আমাদের সামাজিক পচন!
আবু মো. ফজলে রোহান
প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
এক প্লেট ভাতের দাম আর কত? ১০, ২০ কিংবা বড়জোর ৫০ টাকা। কিন্তু এক প্লেট ভাতের জন্য জীবন দিতে হলো এক তরুণকে। বলছিলাম খুলনায় খুন হওয়া আজমলের কথা। মেসের নিয়ম ছিল, খাবার খেতে হলে আগে থেকে জানাতে হবে। কিন্তু আজমল সে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে অন্যের জন্য রেখে দেয়া খাবার খেয়ে ফেলে। আর তাতেই জীবন দিতে হলো তাকে।
এদিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের তেরো বছরের সন্তান অপ্রতীমকে জীবন দিতে হলো একটি আইফোনের জন্য। পুলিশ জানিয়েছে, তুহিন নামক ১৯ বছরের এক বালক অপ্রতীম কে হত্যা করেছে এবং আইফোনটি তুহিনের বাসা থেকেই উদ্ধার করা হয়েছে। পত্রিকার প্রতিবেদন বলছে, এভাবে বিগত ৮ মাসে নিখোঁজ হওয়া শিশুদের মধ্যে ৩৬ জনকে মৃত উদ্ধার করা হয়েছে।
তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হত্যা, খুন বেড়ে চলছে। প্রশ্ন হলো কিশোর সমাজ কেন এতোটা বেপরোয়া হয়ে উঠছে? কেনই বা মানুষের সহনশীলতা দিন দিন কমে যাচ্ছে? এ পরিস্থিতি কি একদিনে তৈরি হয়েছে?
মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে এ চরম অবক্ষয়ের পেছনে বেশকিছু উল্লেখযোগ্য কারণ রয়েছে। যেমন : ড. আলবার্ট বান্দুরা তার স্যোশাল লার্নিং থিওরিতে লিখেছেন, কিশোরেরা তাদের চারপাশের সহিংস আচরণ কিংবা পরিবেশ দেখে শিখে। এ ছাড়া রবার্ট কে মার্টন তার স্ট্রেইন থিওরিতে দেখিয়েছেন, তরুণ সমাজের সামনে যখন বস্তুগত সাফল্য (যেমন : দামি ফোন, বাইক, গাড়ি) কে মূল লক্ষ্য হিসেবে দাঁড় করানো হয়, কিন্তু তা অর্জনের বৈধ পন্থা বা উপায় থাকেনা, তখন তারা অপরাধের পথ বেছে নেয়। শুধু তাই নয়, একজন মানুষের 'যা পাওয়া উচিত' আর 'যা সে পাচ্ছে'— এ দুটোর মধ্যে যখন পার্থক্য সৃষ্টি হয় তখনই সহিংসতার জন্ম নেয় বলে দাবি করেছেন আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী টেড রবার্ট গার।
আমরা আমাদের কিশোরদেরকে শিক্ষামুখী করে তুলতে পারিনি। শিক্ষিত সমাজ যখন দিনকে দিন অবহেলিত তখন সে সমাজে মাস্তানি করে বেড়ানো কিশোর গ্যাংদের জন্ম নেয়াই তো স্বাভাবিক। যে সমাজে গালি দিয়ে কন্টেন্ট বানালে রাতারাতি ভাইরাল হওয়া যায় সেখানে ভদ্রতার আভিজাত্য কীভাবে প্রত্যাশা করবেন? শিক্ষিত যুবক যখন বেকারত্বের খাতায় নাম লেখিয়ে দিনের পর দিন ঘুরে বেড়াচ্ছে তখন তুচ্ছ বিষয়ের জন্য খুন হওয়া অস্বাভাবিক ভাবা যায় না। একটি রাষ্ট্র যখন তরুণদের সুস্থ ভবিষ্যৎ, মানসম্মত কর্মসংস্থান ও নৈতিক মূল্যবোধের নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন নীতিকথা দিয়ে অপরাধ দমন সম্ভব হয়না। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় যখন অপরাধীরা পার পেয়ে যায়, খুন করার পরও আসামী নিশ্চিত থাকে তার ফাঁসি হওয়া অতোটা সহজ ব্যাপার নয়— তখন আরও দশজন অপরাধে জড়ানোর উৎসাহ পায়।
শুধু কাঠামোগত উন্নয়ন কখনো উন্নত নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে পারেনা। বরং শিক্ষার ইতিবাচক সংস্কার, তরুণদের সুস্থ বিনোদন ও কর্মসংস্থানমুখী করে তোলাই মূল চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া কিশোর গ্যাং ও অপরাধীদেরকে রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে রেহাই দেয়ার পথ রুদ্ধ করতে হবে। কারণ নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ ডগলাস নর্থ বলেছিলেন, যে রাষ্ট্রে আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষতা থাকেনা সেখানে সামাজিক শৃঙ্খলা ধরে রাখা অসম্ভব।
অতএব, সমাজবিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা ও প্রতিদিনের রক্তক্ষয়ী বাস্তবতা আমাদেরকে লাল সংকেত দেখাচ্ছে। আমরা কি আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ একটি সমাজ উপহার দিতে পারবো? নাকি একের পর এক তাজা প্রাণের বিনিময়ে শোকস্তব্ধ হয়ে থাকবো? এ সমাজের পচন এখনই রোধ করতে না পারলে আগামীর প্রজন্ম তলিয়ে যাবে এক অন্ধকার অতল গহ্বরে।
লেখক : শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
