আজ বিশ্ব পর্যটন দিবস—
সমাজ ও সংস্কৃতির উন্নয়নে পর্যটনের ভূমিকা
খালেদ সাইফুল্লাহ মাহমুদ
প্রকাশ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশ চিরকালই তার অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য সুপরিচিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ দেশের পর্যটন শিল্প শুধু অর্থনীতিতেই অবদান রাখছে না; বরং আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিতে এক বৈপ্লবিক ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। পর্যটন এখন আর শুধু ঘুরে বেড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি হয়ে উঠেছে সংস্কৃতি আদান-প্রদান এবং সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণ ও পুনরুজ্জীবন: পর্যটন প্রসারের ফলে আমাদের হারিয়ে যেতে বসা অনেক সাংস্কৃতিক উপাদান নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে গ্রামীণ লোকশিল্প, ঐতিহ্যবাহী মেলা, লোকসংগীত (যেমন: বাউল, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি), পুতুলনাচের মতো লোকজ মাধ্যমগুলোর চর্চা আবার বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানসমূহ যেমন— বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ, পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার এবং সুন্দরবনের মতো প্রত্নতাত্ত্বিক ও প্রাকৃতিক নিদর্শনগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে সামাজিক সচেতনতা তৈরি হয়েছে।
পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সামাজিক মেলবন্ধন: পর্যটন বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে যোগাযোগের সেতু হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকরা যখন খাগড়াছড়ি, বান্দরবান বা রাঙামাটির মতো পার্বত্য অঞ্চলে যান, তখন তারা সেখানকার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে সরাসরি জানার সুযোগ পান। এতে করে শহরের মানুষের সঙ্গে প্রান্তিক ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সামাজিক মেলবন্ধন আরও দৃঢ় হচ্ছে, যা একটি পরমতসহিষ্ণু ও বহুত্ববাদী সমাজ গঠনে সহায়ক।
গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়ন: পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সমাজ ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। বিশেষ করে 'হোমস্টে' পর্যটন এবং স্থানীয় কুটির শিল্পের প্রসারের ফলে গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। মণিপুরী শাড়ি, নকশিকাঁথা বা বাঁশ-বেতের তৈরি জিনিসপত্র সরাসরি পর্যটকদের কাছে বিক্রি করে নারীরা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। এটি গ্রামীণ সমাজব্যবস্থায় নারীর মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত রূপান্তর: একটি পর্যটন অঞ্চল গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার রাস্তাঘাট, যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন ঘটে। উদাহরণস্বরূপ— কক্সবাজার, শ্রীমঙ্গল বা কুয়াকাটার মতো পর্যটন এলাকাগুলোর স্থানীয় বাসিন্দারা এখন উন্নত নাগরিক সুবিধা ভোগ করছেন। পর্যটনের কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আধুনিক শিক্ষার প্রতি আগ্রহ এবং সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সামগ্রিক সামাজিক সূচকের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।
নেতিবাচক প্রভাব ও সচেতনতা: পর্যটনের অনেক ইতিবাচক দিক থাকলেও অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের কারণে স্থানীয় সংস্কৃতিতে পশ্চিমা বা অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশের ঝুঁকি থাকে। এ ছাড়া প্লাস্টিক দূষণ এবং পরিবেশের ক্ষতি স্থানীয় সমাজের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাই সমাজ ও সংস্কৃতির বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে 'টেকসই পর্যটন' ও 'দায়িত্বশীল পর্যটন'-এর ওপর জোর দেওয়া জরুরি।
আজ বিশ্ব পর্যটন দিবস। এ দিবসকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক এবং জাতীয় প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের একটি সুনির্দিষ্ট ও সম্ভাবনাময় অবস্থান রয়েছে। এ বছর দিবসের মূল প্রতিপাদ্য হলো—
Digital Agenda and Artificial Intelligence to Redesign Tourism (পর্যটন পুনর্নির্মাণে ডিজিটাল এজেন্ডা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা)। এ বৈশ্বিক ভাবধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন এবং টেকসই পর্যটন প্রসারে বিশেষ অবস্থান নিয়েছে।
ডিজিটাল রূপান্তর ও এআইয়ের ব্যবহার: বৈশ্বিক প্রতিপাদ্যের সঙ্গে মিল রেখে বাংলাদেশ পর্যটন খাতকে স্মার্ট করার উদ্যোগ নিয়েছে। হোটেল বুকিং, অনলাইন ভিসা প্রসেসিং, ভার্চুয়াল ট্যুর এবং পর্যটন গন্তব্যগুলোর নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির সংযোজন করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ পর্যটন পুরস্কার: পর্যটন খাতকে আরও গতিশীল করতে এবং এ শিল্পে অবদানের স্বীকৃতি দিতে বাংলাদেশ সরকার প্রথমবারের মতো ১২টি ভিন্ন শাখায় এ পুরস্কার চালুর ঘোষণা দিয়েছে। টেকসই পর্যটন, ডিজিটাল রূপান্তর, উদ্ভাবন এবং নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতেই মূলত এ রাষ্ট্রীয় সম্মাননার আয়োজন করা হয়েছে।
কক্সবাজারে উৎসব: পর্যটন দিবস উপলক্ষে দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজার সেজেছে বর্ণিল সাজে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সৈকতে আয়োজন করা হয়েছে তিন দিনব্যাপী উৎসব; যেখানে থাকছে কালারফুল র্যালি, বিচ বাইক ও ঘোড়ার বহর প্রদর্শনী, ফুড ফেস্টিভ্যাল, লাইভ কুকিং শো এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এ ছাড়া পর্যটকদের আকর্ষণ করতে এখানকার হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোতে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পর্যটন করপোরেশন : ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি জেলায় পর্যটন র্যালি, আলোচনা সভা এবং সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে দেশের পর্যটন স্পটগুলোকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার প্রয়াস চালানো হচ্ছে।
টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন: বাংলাদেশের অন্যতম বড় ফোকাস হলো পরিবেশ রক্ষা করে পর্যটন শিল্পের বিকাশ। সুন্দরবন, সাজেক ভ্যালি, রাতারগুল এবং পার্বত্য অঞ্চলের মতো সংবেদনশীল ইকো-সিস্টেমগুলোতে প্লাস্টিক দূষণ রোধ এবং 'দায়িত্বশীল পর্যটন' নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ: সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বৈশ্বিক পর্যটন সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের (যেমন : মালদ্বীপ বা শ্রীলঙ্কা) তুলনায় বাংলাদেশ কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে সমন্বয়ের অভাব, আন্তর্জাতিক প্রচারণার স্বল্পতা এবং অবকাঠামোগত কিছু সীমাবদ্ধতা। তবে বর্তমান 'স্মার্ট বাংলাদেশ' বা ডিজিটাল এজেন্ডার সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার অবস্থান দ্রুত উন্নত করছে।
বর্তমান ও অতীতের মেলবন্ধনেই ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ: এ ক্ষেত্রে হেরিটেজ ও ইসলামিক পর্যটন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ জুড়ে রয়েছে ইসলামিক হেরিটেজ এবং ধর্মীয় পর্যটন। শত শত বছর ধরে সুফি-সাধক, আউলিয়া এবং মুসলিম শাসকদের আগমনে এ ভূখণ্ডে যে অনন্য ইসলামী সংস্কৃতি ও স্থাপত্য গড়ে উঠেছে, তা আজ বাংলাদেশের পর্যটন খাতের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। বাংলাদেশের ইসলামিক হেরিটেজ এবং ইসলামিক পর্যটনের অবদান ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ব্যাপক।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যে ইসলামিক হেরিটেজের অবদান: বাংলাদেশের ইতিহাস, সমাজ ব্যবস্থা ও সংস্কৃতির রূপান্তরের পেছনে ইসলামের ভূমিকা অত্যন্ত গভীর, এক্ষেত্রে সুফিবাদের প্রভাব ও সামাজিক সম্প্রীতি প্রণিধানযোগ্য। হজরত শাহজালাল (র.), শাহ পরান (র.) এবং খান জাহান আলীর (র.) মতো মহান সুফি-সাধকদের হাত ধরে এ অঞ্চলে ইসলামের প্রচার ঘটেছিল। তাদের উদার ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বাঙালি সংস্কৃতিতে এক অনন্য ধর্মীয় সম্প্রীতি ও উদারতার জন্ম দিয়েছে।
স্থাপত্যশৈলীর বিকাশ: সুলতানি, মোগল এবং ব্রিটিশ আমলে নির্মিত মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকাহগুলো এদেশের স্থাপত্য শিল্পের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। টেরাকোটা (পোড়ামাটির ফলকচিত্র) ও পাথরের কারুকাজে সমৃদ্ধ এ স্থাপনাগুলো প্রাচীন বাংলার সমৃদ্ধিকে প্রদর্শন করে।
ইসলামিক ঐতিহ্যবাহী পর্যটন কেন্দ্রসমূহ : বাংলাদেশে অসংখ্য ঐতিহাসিক ইসলামী স্থাপনা রয়েছে, যা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করার ক্ষমতা রাখে যেমন— ষাট গম্বুজ মসজিদ, হজরত শাহজালাল (র.) ও হজরত শাহ পরানে (র.) মাজার, লালবাগ কেল্লা ও মোগল মসজিদ, তারা মসজিদ, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদসহ বিভিন্ন প্রাচীন মসজিদ। এ ছাড়া টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ইজতেমা হলো হজের পর মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জমায়েত। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখ লাখ মুসলিম এখানে আসেন, যা বাংলাদেশের ইসলামিক পর্যটনকে আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়ে গেছে। এ ছাড়া শবে বরাত, শবে কদর, ঈদ এবং বিভিন্ন সুফি সাধকদের বার্ষিক ওরশ উপলক্ষে দেশের ভেতর পর্যটনের পাশাপাশি বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়।
আন্তর্জাতিক মুসলিম পর্যটক আকর্ষণ : বিশ্বজুড়ে হালাল ট্যুরিজমের বাজার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং ওমানের মতো দেশগুলোর পর্যটকদের জন্য বাংলাদেশ একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হতে পারে।
বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতির আত্মপরিচয় বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো পর্যটন। পর্যটনের সঠিক বিকাশ যেমন আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখবে, তেমনই গ্রামীণ ও প্রান্তিক সমাজের জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে।
লেখক : সাংবাদিক ও পর্যটন উন্নয়ন উপদেষ্টা
