পরিবার ও প্রজন্মের দূরত্ব; ভালোবাসা কি মরে যাচ্ছে?

ড. লিপন মুস্তাফিজ

প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি শিশুর পৃথিবীর প্রথম পরিচয় তার পরিবার। সেখানেই সে প্রথম নিরাপত্তা খুঁজে পায়, প্রথম কথা বলতে শেখে, প্রথম ভালোবাসার অর্থ বোঝে এবং মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করে। পরিবার তাই শুধু একসঙ্গে বসবাসের জায়গা নয়; এটি মানুষের চরিত্র, মনন ও অনুভূতির ভিত তৈরি করে। অথচ সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিবারের ভেতরেই আজ এক ধরনের নীরব দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। মানুষ কাছাকাছি আছে, কিন্তু সবসময় একে অপরের কাছে নেই। একই ঘরে বসবাস করেও অনেক সময় বাবা-মা ও সন্তান যেন ভিন্ন ভিন্ন পৃথিবীতে বাস করছে। প্রজন্মের মধ্যে পার্থক্য নতুন কোনো বিষয় নয়।

প্রত্যেক প্রজন্মই তার আগের প্রজন্মের চেয়ে কিছুটা ভিন্নভাবে পৃথিবীকে দেখে। আমাদের বাবা-মায়ের শৈশব, আমাদের বেড়ে ওঠা এবং আজকের সন্তানদের বাস্তবতা এই তিনটি সময়ের অভিজ্ঞতা এক নয়। তাদের জীবনে ছিল সীমাবদ্ধতা ও অপেক্ষা; আমাদের প্রজন্ম দেখেছে পরিবর্তনের গতি; আর নতুন প্রজন্ম এমন এক পৃথিবীতে বড় হচ্ছে যেখানে তথ্য, যোগাযোগ ও সুযোগ তাদের হাতের নাগালে। ফলে জীবন সম্পর্কে তাদের প্রত্যাশা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরন এবং সাফল্যের সংজ্ঞাও স্বাভাবিকভাবেই আলাদা। এ পার্থক্যকে যদি আমরা সময়ের স্বাভাবিক পরিবর্তন হিসেবে গ্রহণ করি, তাহলে তা সম্পর্ককে সমৃদ্ধ করতে পারে; কিন্তু যদি এক প্রজন্ম অন্য প্রজন্মের চিন্তাকে ভুল বা অগ্রহণযোগ্য বলে ধরে নেয়, তখন সেই পার্থক্যই ধীরে ধীরে দূরত্বে পরিণত হয়।

আমাদের বাবা-মায়ের প্রজন্মের কাছে সংসার ছিল দায়িত্বের প্রধান জায়গা। ব্যক্তিগত ইচ্ছার চেয়ে পরিবারের প্রয়োজনকে তারা অনেক সময় বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। অনেক স্বপ্ন তারা ত্যাগ করেছেন সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য। তাই তাদের কাছে সন্তানের নিরাপত্তা, স্থিরতা এবং প্রতিষ্ঠিত হওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে নতুন প্রজন্ম নিজের পছন্দ, স্বাধীনতা এবং নিজের মতো করে জীবন গড়ে তোলাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এখান থেকেই অনেক সময় সংঘাতের শুরু। বাবা-মা ভাবেন, সন্তান তাদের কথা শুনছে না; সন্তান ভাবে, বাবা-মা তাকে বুঝতে চাইছেন না। অথচ দুপক্ষের উদ্দেশ্য অনেক সময়ই খারাপ নয়। একজন অভিজ্ঞতা থেকে সতর্ক করতে চান, অন্যজন নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে পথ তৈরি করতে চায়। সমস্যাটা তৈরি হয় তখনই, যখন কেউ কারও কথা মন দিয়ে শুনতে চায় না।

আমাদের পারিবারিক সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এখানেই আমরা কথা বলছি, কিন্তু শুনছি না। বাবা সন্তানের সঙ্গে কথা বলছেন তার পড়াশোনা, চাকরি, ভবিষ্যৎ কিংবা বিয়ে নিয়ে; কিন্তু সন্তান কী নিয়ে ভয় পাচ্ছে, কী স্বপ্ন দেখছে, কোথায় ব্যর্থ হচ্ছে সেই কথাগুলো শোনার সময় হয়তো হয়ে উঠছে না। একইভাবে সন্তানও বাবা-মায়ের উদ্বেগ, ক্লান্তি কিংবা একাকিত্বকে অনেক সময় গুরুত্ব দিয়ে শুনছে না। ফলে প্রয়োজনীয় কথাগুলো বলা হয় না, ছোট ছোট অভিমান জমতে থাকে এবং একসময় এমন একটি দূরত্ব তৈরি হয়, যার শুরু কোথায় হয়েছিল তা আর কেউ মনে করতে পারে না। এ দূরত্বের জন্য শুধু একটি প্রজন্মকে দায়ী করা যায় না।

পরিবারে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা একটি পারস্পরিক দায়িত্ব। বাবা-মায়ের যেমন বুঝতে হবে যে সন্তান তাদের সম্পত্তি নয়, তেমনি সন্তানদেরও বুঝতে হবে যে স্বাধীনতা মানে সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়। সন্তানের নিজের জীবন বেছে নেওয়ার অধিকার আছে, কিন্তু বাবা-মায়ের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতিকেও অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। আবার বাবা-মায়ের ভালোবাসা যদি সন্তানের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টায় পরিণত হয়, তাহলে সেই ভালোবাসাই একসময় সন্তানের কাছে বোঝা হয়ে উঠতে পারে। ভালোবাসার প্রকৃত সৌন্দর্য হলো কাউকে নিজের মতো করে গড়ে তোলা নয়, বরং তাকে তার নিজস্ব সত্তা নিয়ে গ্রহণ করা।

বাবা-মায়ের ভালোবাসার প্রকাশ এবং সন্তানের ভালোবাসার প্রত্যাশার মধ্যেও অনেক সময় পার্থক্য থাকে। আমাদের আগের প্রজন্ম ভালোবাসা প্রকাশ করেছে দায়িত্ব পালন করে সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগানো, সংসারের জন্য পরিশ্রম করা, ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করা। নতুন প্রজন্ম হয়তো সেই ভালোবাসার পাশাপাশি চায় সময়, কথা এবং মানসিক সঙ্গ। একজন বাবা মনে করতে পারেন, 'আমি তো তোমার জন্য এত কিছু করেছি,' আর সন্তান মনে করতে পারে, 'কিন্তু তুমি কখনও আমার কথাটা শোনোনি।' দুজনের অনুভূতিই সত্য হতে পারে। তাই ভালোবাসা শুধু কী দেওয়া হয়েছে তার হিসাব নয়; কখন, কীভাবে এবং কতটা উপস্থিত থাকা গেছে, সেটিও সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

পরিবারের ভেতরে প্রজন্মের দূরত্ব শুধু বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ভাই-বোন, দাদা-দাদি, নানা-নানি কিংবা আত্মীয়তার অন্যান্য সম্পর্কেও জীবনের ব্যস্ততা ও পরিবর্তনের প্রভাব পড়ে। ছোটবেলায় যে ভাই-বোন একে অপরের সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিল, বড় হয়ে তারা কখনও কখনও শুধু বিশেষ দিনে যোগাযোগ করে। একই পরিবারের মানুষ হয়েও একে অপরের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ খবর জানে অন্যের কাছ থেকে। অথচ সম্পর্কের মূল্য আমরা অনেক সময় তখনই বুঝতে পারি, যখন প্রয়োজনের মুহূর্তে সেই মানুষটিকে পাশে পাই না। পরিবার আমাদের শুধু ভালোবাসা দেয় না, আমাদের আচরণের মধ্য দিয়েও পরবর্তী প্রজন্মকে শিক্ষা দেয়।

আমরা সন্তানকে যে মূল্যবোধের কথা বলি, তার চেয়ে সে আমাদের আচরণ দেখে বেশি শেখে। আমরা তাকে সত্য বলতে বলি, কিন্তু নিজের সুবিধার জন্য যদি মিথ্যা বলি, সে কথার চেয়ে আচরণটিই মনে রাখবে। আমরা তাকে বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করতে বলি, কিন্তু নিজের বাবা-মায়ের প্রতি যদি অবহেলা করি, তাহলে আমাদের শিক্ষা কতটা কার্যকর হবে? প্রজন্ম আসলে উপদেশে তৈরি হয় না; প্রজন্ম তৈরি হয় উদাহরণে। আজ আমরা পরিবারে যে সম্পর্কের পরিবেশ তৈরি করছি, আগামী দিনে আমাদের সন্তানরা অনেকটা সেই পরিবেশই নিজেদের পরিবারে বহন করবে। তাই পুরোনো প্রজন্মকে শুধু পুরোনো বলে বাতিল করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি নতুন প্রজন্মের প্রতিটি পরিবর্তনকে অবক্ষয় হিসেবে দেখাও ঠিক নয়। পুরোনো প্রজন্মের কাছ থেকে আমরা নিতে পারি দায়িত্ববোধ, ধৈর্য, ত্যাগ ও সম্পর্কের প্রতি দায়বদ্ধতা; নতুন প্রজন্ম আমাদের শেখাতে পারে প্রশ্ন করতে, নিজের পরিচয়কে গুরুত্ব দিতে এবং পরিবর্তনকে গ্রহণ করতে। একটি সুস্থ পরিবারে এই দুই অভিজ্ঞতার মধ্যে সংঘাত নয়, সংলাপ তৈরি হওয়া প্রয়োজন। শেকড় যেমন মানুষকে স্থিরতা দেয়, তেমনি ডানা তাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দেয়। পরিবারের কাজ শেকড়কে শক্ত রাখা, কিন্তু ডানাকে কেটে দেওয়া নয়। সবচেয়ে জরুরি হলো, পরিবারকে এমন একটি জায়গা হিসেবে গড়ে তোলা যেখানে মানুষ নিজের কথা বলতে ভয় পাবে না।

সন্তান ভুল করলে তাকে শুধু শাসন নয়, ভুল থেকে ফিরে আসার সুযোগ দিতে হবে। বাবা-মা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্বল হয়ে পড়লে তাদেরও বুঝতে হবে যে সন্তানের জীবনে দায়িত্ব ও ব্যস্ততা আছে; সন্তানদেরও মনে রাখতে হবে, একদিন যে মানুষটি তার প্রতিটি প্রয়োজনের পাশে দাঁড়িয়েছিল, বয়সের শেষ সময়ে তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হতে পারে সন্তানের একটু সময়। জীবনের শেষ দিকে মানুষ অনেক সম্পদের চেয়ে একজন আপন মানুষের পাশে বসে থাকা বেশি মূল্যবান মনে করে।

প্রজন্মের দূরত্ব কমানোর জন্য বড় কোনো তত্ত্বের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন কিছুটা ধৈর্য, কিছুটা সংযম এবং পরস্পরের জায়গায় দাঁড়িয়ে ভাবার চেষ্টা। বাবা-মাকে মনে রাখতে হবে, তারা নিজেরাও একদিন তরুণ ছিলেন; সন্তানদের মনে রাখতে হবে, একদিন তারাও বয়সের অন্য প্রান্তে পৌঁছাবে। এই উপলব্ধি যদি দুপক্ষের মধ্যে তৈরি হয়, তাহলে অনেক কঠিন কথাও সহজ হয়ে উঠতে পারে। মতের অমিল থাকবে, তর্ক থাকবে, সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বন্দ্বও থাকবে কিন্তু সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখার জন্য সবসময় মতের মিল দরকার হয় না; দরকার একে অপরের প্রতি সম্মান।

আমরা প্রায়ই বলি, আগের দিনগুলো ভালো ছিল। হয়তো কিছু দিক থেকে ছিল। কিন্তু শুধু অতীতের জন্য আফসোস করে বর্তমানকে বদলানো যায় না। আমাদের দায়িত্ব হলো অতীতের যে মানবিকতা, পারিবারিক দায়বদ্ধতা ও আন্তরিকতা হারিয়ে যাচ্ছে, সেগুলোকে নতুন সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে আবার জীবনে ফিরিয়ে আনা। সময়কে পেছনে নেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু সম্পর্ককে নতুন করে শুরু করা সম্ভব। একটি ফোন, একটি দীর্ঘ আলাপ, বহুদিনের জমে থাকা অভিমান নিয়ে মুখোমুখি বসা কিংবা শুধু কিছুটা সময় একসঙ্গে কাটানো এসব ছোট কাজই কখনও কখনও বড় দূরত্ব কমিয়ে দিতে পারে। কারণ পরিবার শেষ পর্যন্ত এমন একটি জায়গা হওয়া উচিত, যেখানে মানুষ শুধু বসবাস করে না, ফিরে আসতে চায়। সেখানে বয়সের পার্থক্য থাকবে, মতের অমিল থাকবে, জীবন দেখার ভিন্নতা থাকবে; কিন্তু তার মধ্যেও থাকবে একে অপরকে বোঝার চেষ্টা। একটি প্রজন্ম অন্য প্রজন্মকে পুরোপুরি বুঝবে না এটাই হয়তো স্বাভাবিক। কিন্তু বোঝার চেষ্টা বন্ধ করে দিলে যে সম্পর্কটি একদিন ভালোবাসা দিয়ে তৈরি হয়েছিল, সেটিই ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়।

তাই প্রশ্নটি শুধু 'ভালোবাসা কি মরে যাচ্ছে?' নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত— আমরা কি ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখার মতো সময়, মনোযোগ এবং আন্তরিকতা এখনও দিতে পারছি? পরিবারে সেই উত্তর যদি 'হ্যাঁ' করতে চাই, তাহলে আমাদের আবার কথা বলতে হবে, আবার শুনতে হবে এবং প্রয়োজনে নিজের অবস্থান থেকে এক পা সরে অন্যের কাছে যেতে হবে। কারণ প্রজন্ম বদলাবে, পৃথিবী বদলাবে, জীবনযাপনের ধরন বদলাবে; কিন্তু মানুষ তার আপনজনের কাছে যে উষ্ণতা খোঁজে, তার প্রয়োজন বদলাবে না। ভালোবাসা হয়তো মরে যায় না কখনও কখনও শুধু আমাদের ব্যস্ততা, অহংকার আর নীরবতার আড়ালে চাপা পড়ে যায়। তাকে আবার দৃশ্যমান করার দায়িত্ব আমাদেরই।

 

লেখক : ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ এবং সহযোগী অধ্যাপক (খণ্ডকালীন), সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়