক্তনির্ভর করতে না হয়। তৃতীয়ত, সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। চতুর্থত, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করতে হবে। পঞ্চমত, জ্বালানি ভর্তুকিকে ধীরে ধীরে লক্ষ্যভিত্তিক করতে হবে। ষষ্ঠত, শিল্পকারখানায় জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহ দিতে হবে। এর পাশাপাশি জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনাকে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি। কখন কত জ্বালানি আমদানি হবে, কত বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে— এসব বিষয় আগে থেকেই পরিকল্পনায় রাখতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জ্বালানি নীতিকে শুধু জ্বালানি খাতের নীতি হিসেবে দেখা যাবে না। এটি আসলে একটি অর্থনৈতিক নীতি। জ্বালানির দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি বাড়ে, আমদানি ব্যয় বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ পড়ে, ভর্তুকি বাড়লে সরকারের বাজেট চাপে পড়ে এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়লে শিল্প ও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে আইএমএফও বলেছে, বাংলাদেশের ওপর বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্যমূল্যের চাপ আমদানি ও ভর্তুকি ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং এর ফলে মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। তাই জ্বালানি নিরাপত্তাকে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবেই দেখতে হবে। বাংলাদেশের সামনে জ্বালানি খাতে চ্যালেঞ্জ রয়েছে, কিন্তু সম্ভাবনাও কম নয়। আমদানিনির্ভরতা একদিনে কমানো সম্ভব নয়। তবে ধীরে ধীরে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করা, জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো, দীর্ঘমেয়াদি আমদানি চুক্তি করা এবং ভর্তুকি ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার মাধ্যমে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। জ্বালানি নিরাপত্তা মানে শুধু ঘরে আলো জ্বালানো নয়। এর সঙ্গে শিল্পকারখানা সচল রাখা, মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা এবং অর্থনীতিকে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক ধাক্কা মোকাবিলায় আরও শক্তিশালী করে তোলার বিষয়টি জড়িত।

বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে আমরা আজকের জ্বালানি সমস্যাকে কতটা দূরদর্শিতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারি তার ওপর। কম আমদানিনির্ভরতা, সাশ্রয়ী জ্বালানি, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ এবং নবায়নযোগ্য শক্তির সমন্বিত ব্যবস্থাই পারে দেশের অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক করতে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাই শুধু জ্বালানি খাতের দায়িত্ব নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষার একটি অপরিহার্য শর্ত।

 

লেখক : ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ এবং সহযোগী অধ্যাপক (খণ্ডকালীন), সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়