মানসিক স্বাস্থ্য অবহেলায় বাড়ছে আত্মহত্যার ঝুঁকি

সুরাইয়া বিনতে হাসান

প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষের শরীর অসুস্থ হলে আমরা সহজেই বিষয়টি বুঝতে পারি। জ্বর, ব্যথা কিংবা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের কাছে ছুটে যাই। কিন্তু মনের অসুস্থতা অনেক সময় চোখে দেখা যায় না বলে সেটিকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা আমাদের সমাজে এখনও কম। অথচ এই অবহেলাই কখনও কখনও একজন মানুষকে গভীর মানসিক সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে। আর সেই সংকট থেকে আত্মহত্যার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

আত্মহত্যা কোনো একক কারণে ঘটে না। এর পেছনে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, পারিবারিক ও সামাজিক সংকট, সম্পর্কের টানাপোড়েন, অর্থনৈতিক চাপ, শিক্ষাজীবনের ব্যর্থতা, বেকারত্ব, নির্যাতন, একাকিত্বসহ নানা কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে। তবে এসব সংকটের সঙ্গে একজন মানুষ কীভাবে মানসিকভাবে মোকাবিলা করছেন এবং প্রয়োজনের সময় তিনি কতটা সহায়তা পাচ্ছেন— তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই আত্মহত্যা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যকে অবহেলা না করে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

আমাদের সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে এখনও এক ধরনের অস্বস্তি রয়েছে। কেউ বিষণ্ণতায় ভুগলে তাকে সহানুভূতির সঙ্গে শোনার পরিবর্তে অনেক সময় বলা হয়, 'এত ভাবছ কেন?' কিংবা 'তোমার তো কোনো সমস্যা নেই।' এতে সমস্যায় থাকা মানুষটি মনে করতে পারেন, তার অনুভূতির কোনো মূল্য নেই। ফলে সে নিজের কষ্ট প্রকাশ না করে আরও বেশি নিজের মধ্যে গুটিয়ে যেতে পারে। একসময় তার মানসিক চাপ অসহনীয় হয়ে উঠলেও সে সাহায্য চাইতে ভয় পেতে পারে।

বিশেষ করে তরুণ সমাজের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শিক্ষাজীবনে ভালো ফল করার চাপ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা, চাকরির প্রতিযোগিতা, বেকারত্ব, পরিবারের প্রত্যাশা, সম্পর্কের সমস্যা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নানা চাপ তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। বাইরে থেকে একজন তরুণকে হাসিখুশি ও স্বাভাবিক মনে হলেও তার ভেতরে যে গভীর অস্থিরতা চলছে, তা সবসময় বোঝা সম্ভব নয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এ বাস্তবতাকে অনেক ক্ষেত্রে জটিল করে তুলেছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে মানুষ সাধারণত জীবনের সুন্দর মুহূর্ত, সাফল্য ও আনন্দের ছবি প্রকাশ করে। ফলে অন্যরা নিজের বাস্তব জীবনের সঙ্গে অন্যের সাজানো জীবনের তুলনা করতে শুরু করে। কারও মনে হতে পারে, 'সবাই সফল, শুধু আমি ব্যর্থ।' এ ধরনের তুলনা আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে আত্মহত্যার একমাত্র কারণ বলা যাবে না; এটি বরং বৃহত্তর মানসিক ও সামাজিক সংকটের একটি সম্ভাব্য অংশ।

পরিবারের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন সন্তান যখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকে, তখন তার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা পরিবারের। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে পরিবার থেকেই আসে অতিরিক্ত প্রত্যাশা ও তুলনা। পরীক্ষায় কম নম্বর, কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পারা, চাকরি না পাওয়া কিংবা কোনো সম্পর্ক ভেঙে যাওয়াকে অনেক সময় জীবনের ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়। সন্তানকে বোঝানোর বদলে বকাঝকা বা অন্যের সঙ্গে তুলনা করা হলে তার মানসিক চাপ আরও বাড়তে পারে।

মানসিক স্বাস্থ্য অবহেলার আরেকটি বড় কারণ হলো চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং নিয়ে ভুল ধারণা। অনেকেই মনে করেন, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের কাছে গেলে সমাজ তাকে 'পাগল' বলে মনে করবে। এ ভয় এর কারণে অনেক মানুষ প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও সাহায্য নেন না। অথচ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করা লজ্জার বিষয় নয়। শারীরিক অসুস্থতার মতো মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রেও প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ও পেশাদার সহায়তা নেওয়া স্বাভাবিক।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোরও এ বিষয়ে দায়িত্ব রয়েছে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য সহজলভ্য ও গোপনীয় কাউন্সেলিং সেবা থাকা প্রয়োজন। শিক্ষকদেরও শিক্ষার্থীদের আচরণগত পরিবর্তনের বিষয়ে সচেতন হতে হবে। কোনো শিক্ষার্থী হঠাৎ সবার কাছ থেকে দূরে সরে গেলে, অতিরিক্ত হতাশা প্রকাশ করলে বা নিজের জীবন নিয়ে উদ্বেগজনক কথা বললে সেটিকে উপেক্ষা না করে সহানুভূতির সঙ্গে তার সঙ্গে কথা বলা দরকার।

এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের দায়িত্বও কম নয়। আত্মহত্যার সংবাদ প্রকাশের সময় সাংবাদিকদের দায়িত্বশীলতা ও সংবেদনশীলতা বজায় রাখা জরুরি। আত্মহত্যার পদ্ধতি বা অতিরিক্ত বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ না করে সংবাদে আত্মহত্যা প্রতিরোধ, মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং সহায়তা পাওয়ার সুযোগের বিষয়গুলো গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ গণমাধ্যম শুধু ঘটনা জানায় না; মানুষের চিন্তা ও আচরণেও প্রভাব ফেলে। তাই আত্মহত্যার সংবাদ পরিবেশনে নৈতিক সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আত্মহত্যার ঝুঁকি কমাতে আমাদের প্রথমেই মানুষের কথা শোনার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। কেউ যখন নিজের কষ্টের কথা বলতে চান, তখন তাকে বিচার না করে মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। কোনো ব্যক্তি যদি নিজের জীবন নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন, নিজেকে বোঝা মনে করেন, সবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন কিংবা আত্মহত্যা নিয়ে কথা বলেন, তাহলে বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। এমন পরিস্থিতিতে তাকে একা না রেখে বিশ্বস্ত পরিবার-সদস্য বা বন্ধুর সহায়তা নেওয়া এবং দ্রুত মানসিক স্বাস্থ্য-পেশাজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করা প্রয়োজন। তাৎক্ষণিক বিপদের আশঙ্কা থাকলে স্থানীয় জরুরি সেবা বা নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগ করা জরুরি।

তবে আত্মহত্যা প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু ব্যক্তির নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং রাষ্ট্র সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা আরও সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ বাড়াতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে এবং মানসিক সমস্যাকে ঘিরে প্রচলিত কুসংস্কার।

একজন মানুষ যখন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, তখন তাকে শুধু 'শক্ত হও' বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তার পাশে দাঁড়াতে হয়, তার কথা শুনতে হয়, প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তার ব্যবস্থা করতে হয়। কারণ মানসিক সংকট কোনো চরিত্রের দুর্বলতা নয়; এটি এমন একটি বাস্তব সমস্যা যার জন্য সহায়তা ও যত্ন প্রয়োজন।

আত্মহত্যা প্রতিরোধের পথ তাই শুধু মৃত্যুর ঘটনা কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়,বরং এমন একটি সমাজ তৈরি করা, যেখানে মানুষ তার কষ্ট নিয়ে কথা বলতে পারে, সাহায্য চাইতে পারে এবং নিজেকে একা মনে না করে। মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি অবহেলা কমানো গেলে অনেক সংকটকে আগেই চিহ্নিত করা সম্ভব। আর সময়মতো পাশে দাঁড়ানো গেলে একটি জীবনকে নতুন করে আশার দিকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।

আজ তাই আমাদের প্রত্যেকের কাছে প্রশ্ন,আমরা কি শুধু একজন মানুষের হাসি দেখেই ধরে নেব যে সে ভালো আছে, নাকি তার নীরবতার ভাষাও বোঝার চেষ্টা করব? মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নকে গুরুত্ব দেওয়া মানে শুধু আত্মহত্যার ঝুঁকি কমানো নয়। বরং মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার, মর্যাদা ও সুন্দরভাবে জীবনযাপনের অধিকারকে সম্মান করা। একটি জীবন হারানোর পর আফসোস করার চেয়ে, তার প্রয়োজনের সময়ে পাশে দাঁড়ানোই হোক আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।