কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি মানব সভ্যতার নতুন ফ্রাঙ্কেনস্টাইন
রাহাত মিনহাজ
প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মানবের সঙ্গে যন্ত্রদানবের সম্ভব্য সভ্যতাবিনাশী সংঘাতের বিষয়টি ইতিহাসে বহুচর্চিত। যে বিষয়টি ব্রিটিশ সাহিত্যিক ম্যারি ওলস্টোনক্র্যাফ্?ট শেলি ১৮১৮ সালে তার ফ্রাঙ্কেনস্টাইন অথবা দ্য মডার্ন প্রমিথিউস উপন্যাসে বিস্তারিত তুলে ধরেছিলেন। উচ্চারণ করেছিলেন সর্বোচ্চ সতর্কতা।
ম্যারি শেলির সেই সতর্কতা এক নতুন আতঙ্ক হয়ে ২০২৬ সালে বিশ্বসভ্যতার সামনে হাজির হয়েছে। যে ঝুঁকি বা শঙ্কার নাম হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বর্তমান যুগের অনিবার্য ফ্রাঙ্কেনস্টাইন। এখানে একটু উল্লেখ করা প্রয়োজন ম্যারি শেলি সেই বিখ্যাত উপন্যাসের বিজ্ঞান গবেষণায় তৈরি দানবের নাম ফ্রাঙ্কেনস্টাইন ছিল না।
ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন ছিলেন একজন সুইস বিজ্ঞানী যিনি গবেষণাগারে দানবিক মানব শরীরে প্রাণ সঞ্চার করেছিলেন। যদিও বিজ্ঞানের আত্মবিনাশী ও ধ্বংসাত্মক আবিষ্কার বুঝাতে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অভিযাত্রায় বর্তমান সময়কে যৌক্তিকভাবেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। নিঃসন্দেহে এ যুগে মানুষের মতো বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ও নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম যন্ত্র অভূতপূর্ব সম্ভাবনা তৈরি করছে।
চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সামর্থ্য সম্পন্ন এই যন্ত্র মানুষের বহু জটিল কাজ সহজ করে দিয়েছে। কমিয়েছে ঝুঁকি, বাঁচিয়েছে সময়, তৈরি করেছে নতুন সম্ভাবনা। শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা, সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, পর্যবেক্ষণ, সমুদ্র থেকে মহাকাশ গবেষণা—এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার হচ্ছে না।
বেকারিতে রুটি তৈরি থেকে শুরু করে শিল্প ইউনিটে জটিল চিপ তৈরিতেও ব্যবহৃত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আর এরই সাথে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তিনির্ভর কোম্পানিগুলোর মধ্যে শুরু হয়েছে এক তীব্র প্রতিযোগিতা।
বিশ্বের প্রধান প্রযুক্তি জায়ান্ট যেমন মাইক্রোসফট, এ্যামাজন ও গুগল এআই নিয়ে এক তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত। যাকে অনেকেই উল্লেখ করছেন প্রযুক্তিগত গোল্ডরাশ হিসেবে। সাথে পুরোপুরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি কোম্পানি অ্যানথ্রপিক, ওপেনএআই তো আছেই। এখানেই মানবসভ্যতা বিনাশের শঙ্কা করছেন প্রযুক্তিবিদরা। তাদের শঙ্কা এআই-এর লাগামহীন বিস্তার ধ্বংস করত পারে মানবসভ্যতাকে। যার নমুনা এখনই দৃশ্যমান।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কীভাবে বিশ্বের জন্য অনিবার্য হুমকি তৈরি করেছে তার একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। বর্তমান বিশ্ব প্রায় ইন্টারনেট নির্ভর। যদি কোনো কারণে সারাবিশ্বে মাত্র ৩০ মিনিটের জন্য ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ থাকে তাহলে পৃথিবীতে মহাবিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সেবা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী দারিও অ্যামোদেই উল্লেখ করেছেন, আগামী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্টের একটি 'সোয়ার্ম' (একত্রিত ঝাঁক) স্থায়ী বটনেট তৈরির মাধ্যমে পুরো ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে। যার ফলে সম্ভাব্য ক্ষতি হতে পারে কয়েকশ বিলিয়ন ডলার। হতে পারে ভয়ঙ্কর নিরাপত্তা ঝুঁকি।
শুধু একবার চিন্তা করুন তো, পৃথিবীর কোনো ব্যস্ত বিমানবন্দরের যোগাযোগ ব্যবস্থা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) নিয়ন্ত্রণে। আর সেই যন্ত্র তার জন্য নির্ধারিত দায়িত্ব ও পরিবেশের বাইরে গিয়ে নিয়ন্ত্রণহীন আচরণ করছে! তাহলে মুহূর্তেই কি বিপর্যয় না নেমে আসতে পারে মানবসভ্যতায়।
অথবা একবার ভাবুন তো সারাবিশ্বের পারমাণবিক অস্ত্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণে যুক্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কম্পিউটারগুলো যদি মানুষের নির্দেশনার বাইরে আচরণ শুরু করে, এআই সিস্টেমগুলো নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে আচরণ (অ্যাক্ট) শুরু করে, তাহলে কী ঘটবে?
এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিজস্ব ভূমিকা নিজেই শ্রেণিবিন্যাস করা, প্রতারণামূলক এবং এমনকি নিজের কর্মকাণ্ডের প্রমাণ মুছে ফেলার মতো সক্ষমতা তৈরি হলে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়।
ভীতিকর আশঙ্কার বিষয় হলো, এ প্রবণতা এরই মধ্যেই দৃশ্যমান। যদিও অনেক গবেষক বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) নিয়ে এই অতিরিক্ত শঙ্কা এক ধরনের অদ্ভুত বাজে কথা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাব ও বিপদ নিয়ে বিশ্বের বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদরা বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্নমত প্রকাশ করলেও এর অনিবার্য বিপদ নিয়ে অনেক আগে থেকেই সোচ্চার জাতিসংঘ।
চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবজাতির জন্য অস্তিত্ব সংকট তৈরি করতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশে সফররত জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনার ভলকার তুর্ক। তুর্ক বলেন, খুব দেরি হওয়ার আগেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হোক। সম্ভব্য ঝুঁকি এড়াতে তিনি অতি জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশ্বের রাষ্ট্র ও এআই কোম্পানিগুলোর প্রতি জানানো আহ্বানে তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে চলমান প্রতিযোগিতা মানবসভ্যতার অস্তিত্বের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। স্বশাসিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতা বিশেষ করে ইচ্ছাকৃতভাবে পরিকল্পিত ব্যবস্থার ব্যর্থতা অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবাগুলোকে স্থবির করে দিতে পারে, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে দিতে পারে, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে অস্থিতিশীল করতে পারে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মূলে আঘাত হানতে পারে। (১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, জাতিসংঘ ওয়েবসাইট)
নিয়ন্ত্রণহীন এআই প্রযুক্তি এবং এ নিয়ে পাগলাটে প্রতিযোগিতা যে মানবসভ্যতার জন্য বড় বিপদ ডেকে আনছে তাতে আর সন্দেহ প্রকাশের সুযোগ নেই। এখন একান্ত প্রয়োজন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সেবা ও প্রযুক্তি পণ্যের তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিরীক্ষা করা।
এক্ষেত্রে বিশ্ব নেতৃত্বের একমত হওয়াও খুব জরুরি। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ এই প্রযুক্তির কিছুটা নিয়ন্ত্রণ ও কঠোর নিরাপত্তা নিরীক্ষার কথা বললেও অন্য প্রযুক্তি পরাশক্তি চীন উন্মুক্ত বা ওপেন এআই মডেলের বিকাশে উৎসাহ দিচ্ছে। যা এআই নিয়ে নতুন ভীতি ছাড়াচ্ছ। যা বিশ্ব সমাজ, অর্থনীতি এমনকি মানবজাতির অস্তিত্বের জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
সভ্যতার বিকাশে বিজ্ঞানের প্রভাব ও বিস্তার অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তবে এর লাগামটা নিজের হাতে রাখা প্রয়োজন। যদি এই লাগাম হাতছাড়া হয়ে যায় তাহলে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন দানবের মতো কৃত্রিমবুদ্ধিমত্তা মানবসভ্যতাকে বিনাশে লিপ্ত হবে তাতে সন্দেহ নেই।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
