বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত এবার বাস্তবায়নের পালা

প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

'বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত'— ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের সামনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এ বার্তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। নিউইয়র্কে জেপি মর্গানের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তিনি শুধু বিনিয়োগের আহ্বান জানাননি; বিনিয়োগের জন্য আস্থা, পূর্বানুমেয়তা ও অনুকূল পরিবেশের প্রয়োজনীয়তার কথাও স্পষ্ট করেছেন।

বাংলাদেশের সামনে বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জও। বিপুল জনসংখ্যা, তরুণ কর্মশক্তি, ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ বাজার এবং কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সক্ষমতার পাশাপাশি জ্বালানি, অবকাঠামো, লজিস্টিকস, প্রযুক্তি, ডিজিটাল সেবা, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা ও জলবায়ু অর্থায়নের মতো খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথাও প্রধানমন্ত্রী তুলে ধরেছেন।

তবে বিদেশি বিনিয়োগ কেবল আকর্ষণীয় বক্তব্যে আসে না। বিনিয়োগকারীরা দেখতে চান একটি দেশের নীতি কতটা স্থিতিশীল, আইন ও বিধিবিধান কতটা পূর্বানুমেয়, ব্যবসা পরিচালনায় প্রশাসনিক জটিলতা কতটা কম, বিনিয়োগ কতটা সুরক্ষিত এবং প্রয়োজনের সময় মুনাফা বৈধভাবে দেশে বা দেশের বাইরে স্থানান্তর কতটা সহজ। প্রধানমন্ত্রী নিজেও ওয়াল স্ট্রিটের বৈঠকে স্বীকার করেছেন— শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগকারীরা বক্তব্যের পর কী ঘটে, সেটিই বিবেচনা করেন।

এ কারণেই 'বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত'— এ ঘোষণাকে বাস্তব অর্থ দিতে হলে দেশে ব্যবসার পরিবেশকে সত্যিকার অর্থেই সহজ, স্বচ্ছ ও পূর্বানুমেয় করতে হবে। নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও বিধিবিধান সরলীকরণ, কর ও ভ্যাট ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রয়োজন। শুধু নীতিমালা প্রণয়ন নয়, সেগুলোর ধারাবাহিক ও নিরপেক্ষ প্রয়োগও জরুরি।

বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বিনিয়োগ ও উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার যে লক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে দক্ষ মানবসম্পদ, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, উন্নত যোগাযোগ ও লজিস্টিকস, নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল অবকাঠামো এবং দক্ষ সরকারিসেবা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্যও সমানভাবে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। বিদেশি বিনিয়োগ ও দেশীয় বিনিয়োগকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে দেখতে হবে।

২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যও প্রধানমন্ত্রী তুলে ধরেছেন। এ লক্ষ্য অর্জন কতটা সম্ভব, তা নিয়ে বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ থাকতে পারে; তবে লক্ষ্যটি বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের ধারাবাহিক প্রবাহ প্রয়োজন।

অতএব, ওয়াল স্ট্রিটে উচ্চারিত 'বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত' বার্তাটি এখন দেশে বাস্তবতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। বিনিয়োগকারীদের কাছে সবচেয়ে কার্যকর বার্তা হবে এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে নীতি স্পষ্ট, নিয়ম স্থিতিশীল, সিদ্ধান্ত দ্রুত, প্রতিষ্ঠান কার্যকর এবং বিনিয়োগ সুরক্ষিত। কথার সঙ্গে কাজের মিলই পারে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরি করতে। আর সেই আস্থাই হতে পারে নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি।