নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাই অঙ্গীকার
ডা. কাকলী হালদার
প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রোগীদের চিকিৎসাসেবা গ্রহণের সময় অনাকাঙ্ক্ষিত বা প্রতিরোধযোগ্য ক্ষতি কমানো, নিরাপদ ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং রোগী নিরাপত্তা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রতি বছর ১৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবস পালন করা হয় বিশ্বব্যাপী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে ২০১৯ সাল থেকে দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয়ে আসছে।
রোগীর নিরাপত্তা বলতে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সময় রোগীর অপ্রয়োজনীয় বা প্রতিরোধযোগ্য ক্ষতির ঝুঁকি কমিয়ে আনা এবং নিরাপদ চিকিৎসাব্যবস্থা নিশ্চিত করাকে বোঝায়। হাসপাতাল, ক্লিনিক, চিকিৎসকের চেম্বার কিংবা যেকোনো স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে রোগী যেন সঠিক রোগ নির্ণয়, সঠিক ওষুধ, যথাযথ চিকিৎসা এবং নিরাপদ পরিচর্যা পান— এটাই রোগী নিরাপত্তার মূল লক্ষ্য।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা অনেক উন্নত হলেও কখনো কখনো চিকিৎসা ব্যবস্থায় অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল, সংক্রমণ, ভুল ওষুধ বা মাত্রা প্রয়োগ, ভুল রোগী বা ভুল স্থানে চিকিৎসা, যোগাযোগের ঘাটতি কিংবা তথ্যের ভুল ব্যবস্থাপনার মতো কারণে রোগীরা কখনো কখনও অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতির শিকার হতে পারেন। এসব ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজন সমন্বিত ও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা।
প্রতিবছর একটি নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে রোগী নিরাপত্তার কোনো গুরুত্বপূর্ণ দিককে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবসের প্রতিপাদ্য হলো— 'প্রতিটি নবজাতক ও প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ সেবা'। হাসপাতাল, ক্লিনিক, চিকিৎসকের চেম্বার কিংবা যেকোনো স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে রোগী যেন সঠিক রোগ নির্ণয়, সঠিক ওষুধ, যথাযথ চিকিৎসা এবং নিরাপদ পরিচর্যা পান—এটাই রোগী নিরাপত্তার মূল লক্ষ্য।
এর মাধ্যমে নবজাতক ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবায় নিরাপত্তা, মানসম্মত পরিচর্যা এবং প্রতিরোধযোগ্য ক্ষতি কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একজন মানুষ অসুস্থ হয়ে চিকিৎসকের কাছে যান সুস্থ হওয়ার আশায়। তাই চিকিৎসা নিতে গিয়ে যেন তিনি নতুন কোনো প্রতিরোধযোগ্য ক্ষতির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে চিকিৎসার মান বাড়ে, রোগীর আস্থা তৈরি হয় এবং স্বাস্থ্যসেবার সামগ্রিক কার্যকারিতা উন্নত হয়। বিশেষ করে নবজাতক ও শিশুরা নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও চিকিৎসার প্রয়োজন প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় ভিন্ন। ফলে ওষুধের মাত্রা নির্ধারণ, সংক্রমণ প্রতিরোধ, রোগ নির্ণয়, জরুরি চিকিৎসা ও পরিচর্যার প্রতিটি ধাপে সতর্কতা প্রয়োজন।
রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু চিকিৎসক বা নার্সের দায়িত্ব নয়; এর সঙ্গে রোগী, স্বজন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রত্যেক অংশীজন জড়িত। চিকিৎসার আগে রোগীর সঠিক পরিচয় নিশ্চিত করা, রোগের ইতিহাস ও ওষুধ ব্যবহারের তথ্য যাচাই করা, ওষুধের নাম ও মাত্রা সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফল সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। রোগী ও স্বজনদেরও চিকিৎসককে পূর্বের রোগ, অ্যালার্জি, চলমান ওষুধ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানাতে হবে। চিকিৎসা বা ওষুধ সম্পর্কে কোনো বিষয় অস্পষ্ট হলে প্রশ্ন করতে হবে। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হাত পরিষ্কার রাখা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের নিয়ম মেনে চলা এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্যের সঠিক আদান-প্রদানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং নিরাপদ রোগী সেবার জন্য প্রয়োজন দক্ষ জনবল, পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম, চিকিৎসকদের জন্য পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা-প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা নির্দেশনা অনুসরণ এবং ভুল বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার অনুসন্ধান করে কারণ বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে ভবিষ্যতে তা প্রতিরোধের ব্যবস্থা করতে হবে।
একজন মানুষ অসুস্থ হয়ে চিকিৎসকের কাছে যান সুস্থ হওয়ার আশায়। তাই চিকিৎসা নিতে গিয়ে যেন তিনি নতুন কোনো প্রতিরোধযোগ্য ক্ষতির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। চিকিৎসাজনিত সব ধরনের ক্ষতি সবসময় পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়। তবে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যথাযথ সতর্কতা, প্রটোকল অনুসরণ এবং কার্যকর যোগাযোগের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
ভুল চিকিৎসক, ভুল ওষুধ, ভুল রোগী শনাক্তকরণ, হাসপাতাল-সংক্রমণ, চিকিৎসা-তথ্যের ঘাটতি কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে সমন্বয়ের অভাব—এসব ঝুঁকি কমাতে প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
আসলে সচেতনতাই নিরাপদ চিকিৎসার মূল ভিত্তি। রোগী নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো গেলে রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ে। একজন সচেতন রোগী নিজের চিকিৎসা সম্পর্কে জানতে পারেন, প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করতে পারেন এবং ভুল বা অসঙ্গতি চোখে পড়লে তা সুনির্দিষ্ট নিয়মে জানাতে পারেন।
একইভাবে স্বাস্থ্যকর্মীদের দায়িত্বশীলতা, নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন কর্মপরিবেশ, স্বচ্ছতা ও দলগত কাজ চিকিৎসাজনিত ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবস তাই শুধু একটি দিবস পালনের বিষয় নয়; এটি নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবাকে দৈনন্দিন চর্চায় পরিণত করার অঙ্গীকার।
সঠিক চিকিৎসা, নিরাপদ পরিবেশ, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী, সচেতন রোগী এবং কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থার সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে এমন একটি চিকিৎসাব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি রোগী নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ সেবা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে পারেন।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ
