সাত মাসে রাষ্ট্রীয় মদদে কোনো গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতনের ঘটনা ঘটেনি : গণতন্ত্রের অর্জন টেকসই করতে চাই জবাবদিহি
প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জনগণের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি। দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা, দমন-পীড়ন ও অধিকারহীনতার অভিজ্ঞতার পর দেশে একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতার পরিবেশ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে যে ইতিবাচক দাবি করা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব অর্জনকে শুধু বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব জীবনে মানুষের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বলেছেন, গত সাত মাসে রাষ্ট্রীয় মদদে কোনো গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কিংবা নির্যাতনের ঘটনা ঘটেনি এবং বিরোধী মত দমনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তিনি আরও বলেছেন, স্থানীয় পর্যায়ে কোনো বিচ্ছিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে তা তদন্ত করে জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য এ ধরনের অবস্থান অবশ্যই আশাব্যঞ্জক। তবে মানবাধিকার নিশ্চিত হয়েছে কি না, তার চূড়ান্ত বিচারক সরকার নিজে নয়—জনগণ। একজন সাধারণ নাগরিক নির্বিঘ্নে নিজের মত প্রকাশ করতে পারছেন কি না, সাংবাদিক স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করতে পারছেন কি না, বিরোধী রাজনৈতিক মত নিরাপদে প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছে কি না এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সবাই সমান আচরণ পাচ্ছে কি না—এসব সূচকেই গণতন্ত্রের বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে।
সরকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হলো, অতীতের মতো কোনো অভিযোগ ধামাচাপা না দিয়ে তদন্ত ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। কারণ গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; গণতন্ত্রের প্রাণ হলো আইনের শাসন, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহি।
আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে অংশীজনদের মতামত নেওয়ার বিষয়টিও ইতিবাচক। নতুন আইন জনগণের জীবনকে প্রভাবিত করে। তাই আইন তৈরির আগে নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী, গণমাধ্যম, বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মতামত গ্রহণের সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান যে ব্যাপক জনসম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে সংঘটিত হয়েছিল—এ কথাও আলোচনায় উঠে এসেছে। সেই আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা যদি হয় একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ, তবে তার বাস্তবায়নের দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়; রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ নাগরিক—সবার। বাকস্বাধীনতা ও মানবাধিকারের অর্জন তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা সরকার ও বিরোধী দল নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রের ক্ষমতা জনগণের—এই নীতিকে বাস্তবে ধারণ করেই এগোতে হবে। বর্তমান সরকারের সামনে তাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো আস্থার এ পরিবেশকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং জবাবদিহির এমন সংস্কৃতি গড়ে তোলা, যা সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তিত হবে না।
