স্মার্টফোনের বিষাক্ত ফাঁদ : বিপন্ন শৈশব ও রুদ্ধ মনন
ড. লিপন মুস্তাফিজ
প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানী ঢাকায় টিকে থাকার যুদ্ধটা প্রতিদিনের। আকাশছোঁয়া ঘরভাড়া, চাল-ডালের লাগামহীন দাম আর প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকা জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে আজ মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে বাবা-মা দুজনকেই আপ্রাণ লড়াই করতে হয়। সকালে বের হয়ে জ্যামের অভিশাপ পেরিয়ে কর্মস্থলে পৌঁছানো, আবার দিনশেষে সেই স্থবির রাজপথেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থেকে চরম ক্লান্তিতে বাড়ি ফেরা ঢাকার জীবনযাত্রার এটাই রূঢ় বাস্তব। তার ওপর অর্থনৈতিক টানে গৃহপরিচারিকা বা বুয়া রাখার সামর্থ্য অনেকেরই থাকে না। ফলে সারাদিনের খাটুনি শেষে বাড়ি ফিরে যখন রান্না-বান্নাসহ ঘরের কাজ সারতে হয়, তখন বাবা-মায়ের শরীরে সন্তানদের দেওয়ার মতো আর কোনো শক্তি বা সময় অবশিষ্ট থাকে না। সংসার চালানো ও দুবেলা অন্ন সংস্থানের এ কঠিন যুদ্ধে পিতা-মাতা আজ এক প্রকার নিরুপায়।
এ চরম ও নির্মম বাস্তবতার সবচেয়ে বড় বলি হচ্ছে আমাদের সন্তানরা। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সন্তানদের পর্যাপ্ত সময়, মেধা বা মনোযোগ দিতে পারছেন না অভিভাবকরা। সকালে ঘুম থেকে উঠে কর্মস্থলের তাড়া, আর রাতে ফিরে ঘরের কাজ এর মাঝখানে পড়ে সন্তানরা হয়ে উঠছে পারিবারিক কাঠামোর এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপাঞ্চল। সারাদিন চার দেয়ালের মাঝে একা পড়ে থাকা এ কিশোর-কিশোরীরা এক গভীর, দমবন্ধ করা নিঃসঙ্গতায় ডুবে যাচ্ছে। অভিভাবকের সান্নিধ্য যেখানে সন্তানের মানসিক নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হওয়ার কথা ছিল, সেখানে শুধুই এক মহাশূন্যতা। এ শূন্যতা কোনো সাধারণ মনখারাপ নয়; এটি এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত তৈরি করছে আমাদের কোমলমতি শিশুদের অন্তরে। এর ফলে তাদের ভেতরে তৈরি হচ্ছে এক তীব্র হতাশা, যা ধীরে ধীরে তাদের পরিবারের প্রতি বিমুখ করে তোলে।
একদিকে যখন ঘরে মা-বাবার সান্নিধ্য নেই, অন্যদিকে ঘরের বাইরে বেরিয়ে যে একটু খোলা বাতাসে শ্বাস নেবে বা সমবয়সীদের সঙ্গে মিশবে, তারও কোনো উপায় এ নগরীতে রাখা হয়নি। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে আজ নিরেট কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত হয়েছে ঢাকা। পাড়া-মহল্লায় কোনো উন্মুক্ত খেলার মাঠ নেই, শিশুদের ছোটাছুটির কোনো জায়গা নেই। একই সঙ্গে হারিয়ে গেছে পাড়ার সেই ছোট ছোট পাঠাগার বা লাইব্রেরিগুলো; যেখানে গেলে একটি শিশু বইয়ের সুবাস পেত, মুক্তচিন্তার আলোয় আলোকিত হওয়ার সুযোগ পেত। সাংস্কৃতিক চর্চার কোনো জায়গা নেই, ক্লাব নেই, নেই কোনো সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা। শিশুরা এখন চার দেয়ালের এক বন্ধ প্রকোষ্ঠে বন্দি, যেখানে তাদের কল্পনাশক্তি বিকাশ পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
ফলে সুস্থ শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিকাশের প্রতিটি দুয়ার আজ এ প্রজন্মের জন্য সম্পূর্ণ রুদ্ধ। মা-বাবার সান্নিধ্যহীনতা এবং উন্মুক্ত মাঠ ও লাইব্রেরির অভাব— এ দ্বিমুখী সংকটের সুযোগে কিশোরদের ঘরে এক নীরব ও মারাত্মক বিষাক্ত শত্রু থাবা বসিয়েছে। হাতের কাছে থাকা পাঁচ ইঞ্চি আলো ছড়ানো স্মার্টফোনটি খুব সহজেই তাদের একাকিত্বের একমাত্র সঙ্গী হয়ে উঠছে। মা-বাবার অবধানহীনতা ও অলস সময় কাটানোর অন্য কোনো বিকল্প না থাকায় কিশোরেরা বুঁদ হয়ে পড়ছে 'পাবজি' বা 'ফ্রি ফায়ার'-এর মতো রক্তক্ষয়ী ভার্চুয়াল গেমে কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার অলীক জগতে। ভার্চ্যুয়াল জগতের এ রঙিন আলো খুব দ্রুতই কিশোর মনকে গ্রাস করে নেয়।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা রক্তক্ষয়ী গেম খেলে কিশোরদের মস্তিষ্কে যে উগ্রতা তৈরি হচ্ছে, তা তাদের বিবেক ও মানবিক বোধকে মারাত্মকভাবে অবশ করে দিচ্ছে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অনবরত গেমে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ বা 'কিল' করার দৃশ্য দেখতে দেখতে বাস্তব জীবনের মৃত্যু, রক্তপাত ও শারীরিক যন্ত্রণার প্রতি কিশোরদের সংবেদনশীলতা লোপ পায়। বাস্তব জীবনে তারা হয়ে উঠছে চরম ধৈর্যহীন, রাগী ও হিংস্র। পারিবারিক বন্ধন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা সমাজবিচ্ছিন্ন এক ধরনের অলীক জগতের বাসিন্দা হয়ে পড়ছে, যেখানে সহমর্মিতা বা মানবিক মূল্যবোধের কোনো স্থান নেই। তাদের মেজাজ খিটখিটে হয়ে ওঠে, সামান্য বাধা পেলেই তারা আক্রমণাত্মক আচরণ শুরু করে।
ভার্চ্যুয়াল জগতের এ মানসিক উগ্রতা শুধু চার দেয়ালের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকছে না; ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জার গ্রুপের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়ছে রাজপথে। জন্ম নিচ্ছে পাড়া-মহল্লার কুখ্যাত 'কিশোর গ্যাং'। অনলাইনের সস্তা জনপ্রিয়তা, টিকটকে অস্ত্র প্রদর্শন করে 'ভাই' বা 'ডন' হিসেবে জাহির করার প্রতিযোগিতা এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইক-কমেন্টকে কেন্দ্র করে তুচ্ছ বিরোধ সৃষ্টি হচ্ছে। সেই সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে দামি আইফোন বা স্মার্টফোনের প্রতি তীব্র প্রলোভন এবং গেমিং আইডি বা গেমিং কয়েন কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে মোটা অঙ্কের অবৈধ আর্থিক লেনদেন। ভার্চ্যুয়াল জগত থেকে উদ্ভুত এ গ্যাং কালচার আজ পুরো সমাজব্যবস্থাকে এক চরম আতঙ্কের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
এ চরম আসক্তি ও অবক্ষয়ের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে কিশোরদের হাতে আজ বইয়ের বদলে শোভা পাচ্ছে ধারাল দেশীয় অস্ত্র। স্রেফ একটি দামি মোবাইল ফোন ছিনতাই করার লোভে, গেমিং অ্যাকাউন্টের দ্বন্দ্বে কিংবা মেসেঞ্জারে 'আড়চোখে' কথা বলার প্রতিশোধ নিতে এরা নিজ সহপাঠী বা বন্ধুকে কুপিয়ে হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করছে না। তুচ্ছ অহংবোধ ও ক্ষণিকের উগ্রতায় অকাতরে নিভে যাচ্ছে একেকটি সম্ভাবনাময় তাজা প্রাণ। যে বয়সে এদের জ্ঞানার্জন, নৈতিক শিক্ষা ও ক্রীড়ানৈপুণ্যে আলোকিত হওয়ার কথা ছিল, সেই বয়সে এরা খুনি হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর খাতায় নাম লেখাচ্ছে। এ ভয়াবহ দৃশ্য শুধু কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকার নয়, বরং প্রতিটি শহর ও মহল্লার এক প্রতিদিনের আতঙ্কে পরিণত হয়েছে।
আমরা অভিভাবকদের ওপর থেকে এ অর্থনৈতিক চাপ ও ক্লান্তির দায় পুরোপুরি চাপিয়ে দিতে পারি না। কারণ ঢাকায় টিকে থাকার লড়াইটি কোনো কাল্পনিক গল্প নয়, এটি প্রতিদিনের বাস্তবতা। কিন্তু ভাববার বিষয় হলো— সংসার চালানোর আপ্রাণ চেষ্টা শেষে যদি সন্তানকেই আমরা খুনি কিংবা লাশে পরিণত হতে দেখি, তবে সেই উপার্জনের সার্থকতা কোথায়? তবে এ মহামারি সংকট থেকে উত্তরণে শুধু পরিবারের দিকে আঙুল তুললে চলবে না; রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনা যারা করছেন, তাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ও ভূমিকা পালন করতে হবে। অভিভাবকরা যেমন অর্থনৈতিকভাবে নিসংগ ও অসহায়, তেমনি সামাজিক সুযোগ-সুবিধার অভাবের কারণে তারাও সন্তানের হাতে ফোন ছাড়া অন্য কিছু দিতে পারছেন না।
প্রথমত, নগর পরিকল্পনা ও অবকাঠামোগত পরিবর্তন আনয়ন করা রাষ্ট্র ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রাথমিক দায়িত্ব। নগর কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে পাড়া-মহল্লার বেদখল হয়ে যাওয়া খেলার মাঠগুলো উদ্ধার করতে হবে এবং সেখানে শিশুদের অবাধ প্রবেশের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি ওয়ার্ড ও মহল্লায় শিশুদের উপযোগী আধুনিক পাবলিক লাইব্রেরি ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তোলা জরুরি, যেন সন্তানরা প্রযুক্তির ক্ষতিকর স্ক্রিন ছেড়ে বই ও খেলার মাঠে ফিরে যেতে পারে। সরকারি উদ্যোগে প্রতিটি মহল্লায় অন্তত একটি খেলাধুলার কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রকে শিক্ষা ও ডিজিটাল নীতিমালার সংস্কার করতে হবে। ক্ষতিকর ও হিংস্র অনলাইন গেম এবং কিশোরদের মানসিক ক্ষতি করে এমন অ্যাপসগুলোর ওপর সরকারি তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে হবে। ইন্টারনেট প্রোভাইডারদের জন্য বয়সভিত্তিক কন্টেন্ট ফিল্টারিং ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে স্রেফ জিপিএ-৫ পাওয়ার অন্ধ দৌড় বন্ধ করে খেলাধুলা, স্কাউটিং, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং বাধ্যতামূলকভাবে মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে আসক্ত ও পথভ্রষ্ট শিক্ষার্থীদের সঠিক সময়ে চিনতে পেরে সঠিক পথে ফেরানো যায়।
তৃতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। রাজনৈতিক বা স্থানীয় যেসব সুবিধাবাদী ও কথিত 'বড় ভাই' নিজেদের আধিপত্য বিস্তার বা চাঁদাবাজির স্বার্থে এসব কোমলমতি কিশোরদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয় এবং গ্যাং তৈরি করে, তাদের কোনো ধরনের রাজনৈতিক আশ্রয় না দিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। অপরাধী কিশোরদের সংশোধনের জন্য কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোর আধুনিকায়ন ও মানসম্মত পুনর্বাসনের পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, যেন তারা সেখান থেকে সত্যিকারের সুনাগরিক হিসেবে ফেরত আসতে পারে।
একই সঙ্গে সমাজের প্রবীণ নাগরিক, শিক্ষক ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। পাড়া-মহল্লায় 'কমিউনিটি সেফটি কমিটি' গড়ে তুলে কিশোরদের চলাফেরা নজরদারিতে রাখা এবং তাদের সুস্থ বিনোদনে যুক্ত করার সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। স্কুলের বাইরে থাকা বা বিপথগামী কিশোরদের সামাজিক সচেতনতামূলক কাজে যুক্ত করার মাধ্যমে তাদের অপরাধের পথ থেকে সরিয়ে আনা সম্ভব। পরিশেষে, রাষ্ট্র ও সামাজিক উদ্যোগের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। রাত ৮টা বা ৯টায় কাজ শেষে বাড়ি ফিরলেও, রান্নাবান্না ও ঘরের কাজের ফাঁকেই সন্তানকে কাছে বসিয়ে গুণগত সময় দিন। সারাদিনের কথা শুনুন, তার অনুভূতিগুলোকে মূল্যায়ন করুন, যেন সে নিজেকে একাকী মনে না করে। সন্তানকে অনুধাবন করাতে হবে যে পাঁচ ইঞ্চি স্ক্রিনের বাইরে একটি সুন্দর ও ভালোবাসাময় বিশ্ব অপেক্ষা করছে। প্রযুক্তি বা অন্ধ নগরায়ণ যেন আমাদের সন্তানদের মানবিক সত্তাকে গ্রাস করতে না পারে। শৈশবকে ডিজিটাল বিষাক্ততা, একাকীত্ব ও সহিংসতার পথ থেকে ফিরিয়ে এনে সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশ দেওয়া পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের যৌথ ও আইনি দায়িত্ব। আজ যদি রাষ্ট্র, সমাজ ও অভিভাবকসমাজ এক হয়ে সন্তানদের বাঁচাতে এগিয়ে না আসেন, তবে আগামী দিনে এক মেধা শূন্য, আত্মঘাতী ও অপরাধপ্রবণ ভবিষ্যতের নির্মম দায়ভার শুধু আমাদেরই বহন করতে হবে।
লেখক : ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ এবং সহযোগী অধ্যাপক (খণ্ডকালীন), সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়
