হাসপাতালবিহীন রাঙ্গাবালীর স্বাস্থ্য সংকট

নিয়ামুর রশিদ শিহাব

প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের দক্ষিণের জেলা পটুয়াখালীর মানচিত্রে নদী-সাগরবেষ্টিত এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের নাম রাঙ্গাবালী। উত্তরে আগুনমুখা নদী, পূর্বে বুড়াগৌরাঙ্গ, পশ্চিমে রাবনাবাদ নদী এবং দক্ষিণে উত্তাল বঙ্গোপসাগর দ্বারা পরিবেষ্টিত এই জনপদটি মূল ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। ২০১২ সালে উপজেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা রাঙ্গাবালীর বয়স এক যুগের বেশি পার হয়েছে। অথচ এ দীর্ঘ সময়েও এখানকার প্রায় দেড় লাখ মানুষের ভাগ্য বদলায়নি। চিকিৎসাসেবার মতো একটি মৌলিক ও জীবন রক্ষাকারী অধিকার থেকে আজও তারা বঞ্চিত। হাসপাতালবিহীন উপজেলা হিসেবে রাঙ্গাবালীর বর্তমান চিত্র অত্যন্ত করুণ, যা যেকোনো সংবেদনশীল মানুষকে ভাবিয়ে তোলে। একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালের অভাবে রাঙ্গাবালীর বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবন এক চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়। স্থানীয়দের জন্য আধুনিক চিকিৎসা তো দূরের কথা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়াও অনেক সময় দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায়। উপজেলা ঘোষণার পর থেকেই এখানে একটি সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দাবি জানিয়ে আসছে সাধারণ মানুষ। দীর্ঘ আন্দোলনের পর ২০২৩ সালের জুলাইয়ে এসে অবশেষে ৫০ শয্যার একটি হাসপাতাল নির্মাণের কাজ শুরু হয়। স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে প্রায় ১২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্পের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, নানা জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এবং পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাবে ২০২৪ সালের জুনে চতুর্থ অপারেশনাল প্ল্যানের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকেই এর নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে। ফলে শূন্যে ঝুলে আছে দ্বীপবাসীর একমাত্র ভরসাস্থল এই হাসপাতালের ভবিষ্যৎ। রাঙ্গাবালীর চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষের দুর্দশার মূল কারণ শুধু হাসপাতালের অভাব নয়, এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এখানকার ভঙ্গুর যোগাযোগব্যবস্থা। জেলা সদর থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই দ্বীপ উপজেলায় যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম স্পিডবোট, ছোট ট্রলার কিংবা লঞ্চ। কিন্তু এগুলোর কোনো নির্দিষ্ট শিডিউল বা সময়সূচি নেই। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে, বিশেষ করে বর্ষাকালে বা ঝড়-বৃষ্টির সময় নদীপথ সম্পূর্ণ বিপজ্জনক হয়ে পড়ে এবং সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ থাকে। এ পরিস্থিতিতে কোনো রোগী হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে নদী পার করে গলাচিপা কিংবা কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার কোনো উপায় থাকে না। ফলশ্রুতিতে ঘটে মর্মান্তিক সব দুর্ঘটনা। গর্ভবতী নারী কিংবা হৃদরোগে আক্রান্ত কোনো রোগীকে নিয়ে উত্তাল আগুনমুখা বা রাবনাবাদ নদী পাড়ি দেওয়ার সময় পথেই অনেকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এ উপজেলার অনেকের ভাষ্যমতে, জরুরি চিকিৎসা নিতে গিয়ে পথেই গর্ভবতী মা ও অনাগত সন্তানের মৃত্যুর ঘটনা এখানে নিয়মিত চিত্র। এমন অসংখ্য অকাল মৃত্যুর সাক্ষী রাঙ্গাবালীর প্রমত্তা নদীগুলো। যারা চিকিৎসার জন্য শিশু সন্তানকে নিয়ে জেলা সদরে যান, তাদেরও নদী পারাপারের সেই ভয়ংকর লড়াই চালিয়েই বাড়ি ফিরতে হয়। চিকিৎসার এ মৌলিক সংকট দূর করতে বর্তমানে গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের অধীনে রাঙ্গাবালীর চিকিৎসাকার্য পরিচালনার চেষ্টা চলছে। তবে সেখানেও রয়েছে তীব্র লোকবল ও কাঠামোগত সংকট। এখানকার মানুষের সেবায় কিছু ইউনিয়নে স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলেও বাস্তবে তার সুফল মেলে না। মৌডুবি ইউনিয়নে কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রই নেই। পাঁচজন চিকিৎসকের পদ থাকলেও কর্মরত আছেন একজন। বড়বাইশদিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাবে দীর্ঘকাল ধরে তালাবদ্ধ। ছয়জন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের বিপরীতে আছেন তিনজন। যথাযথ চিকিৎসাসেবা ও হাসপাতালের অনুপস্থিতিতে স্থানীয়রা বাধ্য হয়ে অপচিকিৎসার শিকার হচ্ছেন। হাতুড়ে চিকিৎসক, স্থানীয় ওঝা, ঝাড়ফুঁক কিংবা পানি পড়ার ওপর অনেক সময় নির্ভর করতে হয় প্রান্তিক মানুষকে। কোনো ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই যত্রতত্র অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে এখানকার মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে চলেছে। সামান্য সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত শিশুকে নিয়েও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অভিভাবককে নদী পাড়ি দিতে হয়। সংবিধানপ্রদত্ত নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা অন্যতম। অথচ প্রশাসনিক উদাসীনতা ও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে এই জনপদের মানুষ আজও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার প্রান্তিক সীমায় অবস্থান করছে। এই অচলাবস্থা ভাঙতে হলে কেবল প্রশাসনিক সহানুভূতি নয়, প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট নীতিগত ও অবকাঠামোগত হস্তক্ষেপ। প্রথমত, অবিলম্বে বন্ধ থাকা ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালটির নির্মাণকাজের ওপর থেকে সমস্ত জটিলতা দূর করে নতুন বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। কাজের গুণগত মান বজায় রেখে দ্রুততম সময়ে এর নির্মাণকাজ শেষ করে তা দৃশ্যমান ও চালু করতে হবে, যাতে দ্বীপের মানুষকে আর চিকিৎসার জন্য নদী পার হওয়ার ঝুঁকি নিতে না হয়। দ্বিতীয়ত, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কথা বিবেচনা করে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে রাঙ্গাবালী ও মূল ভূখণ্ডের (গলাচিপা/কলাপাড়া) মধ্যে চলাচলের জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের অধীনে সার্বক্ষণিক একটি বিশেষ 'অ্যাম্বুলেন্স বোট' বা আধুনিক নৌযানের স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে।

যেখানে থাকবে অক্সিজেন সিলিন্ডার, প্রাথমিক জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্যারামেডিকস। তৃতীয়ত, উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রের তীব্র সংকট কাটাতে হবে। বিশেষ করে যেসব ইউনিয়নে কোনো কার্যকর চিকিৎসাকেন্দ্র নেই, সেখানে অবিলম্বে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন এবং পালাক্রমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সঙ্গে হাতুড়ে ডাক্তার ও অপচিকিৎসার দৌরাত্ম্য বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি বাড়াতে হবে এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে চিকিৎসাসেবা থেকে কোনো একটি অঞ্চলের মানুষ বছরের পর বছর বঞ্চিত থাকবে— এটি কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। রাঙ্গাবালীর দেড় লাখ মানুষ করুণা চায় না, তারা চায় তাদের মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি। শুধু কাগজে-কলমে নয়, দ্রুততম সময়ের মধ্যে বন্ধ থাকা হাসপাতালের নির্মাণকাজ পুনঃরায় চালু করে তা দৃশ্যমান করতে হবে।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং

গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ