বাসনার বন্ধকনামা : ধার করা স্বপ্নের কিস্তি
উম্মে সালমা
প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
আধুনিক মানুষের জীবন আসলে এক অদ্ভুত বন্ধকনামা। বিশ বা ৩০ বছর মেয়াদি এক একটি ঋণের চুক্তিতে সই করে মানুষ আসলে জীবনের সেরা সময়টাকে বন্ধক রাখছে। কর্পোরেট পরিভাষায় একে আমরা বলছি হোম লোন কিংবা কনজিউমার লোন। কিন্তু একটু গভীরে তাকালে দেখা যাবে, এগুলো আসলে আমাদের আকাশ ছোঁয়া বাসনার বিপরীতে এক একটি দাসত্বপত্র।
বর্তমানে বাংলাদেশের ধার করা কিস্তি বা সাধারণত বিভিন্ন সংস্থা (যেমন : এনজিও, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংক) থেকে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করছেন এমন সক্রিয় ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি ৩৬ লাখ ৮০ হাজার, যা ৩৩.৬৮ মিলিয়ন। এছাড়াও দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য ব্যক্তিগত ঋণ, গাড়ি ও হোম লোন, ক্রেডিট কার্ড এবং ব্যবসায়ী ঋণ নিয়েছেন।
উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকা ভালো, কিন্তু তা যখন নিজের স্বাধীনতাকে হরণ করে, তখন তা আত্মঘাতী হয়ে ওঠে। ধার করা স্বপ্নে সাময়িক তৃপ্তি মিলতে পারে, কিন্তু তার কিস্তি শোধের খতিয়ানটা বড্ড নির্মম। জীবনের হিসাব মেলাতে গিয়ে যেন আমরা নিজেদেরই হারিয়ে না ফেলি, সেই বোধটা আজ বড় বেশি প্রয়োজন। উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফাঁদে পড়ে নিজের স্বাধীনতা বিক্রি করে প্রতিনিয়ত তার মূল্য পরিশোধ করার যন্ত্রণাময় জীবনই আত্মঘাতী, নির্মম। আজকের সমাজে ঋণ অনেকের জীবনের বাস্তবতা।
চিকিৎসা, শিক্ষা, বাড়ি নির্মাণ কিংবা জরুরি প্রয়োজন— এসব ক্ষেত্রে ঋণ প্রয়োজনীয় সহায়তা হতে পারে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন প্রয়োজনের সীমা পেরিয়ে ঋণ হয়ে ওঠে জীবনযাপনের উপায়।
মানুষ স্বপ্ন দেখে। কেউ নিজের একটি বাড়ির স্বপ্ন দেখে, কেউ নতুন গাড়ির, কেউ সন্তানের ভালো পড়াশোনার, আবার কেউ চায় সামাজিক অনুষ্ঠানে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী নয়, সামাজিক প্রত্যাশা অনুযায়ী নিজেকে উপস্থাপন করতে। উদাহরণস্বরূপ, একটি বিয়েতে অন্যদের চেয়ে বেশি আয়োজন করতে হবে। ঈদে নতুন পোশাক, ঘরে দামি আসবাব কিংবা কোনো পণ্য সবকিছুর ক্ষেত্রেই যদি প্রশ্ন হয়, মানুষ কী বলবে?— তখন তা অজান্তেই সামাজিক চাপ আমাদের আর্থিক সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। অথচ যে মানুষটি বাইরে থেকে স্বচ্ছল দেখাচ্ছেন, তার ভেতরের গল্পটি হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন। সুন্দর পোশাকের আড়ালে থাকতে পারে ঋণের কিস্তি, নতুন গাড়ির আড়ালে থাকতে পারে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ, আর বড় আয়োজনের আড়ালে থাকতে পারে বহু মাসের দুশ্চিন্তা।
অন্যের দৃশ্যমান ভাবনা দেখে শুরু হয় প্রতিযোগিতা। সঞ্চয় নেই— তবু কেনাকাটা, সামর্থ্য নেই- তবু আয়োজন, প্রয়োজন নেই— তবু ঋণ, আর সবশেষে- কিস্তি। স্বপ্ন সবারই থাকে, স্বপ্ন থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের অর্থ যদি নিজের সামর্থ্যের বাইরে হয়, তখন বিবেকের কাছে প্রশ্ন কড়াভাবে নাড়া দিয়ে যায়। প্রশ্ন হলো, এই স্বপ্নগুলো আসলে কার? মানুষের অনেক স্বপ্ন নিজের ভেতর থেকে জন্ম নেয় না, জন্ম নেয় তুলনা থেকে। অন্যের জীবন দেখে নিজের জীবনের ঘাটতি খুঁজতে খুঁজতে মানুষ এমন অনেক কিছুর পেছনে ছুটতে শুরু করে, যা হয়তো আদৌ প্রয়োজন নেই।
বিজ্ঞাপন শেখায়— আজই ভোগ করুন, পরে মূল্য পরিশোধ করুন। এই 'পরে' শব্দটার আড়ালেই লুকিয়ে থাকে জীবনের সবচেয়ে বড় ফাঁদ। এ ফাঁদেই আটকে যাচ্ছে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত সমাজ। তৈরি হচ্ছে এক অদ্ভুত মনস্তত্ত্ব, যার নাম দেওয়া যায় 'ধার করা স্বপ্নের কিস্তি'। একটি ফ্ল্যাট কেনার জন্য যখন কেউ ২৫বছরের জন্য ঋণ নেয়, তখন শুধু ধার করা হয় না, সেটি মূলত তার জীবনের পরবর্তী ২৫ বছরের প্রতিটা মুহূর্তকে ব্যাংকের কাছে লিখে দেওয়া চুক্তি হয়।
এ কিস্তির সংস্কৃতি সমাজকে এক কৃত্রিম সচ্ছলতা দিয়েছে, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে মানুষের মানসিক শান্তি। কষ্ট করে পাওয়া চাকরি ভালো না লাগলেও ছেড়ে দেওয়ার উপায় থাকে না, একটু বিশ্রামের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ওভারটাইম করতে হয়। কারণ মাস শেষে মনে করিয়ে দেয়, 'ধার করা স্বপ্নের কিস্তি' শোধ করতে হবে। মাসের শুরুতে বেতন পাওয়ার পর যখন সিংহভাগ টাকাই চলে যায় বিভিন্ন ঋণের কিস্তি মেটাতে, তখন মানুষের ভেতরে এক তীব্র হতাশা ও বিষণ্ণতা জন্ম নেয়। মধ্যবিত্ত পরিবারের ডাইনিং টেবিলে এখন সুখের আলোচনার চেয়ে মাসের খরচের হিসাব আর কিস্তির চিন্তাই বেশি প্রাধান্য পায়।
মানুষ একটা সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় বর্তমানকে প্রতিনিয়ত বন্ধক রাখছে বা কোরবানি করে দিচ্ছে ব্যাংকের লকার বা ফাইন্যান্স কোম্পানির খাতায়। যে ফ্ল্যাটের কিস্তি শোধ করতে করতে মানুষের চুল পেকে যায়, সেই ফ্ল্যাটে শান্তিতে ঘুমানোর মতো সু-স্বাস্থ্য বা সময় আর অবশিষ্ট থাকে না। এ সংস্কৃতি মানুষকে ক্রমাগত এক অস্থির প্রতিযোগিতার দিকে ঠেলে দেয়। মানুষ তখন বেশি আয়ের জন্য অনৈতিক পথ বেছে নিতেও দ্বিধা করে না।
বর্তমানে সবচেয়ে বড় সংকট হলো, এ ব্যবস্থার কারণে মানুষের ভেতরের 'ধৈর্য' নামক গুণটি হারিয়ে যাচ্ছে। আগে মানুষ সঞ্চয় করে কোনো একটি জিনিস কেনার আনন্দ উপভোগ করত। সেই জমানো টাকার পেছনে থাকত পরিশ্রম, ধৈর্য আর অপেক্ষার গল্প। কিন্তু এখন মানুষ আর অপেক্ষা করতে চায় না। তাৎক্ষণিক প্রাপ্তির এই লোভ মানুষকে এমন এক চক্রে বন্দি করছে, যেখান থেকে বের হওয়া কঠিন।
একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য মানুষকে এই মেকি বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। চাদর বুঝে পা ফেলার যে চিরন্তন প্রবাদ, তা বর্তমানে বেশি প্রাসঙ্গিক। অন্যের ধার করা ঝলমলে জীবনের দিকে তাকিয়ে নিজের শান্তি বিসর্জন দেওয়ার কোনো মানে হয় না। কিস্তির বেড়াজালে আটকে পরা জীবনের চেয়ে নিজের সাধ্যের মধ্যে থাকা সাদামাটা জীবন অনেক বেশি মাধুর্যপূর্ণ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বস্তির। সর্বোপরি আমাদের বুঝতে হবে, করপোরেট দুনিয়ার চাপিয়ে দেওয়া কৃত্রিম চাহিদার কিস্তি শোধ করার চেয়ে নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় বাঁচাটাই আসল মুক্তি।
লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজ।
