অন্ধকারের চোরাবালিতে হারিয়ে যাওয়া শৈশব
আবু আফজাল সালেহ
প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান, ১৩ বছর বয়সী ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মর্মান্তিক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের বিবেককে আরও একবার তীব্রভাবে নাড়া দিয়েছে। মাত্র একটি আইফোনের লোভে একদল তরুণের হাতে যেভাবে এ নিষ্পাপ শিশুটি প্রাণ হারিয়েছে, তা আমাদের সমাজ ব্যবস্থার গভীরের এক চরম পচন ও নৈতিক দেউলিয়াত্বকে প্রকাশ করে। অপ্রতিমের মায়ের বুক খালি করা এই আর্তনাদ যেন এদেশের শেষ কোনো মায়ের কান্না হয়। আমরা আর কোনো শিশুকে কিশোর গ্যাংয়ের নির্মমতার শিকার হতে দেখতে চাই না, আবার কোনো কিশোরকে খুনি হিসেবেও দেখতে চাই না।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, খুনিদের সঙ্গে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই হেঁটে যাচ্ছিল অপ্রতিম। কিছুটা বড় ভাইদের সাথে মেশার চপল আকাঙ্ক্ষাই যে তার জন্য এতটা মারাত্মক রূপ নেবে, তা হয়তো শিশুটি কল্পনাও করতে পারেনি। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা একটি সংগঠিত 'কিশোর অপরাধ চক্র' বা কিশোর গ্যাংয়ের অংশ। এ হত্যাকাণ্ড কেবল একটি একক অপরাধ নয়, এটি দেশের সমকালীন শিশুহত্যা ও লাগামহীন কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির এক ভয়াবহ ও নির্মম প্রতিচ্ছবি। কিশোর অপরাধের মনস্তাত্ত্বিক দিকটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বয়ঃসন্ধিকালের জটিল মানসিক পরিবর্তন এবং পারিপার্শ্বিক প্রভাব এখানে প্রধান ভূমিকা পালন করে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এ বয়সে কিশোরদের মধ্যে এক ধরনের 'পিয়ার প্রেশার' বা সমবয়সীদের দলে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকে। অপ্রতিমও তার চেয়ে বয়সে কিছুটা বড় তরুণদের সাথে মিশতে চেয়েছিল— যা এ বয়সের সাধারণ মনস্তত্ত্ব। কিন্তু অপরাধ চক্রগুলো এই সরল মনস্তত্ত্বকে ব্যবহার করে তাদের ফাঁদে ফেলে। বর্তমান যুগে 'ইনস্ট্যান্ট গ্র্যাটিফিকেশন' বা যেকোনো কিছু দ্রুত পাওয়ার মানসিকতা কিশোরদের অন্ধ করে তুলছে। একটি আইফোনের মতো বিলাসবহুল পণ্যের লোভ তাদের মধ্যে সহানুভূতির মতো মৌলিক মানবিক গুণগুলোকে নিমেষেই ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইন্টারনেটে সহজলভ্য সহিংস গেম, পর্নোগ্রাফি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক কনটেন্ট। এগুলো কিশোরদের মস্তিষ্ককে ডেসেনসিটাইজ (সংবেদনহীন) করে তোলে, যার ফলে তারা বাস্তব জীবনে রক্তপাত বা খুনের মতো নৃশংস ঘটনা ঘটাতেও দ্বিধাবোধ করে না। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, একাকীত্ব এবং বাবা-মার উদাসীনতা তাদের এ মানসিক অবক্ষয়কে আরও ত্বরান্বিত করছে।
কিশোরদের এ সর্বনাশা পথে পা বাড়ানোর পেছনে রয়েছে বহুমুখী মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ। আকাশ সংস্কৃতি এবং অনিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট বা সাইবার স্পেসের ব্যবহার বড় ভূমিকা রাখছে। সাইবার অপরাধের পেছনে অনেক ক্ষেত্রে মাদক, অনলাইন জুয়া এবং পর্নোগ্রাফির মতো মরণনেশা জড়িয়ে রয়েছে। ইন্টারনেটে সহজলভ্য সহিংস কনটেন্ট কিশোর মনস্তত্ত্বকে চরমভাবে প্রভাবিত করছে, যার ফলে তাদের মধ্যে সহনশীলতা কমে যাচ্ছে এবং যেকোনো তচ্ছ কারণে হিংস্র হয়ে ওঠার প্রবণতা বাড়ছে। পারিবারিক বন্ধন শিথিল হয়ে পড়া এবং নৈতিক শিক্ষার অভাব।
অধিকাংশ পরিবারই আজ ব্যস্ততার চোরাবালিতে বন্দি। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে, তার ডিজিটাল ডিভাইসগুলোতে সে কী দেখছে— এ বিষয়গুলোর দিকে নজর দেওয়ার সময় বাবা-মার যেন নেই। অপ্রতিম একটু সিনিয়র ক্লাসের ছেলেদের সাথে মিশতে পছন্দ করত। অভিভাবক হিসেবে সন্তানদের এ নিঃসঙ্গতা বা বন্ধু নির্বাচনের বিষয়টি খেয়াল রাখা যে কতটা জরুরি, তা এ ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে প্রমাণ করে। রাজনৈতিক ও সামাজিক আশ্রয়-প্রশ্রয়। স্থানীয় 'বড় ভাই'দের রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে এ কিশোরদের ব্যবহার করার নোংরা সংস্কৃতি দেশজুড়ে বিদ্যমান। কিশোর অপরাধীদের পেছনে যখন কোনো প্রভাবশালী শক্তির ছায়া থাকে, তখন তারা এক ধরনের দায়মুক্তির মানসিকতা পেয়ে বসে। আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর এ দুঃসাহস একসময় তাদের খুনের মতো জঘন্য অপরাধে প্ররোচিত করে। একটি সুস্থ সমাজ গঠনে এ চোরাবালি থেকে আমাদের সন্তানদের টেনে তুলতেই হবে।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের আইনি দিকটি আমাদের বিচার ব্যবস্থা এবং বিদ্যমান আইনের কার্যকারিতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বাংলাদেশে কিশোর অপরাধের বিচার ও সুরক্ষার মূল ভিত্তি হলো শিশু আইন ২০১৩ (যা ১৯৭৪ সালের আইনকে প্রতিস্থাপন করেছে)। এ আইন অনুযায়ী, ১৮ বছর পর্যন্ত যেকোনো ব্যক্তিকে শিশু হিসেবে গণ্য করা হয় এবং ৯ বছরের নিচের কোনো শিশুর ওপর ফৌজদারি দায় বর্তায় না। আইন অনুযায়ী, কিশোর অপরাধীদের বিচার সাধারণ আদালতে নয়, বরং বিশেষায়িত শিশু-আদালতে হওয়ার কথা এবং তাদের কোনোভাবেই সাধারণ কারাগারে রাখা যাবে না। তাদের পাঠাতে হবে শিশু-উন্নয়ন-কেন্দ্রে, যেখানে শাস্তির চেয়ে সংশোধন ও পুনর্বাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
আইনের অপব্যবহার এ পরিস্থিতি বাড়িয়ে দিচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। অনেক সময় দেখা যায়, কিশোর গ্যাংয়ের মূল হোতারা (যারা বয়সে প্রাপ্তবয়স্ক) নিজেদের আড়াল করতে অপরাধের মূল অস্ত্র হিসেবে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরদের ব্যবহার করে। তারা জানে যে, শিশু আইনের অধীনে এ কিশোররা সর্বোচ্চ শাস্তি (যেমন মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন) থেকে রেহাই পেয়ে যাবে। আইন বিষয়ে অধিক সতর্ক ও কৌশলী হতে হবে। বাংলাদেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ ডেডিকেটেড শিশু আদালত এবং শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের তীব্র সংকট রয়েছে। এর ফলে অনেক জেলায় সাধারণ আদালতই শিশু আদালতের দায়িত্ব পালন করে, যেখানে শিশু-বান্ধব পরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব হয় না। শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোর অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রায়শই প্রশ্ন ওঠে। অনেক সময় সাধারণ অপরাধে যাওয়া একটি শিশু সেখান থেকে আরও বড় অপরাধী হয়ে বের হয়ে আসে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে শিশুহত্যা এবং কিশোর অপরাধের গ্রাফ আশঙ্কাজনকভাবে ঊর্ধ্বমুখী। যে বয়সে কিশোরদের হাতে বই, খেলার সামগ্রী কিংবা সৃজনশীল স্বপ্ন থাকার কথা, সেই বয়সে তাদের পকেটে শোভা পাচ্ছে ধারালো ছুরি কিংবা মাদক। পাড়ার মোড়ে মোড়ে গড়ে ওঠা এই কিশোর গ্যাংগুলো আজ কেবল ইভটিজিং বা ছোটখাটো মারামারির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; তারা জড়িয়ে পড়ছে খুন, ছিনতাই, ডাকাতি এবং চাঁদাবাজির মতো মারাত্মক সব অপরাধে। অপ্রতিমের ঘটনাটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, সমাজ ও পরিবারের উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে কীভাবে এ কিশোররা একেকটি নৃশংস খুনিতে রূপান্তরিত হচ্ছে।
আইনি সংস্কারের ক্ষেত্রে কিশোরদের অপরাধের ধরণ ও ভয়াবহতা বিবেচনা করে আইনের কিছু ধারার সময়োপযোগী পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন, যাতে কেউ 'শিশু' পরিচয়ের আড়ালে পার পেয়ে না যায়। একই সাথে, ডিজিটাল স্পেসে অপরাধমূলক এবং সহিংস কনটেন্টের ওপর কঠোর নজরদারি চালাতে হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা এবং কঠোরভাবে নৈতিক শিক্ষার চর্চা বাড়াতে হবে। সন্তানদের সাথে বাবা-মার গুণগত সময় কাটানো এবং তাদের মানসিক পরিবর্তনের দিকে সার্বক্ষণিক নজর রাখা আবশ্যক। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা এবং কঠোরভাবে নৈতিক শিক্ষার চর্চা বাড়াতে হবে। সন্তানদের সাথে বাবা-মার গুণগত সময় কাটানো এবং তাদের মানসিক পরিবর্তনের দিকে সার্বক্ষণিক নজর রাখা আবশ্যক। একই সঙ্গে পাড়া-মহল্লায় সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি গড়ে তুলতে হবে, যা কিশোর গ্যাং কালচারের বিস্তার রুখে দেবে।
রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবার—সব স্তরের যৌথ সচেতনতা ও কঠোর পদক্ষেপই পারে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এ অন্ধকারের হাত থেকে রক্ষা করতে। অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর প্রশাসন দ্রুত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং দ্রুততম সময়ে অভিযোগপত্র দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে, যা প্রশংসনীয়। কিন্তু কেবল অপরাধের পর বিচার বা সংক্ষিপ্ত সময়ে শাস্তি নিশ্চিত করাই এ সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়। আমাদের কাজ করতে হবে এ অপরাধের গোড়া কেটে ফেলার জন্য।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক।
