অধিকারেই বাঁচুক পথশিশু
নিয়ামুর রশিদ শিহাব
প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শহরের ব্যস্ত সড়কে যখন মানুষ কর্মব্যস্ততায় ছুটে চলে, তখন ফুটপাতের এক কোণে বসে থাকা একটি শিশুর চোখে হয়তো অন্যরকম এক পৃথিবী ধরা পড়ে। কারও হাতে ফুল, কারও হাতে পানির বোতল, কেউ গাড়ির কাচ পরিষ্কার করছে, কেউ পত্রিকা বিক্রি করছে, আবার কেউ মানুষের কাছে হাত পাতছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শহরের অলিগলি, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট কিংবা বাজারে এমন অসংখ্য শিশুর দেখা মেলে। তাদের অনেকের নেই নিরাপদ আশ্রয়, নিয়মিত খাবার, চিকিৎসা কিংবা বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ। জীবিকার তাগিদে পথে নামাই যেন তাদের বাস্তবতা। একটি শিশুর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো শৈশব। এ সময় তার বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা, খেলাধুলা করার কথা, পরিবারের ভালোবাসা পাওয়ার কথা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার কথা। অথচ বাস্তবে দেশের বিভিন্ন শহরে এমন অনেক শিশু রয়েছে, যাদের প্রতিদিন শুরু হয় জীবিকার সন্ধানে। কেউ শ্রম বিক্রি করে, কেউ ভিক্ষা করে, কেউ ছোটখাটো পণ্য বিক্রি করে। দিনের শেষে তারা সামান্য কিছু টাকা নিয়ে ঘরে ফেরে, আবার অনেকের রাত কাটে ফুটপাতেই। এ দৃশ্য শুধু মানবিক বেদনার নয়; এটি আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সামনেও বড় প্রশ্ন তুলে ধরে।
পথশিশু হওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। দারিদ্র্য এর অন্যতম প্রধান কারণ হলেও এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পারিবারিক ভাঙন, কর্মসংস্থানের অভাব, গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙন, পারিবারিক সহিংসতা, অভিভাবকের মৃত্যু কিংবা বিচ্ছিন্নতা এবং সামাজিক নিরাপত্তার ঘাটতি। উপকূলীয় ও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকার অনেক পরিবার জীবিকার সন্ধানে শহরমুখী হয়। কিন্তু শহরে এসে নিরাপদ আবাসন ও স্থায়ী কর্মসংস্থান না পাওয়ায় অনেক পরিবার অনিশ্চিত জীবনে পড়ে। সেই অনিশ্চয়তার সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করতে হয় শিশুদের। পরিবার যখন আয়-রোজগারের সংকটে পড়ে, তখন শিশুর শিক্ষা অনেক সময় পিছিয়ে যায়। খাবার জোগাড় করাই যেখানে কঠিন, সেখানে বই-খাতা, পোশাক ও অন্যান্য শিক্ষাসামগ্রীর ব্যয় পরিবারের কাছে বাড়তি চাপ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে শিশুকে বিদ্যালয়ের পরিবর্তে কাজে পাঠানো হয়। প্রথমে হয়তো কয়েক ঘণ্টা কাজ, পরে সেটিই হয়ে ওঠে তার নিয়মিত জীবন। এভাবেই একটি শিশু ধীরে ধীরে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে দূরে সরে যায়। শিশুশ্রম শুধু একটি শিশুকে বিদ্যালয় থেকে দূরে সরিয়ে দেয় না; তার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকেও সংকুচিত করে। অল্প বয়সে দীর্ঘ সময় কাজ করার ফলে শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কর্মক্ষেত্রে শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, দীর্ঘদিন শিক্ষার বাইরে থাকা শিশুকে আবার বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রেই তারা আর শিক্ষাব্যবস্থায় ফিরতে পারে না। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুদের জীবন আরও অনিরাপদ। রাস্তায় বসবাস কিংবা দিনের বড় অংশ রাস্তায় কাটানোর কারণে তারা নানা ধরনের শোষণ ও নির্যাতনের ঝুঁকিতে থাকে। অসাধু ব্যক্তি বা অপরাধী চক্র তাদের দুর্বলতার সুযোগ নেয়। কেউ তাদের দিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করায়, কেউ কম মজুরিতে কাজে নিয়োগ দেয়। ফলে একটি শিশুর অসহায়ত্ব কখনও কখনও অন্যের স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
পথশিশুদের জন্য সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ রয়েছে। সামাজিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ও এনজিওগুলো শিক্ষা, খাবার, পোশাক, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে কাজ করছে। কোথাও অস্থায়ী বিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে, কোথাও দেওয়া হচ্ছে কারিগরি প্রশিক্ষণ। এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও দেশের বাস্তবতার তুলনায় এর পরিসর আরও বাড়ানো প্রয়োজন। প্রথমেই দরকার পথশিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার। কোন এলাকায় কত শিশু রয়েছে, তাদের বয়স কত, পরিবার কোথায়, তারা কী কাজ করে এবং কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন এসব তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। সঠিক তথ্য ছাড়া কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ কঠিন। শিক্ষার ক্ষেত্রেও বিশেষ ব্যবস্থা প্রয়োজন। যারা দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে, তাদের জন্য নমনীয় সময়সূচির শিক্ষা, দ্রুত শেখার সুযোগ এবং পর্যায়ক্রমে মূলধারার শিক্ষায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পথশিশুদের সমস্যার সঙ্গে আবাসনের বিষয়টিও গভীরভাবে জড়িত। একটি পরিবার যদি নিরাপদে থাকার জায়গা না পায়, তাহলে শিশুর নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়া কঠিন। তাই পরিবারভিত্তিক পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়াতে হবে। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুদের জন্য নিরাপদ ও শিশুবান্ধব আশ্রয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টিও অবহেলা করা যাবে না। রাস্তায় থাকা শিশুদের অনেকেই অপুষ্টি, বিভিন্ন রোগ ও শারীরিক ঝুঁকির মধ্যে থাকে। তাদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পুষ্টিকর খাবার ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা দরকার। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। আমরা অনেক সময় পথশিশুকে শুধু ভিক্ষুক বা শ্রমিক হিসেবে দেখি। অথচ তারাও আমাদের সমাজেরই শিশু। তাদেরও স্বপ্ন আছে, মেধা আছে, সম্ভাবনা আছে। সুযোগ পেলে তারাও শিক্ষিত হতে পারে, দক্ষ কর্মী হতে পারে এবং দেশের অর্থনীতি ও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। একটি শিশুর বর্তমান অবস্থান দিয়ে তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যায় না। আমাদের মনে রাখতে হবে, পথশিশুদের জন্য কাজ করা শুধু দয়া দেখানোর বিষয় নয়; এটি তাদের অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়। শিশুর নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তাই সাময়িক সহানুভূতির পরিবর্তে প্রয়োজন অধিকারভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। প্রতিবছর শিশুদের নিয়ে নানা দিবসে সভা-সেমিনার হয়, মানববন্ধন হয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর বাস্তব পরিবর্তন কতটা হয়, সেই প্রশ্নও আমাদের করতে হবে। পথশিশুদের সমস্যা সমাধানে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, বেসরকারি সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষ সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শুধু প্রকল্প গ্রহণ নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও নিয়মিত তদারকি।
শিশুর শৈশব কোনো দান নয়; এটি তার অধিকার। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু পথশিশুকে পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া নয়; এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো শিশুকে জীবিকার জন্য পথে নামতে না হয়। শিশুর হাতে ভিক্ষার বাটি নয়, বই তুলে দিতে হবে; ফুটপাত নয়, দিতে হবে নিরাপদ ঠিকানা; অনিশ্চয়তা নয়, দিতে হবে স্বপ্ন দেখার সুযোগ। কারণ আজকের এই শিশুরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ। তাদের শৈশব রক্ষা করা মানে শুধু একটি প্রজন্মকে রক্ষা করা নয়, রক্ষা করা দেশের ভবিষ্যৎকেও।
লেখক : শিক্ষার্থী, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, গ্লোবাল ইউনিভাসির্টি বাংলাদেশ
