দূরপাল্লার বাসে সিটবেল্ট : সময়ের দাবি

রিয়াজুল হক

প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দূরপাল্লার বাসে যাতায়াত আমাদের দেশের কোটি মানুষের নিত্যদিনের বিষয়। কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, রোগী, পর্যটক ইত্যাদি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রতিদিন এক জেলা থেকে অন্য জেলায়, এমনকি দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বাসে যাতায়াত করেন। কিন্তু এই দীর্ঘ যাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে আছে সড়ক দুর্ঘটনার একটি বড় ঝুঁকি। বিশেষ করে দ্রুতগতির বাস দুর্ঘটনায় পড়লে অনেক সময় হতাহতের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। কেউ প্রাণ হারান, কেউ গুরুতর আহত হন, আবার কেউ আজীবনের জন্য পঙ্গুত্বের শিকার হন।

দুর্ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ করা হয়তো সব সময় সম্ভব নয়। চালকের অসতর্কতা, অতিরিক্ত গতি, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, রাস্তার ত্রুটি, অন্য যানবাহনের ভুল কিংবা হঠাৎ কোনো প্রতিবন্ধকতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। তাই দুর্ঘটনা প্রতিরোধের পাশাপাশি দুর্ঘটনা ঘটলে তার ক্ষয়ক্ষতি কীভাবে কমানো যায়, সেটিও আমাদের ভাবতে হবে। আর এখানেই দূরপাল্লার বাসে সিটবেল্টের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

একটি বাস স্বাভাবিক গতিতে চলার সময় যাত্রী হয়তো নিজের আসনে আরাম করে বসে আছেন। কেউ ঘুমাচ্ছেন, কেউ মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন, কেউ বই পড়ছেন, আবার কেউ জানালার বাইরে তাকিয়ে আছেন। কিন্তু হঠাৎ বাসটি কোনো কিছুর সঙ্গে ধাক্কা খেলে বা জরুরি ব্রেক করলে, যাত্রীর নিজের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ কার্যত থাকে না। বাসের গতি যত বেশি, আকস্মিক ধাক্কার সময় যাত্রীর শরীর তত বেশি শক্তির সঙ্গে সামনে বা পাশে ছিটকে যেতে পারে।

সামনের সিট, জানালার অংশ, বাসের ভেতরের কোনো শক্ত কাঠামো কিংবা অন্য যাত্রীর শরীরের সঙ্গে আঘাত লাগতে পারে। বিশেষ করে ঘুমন্ত যাত্রীদের ক্ষেত্রে বিপদের মাত্রা আরও বেশি হতে পারে। কারণ দুর্ঘটনার মুহূর্তে তারা পরিস্থিতি বুঝে শরীরকে প্রস্তুত করার সুযোগ পান না। সিটবেল্টের মূল কাজ হলো দুর্ঘটনার সময় যাত্রীর শরীরকে তার আসনের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে স্থির রাখা। ফলে সামনে ছিটকে যাওয়া বা আসন থেকে উঠে গিয়ে কোনো শক্ত অংশে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি কমে। অর্থাৎ সিটবেল্ট দুর্ঘটনা ঠেকাতে পারে না; কিন্তু দুর্ঘটনার পর আঘাতের মাত্রা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দূরপাল্লার বাস দুর্ঘটনার অন্যতম ভয়াবহ দৃশ্য হলো বাসের একাধিকবার উল্টে যাওয়া বা 'পল্টি খাওয়া'। কোনো বাস রাস্তা থেকে ছিটকে পড়ে কয়েকবার গড়িয়ে গেলে বাসের ভেতরের যাত্রীদের শরীরও প্রচণ্ডভাবে নড়াচড়া করতে থাকে। একজন যাত্রী তার আসন থেকে ছিটকে অন্য যাত্রীর ওপর পড়তে পারেন। কেউ সামনের দিকে ছিটকে যেতে পারেন, কেউ পাশের দিকে, আবার কেউ বাসের ভেতরের অন্য কোনো শক্ত অংশে আঘাত পেতে পারেন।

এ ধরনের দুর্ঘটনায় শুধু বাসের বাইরের আঘাত নয়, যাত্রীদের একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষও বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে। একজনের শরীরের সঙ্গে অন্যজনের মাথা, ঘাড়ে আঘাত লাগতে পারে। অনেকে আসন থেকে ছিটকে গিয়ে এমন অবস্থানে আটকে পড়েন, যেখান থেকে উদ্ধার করাও কঠিন হয়ে যায়। এখানেও সিটবেল্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষাব্যবস্থা হতে পারে।

সিটবেল্ট পরা থাকলে যাত্রী তার নির্ধারিত আসনের সঙ্গে সংযুক্ত থাকেন।

বাস দুর্ঘটনায় পড়লেও শরীরের অনিয়ন্ত্রিত ছিটকে যাওয়ার প্রবণতা কমে। ফলে অন্য যাত্রীর সঙ্গে সংঘর্ষ কিংবা বাসের বিভিন্ন শক্ত অংশে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। অবশ্যই মনে রাখতে হবে, সিটবেল্ট কোনো জাদুকরী সুরক্ষাব্যবস্থা নয়। অত্যন্ত ভয়াবহ দুর্ঘটনায় সিটবেল্ট পরা থাকলেও একজন যাত্রী আহত হতে পারেন। কিন্তু ঝুঁকি কমানোর জন্য যে কয়েকটি ব্যবস্থা কার্যকর, সিটবেল্ট তার অন্যতম।

শুধু যাত্রী নয়, বাসচালকের জন্যও সিটবেল্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন চালক দুর্ঘটনার মুহূর্তে নিজের আসন থেকে ছিটকে গেলে বাসের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে যেতে পারে। এমনকি দুর্ঘটনার আগমুহূর্তে বাসকে নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রেও চালকের স্থিতিশীল অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুতগতিতে চলন্ত বাসের চালককে হঠাৎ ব্রেক করা, স্টিয়ারিং ঘোরানো কিংবা কোনো প্রতিবন্ধকতা এড়ানোর মতো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। চালক যদি নিজের আসনে সঠিকভাবে অবস্থান করতে পারেন, তাহলে স্টিয়ারিং ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়। তাই চালকের সিটবেল্ট শুধু চালকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় নয়, এটি বাসের সব যাত্রীর নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

দূরপাল্লার বাসে সিটবেল্ট চালু করলেই সড়ক দুর্ঘটনার সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। সড়ক নিরাপত্তা একটি সমন্বিত বিষয়। অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণ, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত চালক নিয়োগ, চালকের পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন বন্ধ করা, মহাসড়কে নিরাপদ ওভারটেকিং নিশ্চিত করা, যাত্রী ওঠানামার ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা এবং সড়কের অবকাঠামোগত উন্নয়ন— সবকিছুর সমন্বিত প্রয়াস প্রয়োজন। তবে এসবের পাশাপাশি সিটবেল্টকে উপেক্ষা করা আদৌ উচিত নয়।

একটি দুর্ঘটনা ঘটার আগে আমরা জানি না, কখন বিপদ আসবে। কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটলে শরীরকে নিজের আসনের সঙ্গে ধরে রাখার একটি ব্যবস্থা আমাদের হাতে রয়েছে। সেটি ব্যবহার না করার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না।

এক্ষেত্রে বাসমালিক এবং পরিবহন কর্তৃপক্ষেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দূরপাল্লার বাসে কার্যকর ও মানসম্মত সিটবেল্ট সংযুক্ত করা, সেগুলো নিয়মিত পরীক্ষা করা এবং যাত্রীদের সিটবেল্ট ব্যবহারে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। শুধু সিটবেল্ট লাগিয়ে দিলেই হবে না, সেটি যেন ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় থাকে এবং যাত্রীরা কীভাবে ব্যবহার করবেন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

গাড়িতে বসলে অনেক দেশেই সিটবেল্ট ব্যবহারকে স্বাভাবিক অভ্যাস হিসেবে দেখা হয়। তাহলে দূরপাল্লার বাসে উঠলে আমরা কেন সেটিকে প্রয়োজনীয় করে তুলব না? বিশেষ করে রাতের বাসে অনেক যাত্রী ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুমন্ত অবস্থায় দুর্ঘটনা হলে নিজের শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। তাই দূরপাল্লার বাসে যাত্রার শুরুতেই সিটবেল্ট বাঁধার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। যাত্রীরা যদি নিজেরা এই বিষয়ে সচেতন হয়ে দাবি তোলেন, তাহলে পরিবহন প্রতিষ্ঠানগুলোও বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে পারবেন।আমরা প্রায়ই দুর্ঘটনার পর আলোচনা করি— কেন দুর্ঘটনা ঘটল, চালকের ভুল ছিল কি না, গাড়ির গতি কত ছিল, রাস্তার অবস্থা কেমন ছিল। এসব প্রশ্ন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও করা দরকার— দুর্ঘটনা যখন ঘটল, তখন যাত্রীদের জীবন রক্ষায় আমাদের হাতে করণীয় কী কী ব্যবস্থা ছিল? সিটবেল্ট সেই প্রশ্নের একটি বাস্তবসম্মত উত্তর হতে পারে।

দূরপাল্লার দ্রুতগতির বাসে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিটবেল্টকে বিলাসিতা বা অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে না দেখে মৌলিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। বাসে সিটবেল্ট থাকা, সেটি কার্যকর থাকা এবং যাত্রীরা তা ব্যবহার করছেন কি না— এসব বিষয়কে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার।

সড়ক দুর্ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ করা হয়তো কঠিন। কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটলে একজন মানুষকে গুরুতর আঘাত থেকে বাঁচানোর সম্ভাবনা যদি কোনো সহজ ব্যবস্থা বাড়িয়ে দিতে পারে, তাহলে সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। দূরপাল্লার বাসে সিটবেল্ট তাই সময়ের দাবি। দ্রুতগতির প্রতিটি দূরপাল্লার বাসে চালক ও যাত্রীদের জন্য কার্যকর সিটবেল্ট থাকা এবং এর ব্যবহার নিশ্চিত করা হোক। একই সঙ্গে নিরাপদ গতি, দক্ষ চালক, ভালো যানবাহন ও উন্নত সড়কব্যবস্থার মাধ্যমে গড়ে উঠুক একটি নিরাপদ গণপরিবহন ব্যবস্থা।

দুর্ঘটনা হয়তো সব সময় এড়ানো সম্ভব নয়, কিন্তু দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি কমানোর চেষ্টা আমাদের করতেই হবে। নিরাপদ থাকুক পথ, নিরাপদ থাকুক দূরপাল্লার বাসযাত্রা, নিরাপদ থাকুক সকল যাত্রী।

 

লেখক : অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।