মাদকের গ্রাস থেকে যুব সমাজকে ফেরাতে হবে

বিলকিস জাহান

প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ এবং উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের সৃষ্টিশীলতা, উদ্দীপনা ও অদম্য সাহসের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে একটি জাতির ভবিষ্যৎ। কিন্তু বর্তমান সময়ে এই অপার সম্ভাবনাময় যুবসমাজ একটি ভয়াবহ অন্ধকারের মুখোমুখি। মাদকের করাল গ্রাস আজ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে সমাজজুড়ে, যার বিষাক্ত ছোবল আমাদের তরুণদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে এক অমানিশার দিকে। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাঙ্গন, খেলার মাঠ থেকে কাজের জায়গা— সর্বত্রই যেন মাদকের নীল ছোবল। যদি এখনই এই ভয়াবহ পরিস্থিতি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে একটি পুরো প্রজন্ম ধংসের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে।

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মাদক ব্যবসা একটি লাভজনক অবৈধ অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মাদকের বিস্তার আরও বেশি জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। বর্তমানে কেবল উচ্চবিত্তদের ড্রয়িংরুম বা বস্তির অন্ধকার গলিতেই মাদক সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা ছাড়িয়ে সমাজের সর্বস্তরে প্রবেশ করেছে। ইয়াবা, ফেনসিডিল, হিরোইন, গাঁজা থেকে শুরু করে এলএসডি, আইস বা ক্রিস্টাল মেথের মতো মারাত্মক কৃত্রিম মাদক আজ তরুণদের নাগালের মধ্যে। তরুণসমাজ কেন এই বিষাক্ত ফাঁদে পা দিচ্ছে, তার পেছনে রয়েছে নানাবিধ সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও পরিবেশগত কারণ।

ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পাচারের কারণে আমাদের দেশে মাদকের সহজলভ্যতা মারাত্মক বৃদ্ধি পেয়েছে। হাতের কাছেই মাদক পাওয়ার সুযোগ তরুণদের কৌতূহলী করে তোলে। বন্ধুদের প্ররোচনা মাদক গ্রহণের অন্যতম প্রধান কারণ। অনেক সময় বন্ধু মহলে নিজেকে আধুনিক প্রমাণ করতে গিয়ে তরুণরা প্রথমবার মাদক সেবন করে, যা পরবর্তীতে আসক্তিতে রূপ নেয়।

উচ্চশিক্ষা শেষ করার পরও কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান না পাওয়া, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম উদ্বেগ তরুণদের মধ্যে গভীর মানসিক হতাশার জন্ম দেয়। এই সাময়িক মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই মাদকের আশ্রয় নেয়।

আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানদের যোগাযোগের অভাব দেখা দিচ্ছে। পরিবারে পর্যাপ্ত সময়, ভালোবাসা ও দিকনির্দেশনার অভাবে তরুণরা একাকিত্বে ভোগে এবং সেই একাকিত্ব দূর করতে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে। যেসব পরিবারে প্রতিনিয়ত ঝগড়াঝাঁটি, দাম্পত্যকলহ বা বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ঘটে, সেখানের সন্তানরা চরম মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যায়। এই মানসিক অস্থিরতা তাদের ভুল পথে পরিচালিত করে। সিনেমা, ওয়েব সিরিজ এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় মাদক সেবনকে অনেক সময় গ্ল্যামারাইজড বা আকর্ষণীয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এর প্রভাবে অনেক তরুণ রোমাঞ্চবোধ থেকে মাদকে হাত দেয়। মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব কেবল একজন ব্যক্তির শারীরিক স্বাস্থ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিত্তিমূলকে নাড়িয়ে দেয়।

মাদক সেবনের ফলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো— যেমন কিডনি, লিভার, ফুসফুস ও মস্তিষ্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হিরোইন বা ইয়াবার মতো মাদক দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগ, স্ট্রোক, মানসিক ভারসাম্যহীনতা এবং ক্যান্সারের জন্ম দেয়। ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণের ফলে এইচআইভি-এইডস ও হেপাটাইটিস-বির মতো মরণব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

একটি পরিবারে একজন মাদকাসক্ত সদস্য থাকা মানে পুরো পরিবারের শান্তি চিরতরে বিলীন হয়ে যাওয়া। মাদক কেনার টাকার জন্য সন্তান বাবা-মায়ের ওপর শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার চালায়, ঘরের জিনিসপত্র চুরি করে এমনকি মা-বাবাকে হত্যা করার মতো জঘন্য ঘটনাও ঘটে। সমাজ ও আত্মীয়স্বজনের কাছে পরিবারটিকে হেয় প্রতিপন্ন হতে হয়।

মাদকের সাথে অপরাধের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। মাদক কেনার টাকা জোগাড় করতে তরুণরা চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি এবং অপহরণের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে সমাজে কিশোর গ্যাং কালচারের যে চরম বিস্তার ঘটেছে, তার পেছনে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে মাদক। সামান্য মাদক সেবনের টাকার জন্য খুন-খারাবি করতেও এই তরুণরা দ্বিধা করছে না, যা সমাজের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটাচ্ছে।

যুবসমাজ একটি রাষ্ট্রের মূল অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। যখন দেশের লাখ লাখ তরুণ কর্মক্ষমতা হারিয়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে, তখন দেশের উৎপাদনশীলতা ও কর্মদক্ষতা থমকে দাঁড়ায়। সরকারকেও প্রতি বছর মাদকের বিস্তার রোধ ও আসক্তদের চিকিৎসায় বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়, যা মূল অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই ভয়াবহ সংকট থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদী এবং কঠোর পদক্ষেপ। সরকার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবার— সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে। মাদকের চোরাচালান বন্ধে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি ও সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর তৎপরতা বহুগুণ বাড়াতে হবে। মাদক ব্যবসায়ী, পাচারকারী এবং এর পেছনের 'গডফাদারদের' চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

পরিবারই হলো একটি শিশুর প্রথম বিদ্যালয়। সন্তানের সাথে বাবা-মায়ের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তারা কার সাথে মেলামেশা করছে, কোথায় সময় কাটাচ্ছে— সে বিষয়ে সজাগ নজর রাখতে হবে। সন্তানকে ধর্মীয়, নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধে শিক্ষিত করে তুলতে হবে যাতে তারা ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে পারে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মাদকের কুফল সম্পর্কে নিয়মিত সেমিনার, কর্মশালা ও সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন আয়োজন করতে হবে। তরুণদের অতিরিক্ত সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা অলসভাবে কাটানোর পরিবর্তে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, স্কাউটিং, বিতর্ক ও সমাজসেবামূলক কাজে যুক্ত করতে হবে।

সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে আধুনিক, মানসম্মত এবং ব্যয়সাশ্রয়ী মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। পুনর্বাসিত তরুণদের সমাজে নতুন করে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর জন্য তাদের মানসিক শক্তি প্রদান ও উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে হবে। মাদকের এ বিষাক্ত ছোবল কেবল কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির সমস্যা নয়, এটি সমগ্র জাতির অস্তিত্বের ওপর এক বিরাট হুমকি।

লেখক : সাংবাদিক