আত্মহত্যা : ব্যক্তিগত সংকট ও আরও কিছু প্রশ্ন
মোছা. রাতিয়া খাতুন
প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ইট-পাথরের ভবন, শ্রেণিকক্ষ, পরীক্ষা কিংবা সার্টিফিকেটের জায়গা নয়। বিশ্ববিদ্যালয় মানে স্বপ্ন, সম্ভাবনা, বন্ধুত্ব, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি আশ্রয়। অথচ সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই যখন একের পর এক আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন, তখন প্রশ্ন ওঠে—সমস্যাটা আসলে কোথায়? এ প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অনিক চন্দ্র পালের মৃত্যুর ঘটনায়। ১৬ সেপ্টেম্বর তার মৃত্যুর খবর সামনে আসে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের ড্রয়িং অ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও নিশ্চিত নয়।
অনিকের মৃত্যু তাই শুধু আরেকটি সংবাদ নয়; এটি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার একটি উপলক্ষ। আমরা প্রায়ই আত্মহত্যার পর একটি কারণ খুঁজে নিই— প্রেমের সম্পর্ক, পারিবারিক সমস্যা, অর্থনৈতিক চাপ কিংবা হতাশা। কিন্তু একজন মানুষের এমন চরম সংকট সাধারণত একটি মাত্র কারণে তৈরি হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের পড়াশোনার চাপ, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, একাকিত্ব, সম্পর্কের টানাপোড়েন, পারিবারিক প্রত্যাশা— অনেক কিছু একসঙ্গে একজন শিক্ষার্থীর ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। তাহলে প্রশ্ন হলো, একজন শিক্ষার্থী যখন ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ছেন, তখন বিশ্ববিদ্যালয় তাকে কতটা দেখতে পাচ্ছে?
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ ক্যাম্পাসের বাইরে মেসে থাকেন। ফলে একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত জীবন ও বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের মধ্যে তৈরি হয় একটি দূরত্ব। ক্লাসে তিনি হয়তো স্বাভাবিক, বন্ধুদের সঙ্গে হাসছেন, কিন্তু রাতের একাকিত্বে তাঁর ভেতরের সংকটটি কেউ জানতেও পারেন না।
এর আগে ২০২৪ সালে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ফাইরুজ সাদাফ অবন্তিকার মৃত্যুর ঘটনাও বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপত্তা, অভিযোগ ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার্থীদের মানসিক সহায়তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছিল। সেই ঘটনার পরও যদি আমাদের একই প্রশ্ন বারবার করতে হয়, তাহলে বুঝতে হবে— শুধু শোক প্রকাশ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন কার্যকর ব্যবস্থা।
তবে প্রতিটি আত্মহত্যার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সরাসরি দায়ী করাও সমীচীন নয়। কারণ ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের জায়গাটি উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই। একজন শিক্ষার্থী যখন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, তখন তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় একজন মানুষের—যিনি বিচার না করে তার কথা শুনবেন, তার সমস্যাকে গুরুত্ব দেবেন এবং প্রয়োজনের সময়ে পাশে দাঁড়াবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব এখানেই সবচেয়ে বেশি।
শুধু ক্লাস-পরীক্ষা আর ফলাফলের মধ্যে শিক্ষার্থীদের সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের মানসিক সুস্থতা, নিরাপত্তা ও সংকটকেও গুরুত্ব দিতে হবে। অভিযোগ জানানোর জন্য নিরাপদ পরিবেশ, সহজলভ্য কাউন্সেলিং এবং সংকটের সময়ে দ্রুত সহায়তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি একটি শিক্ষাবান্ধব বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক দায়িত্ব।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য শুধু ভালো ফলাফল বা চাকরিতে কতজন গেলেন— তা দিয়ে মাপা যায় না। একজন শিক্ষার্থী বিপদে পড়লে প্রতিষ্ঠান তাঁকে কতটা নিরাপদ অনুভব করাতে পারে, সেটিও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।
অনিকের মৃত্যু আমাদের আরেকবার মনে করিয়ে দিল— শিক্ষার্থীদের শুধু পড়াশোনা করানোর দায়িত্ব নয়, তাদের কথা শোনার দায়িত্বও বিশ্ববিদ্যালয়ের। আমরা আর কোনো শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর শুধু ফেসবুকে শোকবার্তা দেখতে চাই না। আমরা চাই, মৃত্যুর আগেই একজন শিক্ষার্থী যেন বলতে পারেন— আমি সমস্যায় আছি, আমাকে শোনার মতো কেউ আছে।
কারণ একটি প্রাণ হারানোর পর আফসোস করার চেয়ে, একটি প্রাণকে বাঁচিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা অনেক বেশি জরুরি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও পরিবার— সবার সম্মিলিত উদ্যোগেই তৈরি হতে পারে এমন একটি ক্যাম্পাস, যেখানে একজন শিক্ষার্থী শুধু নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েই স্বপ্ন দেখবেন না, প্রয়োজনে নিজের কষ্টের কথাও নিরাপদে বলতে পারবেন।
অনিকের মৃত্যু তাই শুধু শোকের বিষয় নয়, এটি আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। একটি প্রাণ হারানোর পর শোক প্রকাশ করা আমাদের মানবিকতা, কিন্তু একটি প্রাণ হারানোর আগেই তার পাশে দাঁড়ানো— সেটিই হবে আমাদের সত্যিকারের দায়িত্ব।
লেখক : শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
