মানুষ, মহাবিশ্ব, বিস্ময় ও বিনয়ের দর্শন
মমতাজ উদ্দিন আহমদ
প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষ রাতের আকাশের দিকে তাকালে সে নিজের সীমারেখা দেখতে শেখে। পৃথিবী নামক একটি ক্ষুদ্র গ্রহের ক্ষুদ্র জীবনের ভেতর দাঁড়িয়ে মানুষ কখনও রাজ্য, সম্পদ, জাতি, মতবাদ কিংবা ব্যক্তিগত অহংকারকে মহাবিশ্বের কেন্দ্র বলে মনে করে। অথচ আলোর একটিমাত্র রশ্মি আমাদের যে দূরত্বের কথা শোনায়, সেখানে মানুষের আয়ু প্রায় এক ঝলক উজ্জ্বলতা। আলোর গতি, মিল্কিওয়ে, অ্যান্ড্রোমিডা এবং গ্যালাক্সির বিপুলতার তুলনায় মানুষ অত্যন্ত ক্ষুদ্র। এই উপলব্ধি যদি সত্যিই হৃদয়ে প্রবেশ করে, তাহলে অহংকার, হিংসা, নিষ্ঠুরতা ও পারস্পরিক সংঘাত কমে এসে মানুষের মধ্যে বিনয় ও সহমর্মিতা জন্ম নিতে পারে।
শূন্যস্থানে আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২ লাখ ৯৯ হাজার ৭৯২ কিলোমিটার। সাধারণভাবে যাকে ৩ লাখ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড বলা হয়। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদ অনুযায়ী, ভরযুক্ত কোনো বস্তুকে আলোর গতিতে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব নয়। আলোর গতি মহাবিশ্বের দূরত্ব বোঝার একটি মৌলিক মাপকাঠি। এক বছরে আলো যত দূরত্ব অতিক্রম করে তাকে বলা হয় আলোকবর্ষ। এটি সময়ের একক নয়, দূরত্বের একক। এক আলোকবর্ষ প্রায় ৯.৪৬ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার। 'অ্যান্ড্রোমিডা আমাদের থেকে ২৫ লাখ আলোকবর্ষ দূরে'। আজ অ্যান্ড্রোমিডা থেকে যে আলো আমাদের চোখে পৌঁছাচ্ছে, তা প্রায় ২৫ লাখ বছর আগে সেখানে যাত্রা শুরু করেছিল। আমরা অ্যান্ড্রোমিডাকে বর্তমান অবস্থায় দেখি না; দেখি তার সুদূর অতীতের আলোয়। এ সত্যের মধ্যে এক অপূর্ব দর্শন লুকিয়ে আছে। আকাশের দিকে তাকানো মানে সময়ের দিকে তাকানো। রাতের নক্ষত্ররা যেন মহাবিশ্বের বহু পুরোনো চিঠি। যা আলো হয়ে এসে দৃষ্টিতে পৌঁছায়!
নাসার তথ্য অনুযায়ী, মিল্কিওয়ে একটি সর্পিল গ্যালাঙ্।ি যার নক্ষত্রসমৃদ্ধ ডিস্কের বিস্তার ১ লাখ আলোকবর্ষেরও বেশি। অর্থাৎ আলোর গতিতে চলা কোনো বার্তা মিল্কিওয়ের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে আনুমানিক ১ লাখ বছর সময় নেবে। মানুষের লিখিত ইতিহাস, সভ্যতার উত্থান-পতন কিংবা একটি মানুষের সম্পূর্ণ জীবন এই মহাজাগতিক পরিমাপে প্রায় অদৃশ্য ক্ষুদ্রতা। এটা স্রষ্টার অকল্পনীয় একটি জগৎ।
বিজ্ঞানীদের মতে, মিল্কিওয়েতে নক্ষত্রের সংখ্যা নিয়ে সুনির্দিষ্ট গণনা কঠিন। ধূলি, গ্যাস, দূরত্ব ও অসংখ্য ক্ষীণ নক্ষত্রের কারণে বিজ্ঞানীরা সাধারণত আনুমানিক সংখ্যা ব্যবহার করেন। প্রচলিত হিসাব প্রায় ১০০ বিলিয়ন বা তারও বেশি। কিছু অনুমানে ১০০ থেকে ৪০০ বিলিয়ন পর্যন্ত পরিসর ব্যবহৃত হয়। আমাদের সৌরজগৎ মিল্কিওয়ের কেন্দ্রের কাছে নয়। একটি সর্পিল বাহুতে, কেন্দ্র থেকে প্রায় মাঝামাঝি দূরত্বে অবস্থিত। নাসা জানায়, সূর্যকে মিল্কিওয়ের কেন্দ্রকে একবার প্রদক্ষিণ করতে প্রায় ২৪ কোটি বছর লাগে। পৃথিবীতে মানুষের সভ্যতা যতবার জন্মেছে ও বিলীন হয়েছে, তার তুলনায় সূর্যের একটি গ্যালাক্টিক পরিক্রমা যেন সময়ের মহাসমুদ্রের একটি দীর্ঘ ঢেউ।
তবু মিল্কিওয়ে মহাবিশ্বের বৃহত্তম গ্যালাঙ্ িনয়। নাসার গ্যালাঙ্ িবেসিঙ্ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, বৃহত্তম গ্যালাঙ্গিুলোর কিছু এক মিলিয়ন আলোকবর্ষেরও বেশি বিস্তৃত হতে পারে এবং তাতে ট্রিলিয়ন নক্ষত্র থাকতে পারে। আমাদের গ্যালাক্সি তাই একই সঙ্গে বিপুল এবং তুলনামূলকভাবে সাধারণ। মানুষের অহংকারের জন্য এটি একটি নীরব শিক্ষা।
আড়াই মিলিয়ন বছর দূরে : অ্যান্ড্রোমিডা বা মেসিয়ে ৩১ আমাদের মিল্কিওয়ের নিকটতম বৃহৎ গ্যালাঙ্।ি নাসার হাবল-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ২৫ লাখ আলোকবর্ষ দূরে। অর্থাৎ আলোর গতিতে যাত্রা করলেও সেখানে পৌঁছাতে ২৫ লাখ বছর লাগবে। মানবজীবনের সময়সীমায় যা প্রায় অকল্পনীয়।
২০২৫ সালে নাসায় প্রকাশিত হাবল পর্যবেক্ষণের বিশাল মোজাইকে অ্যান্ড্রোমিডার প্রায় ২০ কোটি নক্ষত্র আলাদা করে শনাক্ত করা হয়েছে। নাসা একই সঙ্গে বলেছে, এই সংখ্যা গ্যালাক্সিটির মোট নক্ষত্রসংখ্যার শুধু একটি অংশ। অ্যান্ড্রোমিডা আমাদের নিকটতম বড় প্রতিবেশী বটে। পৃথিবীর প্রতিবেশী বাড়ি কয়েক মিটার দূরে। তবে অ্যান্ড্রোমিডা ২৫ লাখ আলোকবর্ষ দূরে।
দুই গ্যালাক্সিই মহাকর্ষের প্রভাবে পরস্পরের দিকে এগোচ্ছে। ভবিষ্যতে তাদের মধ্যে বৃহৎ সংঘর্ষ ও মিশ্রণের সম্ভাবনা আছে। গ্যালাক্সিও চিরস্থির নয়। মহাবিশ্বের সবকিছুই পরিবর্তন, আকর্ষণ, সংঘর্ষ ও রূপান্তরের ভেতর দিয়ে চলছে। মহাবিশ্বের যে অংশ থেকে আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে পেরেছে, সেটিই পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্ব। মহাবিশ্বের মোট পরিসর তার চেয়েও বড়। এমনকি অসীমও হতে পারে। আমরা তা নিশ্চিতভাবে জানি না। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনের বলেছেন, খালাকাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ। অর্থাৎ 'তিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন'। আর 'মাল্টিভার্স' বা বহু-মহাবিশ্ব? এটি আধুনিক মহাকাশতত্ত্ব ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে আলোচিত একটি ধারণা। এ ধারণাটি পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের মতো সরাসরি পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠিত সত্য নয়। মাল্টিভার্স একনো সম্ভাব্য তাত্ত্বিক ধারণা। প্রমাণিত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক তথ্য নয়।
মহাজাগতিক ক্ষুদ্রতা : মানুষ যদি বুঝতে পারে সে মহাবিশ্বের তুলনায় কত ক্ষুদ্র, তাহলে তার অহংকার কমবে। ২০১৫ সালে জার্নাল অভ পার্সোন্যালিটি অ্যান্ড সোশ্যাল সাইকোলজিতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় পাঁচটি গবেষণার মাধ্যমে মোট ২,০৭৮ জন অংশগ্রহণকারীর ওপর পরীক্ষা করা হয়। গবেষকরা দেখেন, বিশালতা ও বিস্ময়ের অনুভূতি মানুষের আত্মকেন্দ্রিকতার অনুভূতি কমাতে পারে এবং উদারতা, নৈতিক সিদ্ধান্ত, সহায়তামূলক আচরণ ও সামাজিক দায়িত্ববোধ বাড়াতে পারে। গবেষণাটির ভাষায়, মানুষ যখন নিজেকে বৃহত্তর সামাজিক প্রেক্ষাপটের একটি ক্ষুদ্র অংশ হিসেবে অনুভব করে, তখন অন্যদের প্রতি তার উদ্বেগ বাড়তে পারে। ২০২৪ সালের নেচার রিভিউজ সাইকোলজি -এর একটি পর্যালোচনাতেও দেখা যায়, বিস্ময়ের অনুভূতি আত্মপরিচয় ও সামাজিক আচরণে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
পৃথিবী মহাবিশ্বে ক্ষুদ্র হলেও মানুষের বাসযোগ্য একমাত্র পরিচিত ঘর। মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে দেখলে কোনো সীমান্তরেখা চোখে পড়ে না। দেখা যায় একটি নীল গ্রহ, তার পাতলা বায়ুমণ্ডল, জল ও জীবনের দুর্বল ভঙ্গুরতা। মহাজাগতিক দৃষ্টিভঙ্গি তাই জাতীয়তা, ধর্ম, ভাষা বা শ্রেণির বৈচিত্র্য মুছে দেয় না। বরং এগুলোর ঊর্ধ্বে একটি মৌলিক সত্য স্মরণ করায় আমরা একই ভঙ্গুর গ্রহের বাসিন্দা।
মহাবিশ্ব আমাদের অহংকার ভাঙে : মহাকাশের বিশালতা মানুষকে বিনয়ী করতে পারে, কিন্তু বিনয় মানে নিষ্ক্রিয়তা নয়। বরং মহাবিশ্বের সামনে নিজের সীমা বোঝা মানে জ্ঞানের প্রতি আরও সতর্ক হওয়া। যে মানুষ জানে তার জ্ঞান অসম্পূর্ণ, সে অন্ধ বিশ্বাসের বদলে প্রশ্ন করতে শেখে। যে জানে পৃথিবী ভঙ্গুর, সে যুদ্ধের আগুন জ্বালাতে আগে দুবার ভাবে। যে জানে তার জীবন ক্ষণস্থায়ী, সে অন্যের জীবনে অকারণ যন্ত্রণা দেওয়ার আগে নিজের অন্তরকে প্রশ্ন করে।
বিজ্ঞান আমাদের বলে মানুষ মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়। দর্শন জিজ্ঞেস করে তাহলে মানুষ কীভাবে বাঁচবে? এই দুই প্রশ্নের মিলনেই জন্ম নিতে পারে মহাজাগতিক নৈতিকতা। এমন এক নৈতিকতা, যেখানে ক্ষমতা নয়, সহাবস্থান; দখল নয়, সংরক্ষণ; অহংকার নয়, বিস্ময়; এবং প্রতিহিংসা নয়, পারস্পরিক দায় অগ্রাধিকার পায়।
শেষকথা : একটি মানুষ তার জীবদ্দশায় হয়তো নিজের এলাকার সীমানাও অতিক্রম করতে পারে না। অথচ তার চোখ পৌঁছে যায় ২৫ লাখ আলোকবর্ষ দূরের অ্যান্ড্রোমিডায়। তার মস্তিষ্ক এক লাখ আলোকবর্ষ বিস্তৃত গ্যালাক্সির আকার কল্পনা করতে পারে। মহাবিশ্বে সে শারীরিকভাবে ক্ষুদ্র, কিন্তু জানার ক্ষমতায় বিস্ময়কর। একটি পিঁপড়া মহাবিশ্বের বিস্তার জানে না। মানুষ জানে তার ঘর একটি গ্যালাঙ্রি এক কোণে, একটি নক্ষত্রের চারদিকে ঘূর্ণায়মান ক্ষুদ্র গ্রহ। এ জ্ঞান মানুষকে পরিণত করে। তাই আকাশের দিকে মানুষের বলা উচিত 'আমি ক্ষুদ্র, তাই অহংকারের অধিকারী নই। আমি সীমিত, তাই প্রতিটি জীবনের প্রতি দায়িত্বশীল। আমি ক্ষণস্থায়ী, তাই আমার হাতে থাকা সময়কে ঘৃণায় নষ্ট করব না।' নক্ষত্রেরা আমাদের চেয়ে বড়। কিন্তু তাদের কোনো নৈতিক সিদ্ধান্ত নেই। মানুষই একমাত্র পরিচিত প্রাণী, যে নক্ষত্রের আলো দেখে নিজের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন করতে পারে। সেই প্রশ্নের উত্তরেই হয়তো মহাবিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর মানবিক সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে।
লেখক : সাংবাদিক
