বন্ধ পাটকল চালু হোক, ফিরুক কর্মসংস্থানের গতি

প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পাটশিল্পের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। অথচ লোকসান, ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা ও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর বড় একটি অংশ বছরের পর বছর বন্ধ পড়ে ছিল। ২০২০ সালে বিজেএমসির আওতাধীন ২৫টি পাটকলের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হারানোর পাশাপাশি বিপুল রাষ্ট্রীয় সম্পদও কার্যত অব্যবহৃত হয়ে পড়ে। এখন এসব পাটকল পর্যায়ক্রমে চালুর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা শিল্প ও কর্মসংস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ।

বিজেএমসির ২৫টি পাটকলের মধ্যে ২০টি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় লিজ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ১৭টির লিজ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং নয়টি মিলে উৎপাদন শুরু হয়েছে। এসব মিলে প্রায় ৯ হাজার ৫০০ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, পুরো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। সম্প্রতি তিনটি বন্ধ পাটকল পুনরায় চালুর জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিও হয়েছে। জাতীয় জুট মিলস, স্টার জুট মিলস ও প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিলসে প্রায় ৬১৯ কোটি টাকা বিনিয়োগের কথা রয়েছে। মিল তিনটি চালু হলে ১১ হাজার ৬২৯ জনের কর্মসংস্থান এবং বছরে প্রায় ১ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা মোট আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে শুধু লিজ দিলেই পাটশিল্পের পুনর্জাগরণ ঘটবে না। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে লিজের শর্ত বাস্তবায়ন, বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি রক্ষা, নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন শুরু এবং শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এরইমধ্যে সরকার জানিয়েছে, নির্ধারিত শর্ত ও সময়সীমা অনুযায়ী উৎপাদন শুরু করতে ব্যর্থ হলে লিজ নেওয়া মিল পুনরায় সরকারের কাছে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। এ নজরদারি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি।

একই সঙ্গে পাটশিল্পকে শুধু দেশীয় বাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। পাটজাত বহুমুখী পণ্য উৎপাদন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ শ্রমিক তৈরি এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কাঁচা পাটের পরিবর্তে মূল্য সংযোজিত পাটপণ্য রপ্তানি বাড়ানো গেলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি শিল্পের ভিতও শক্ত হবে।

বন্ধ পাটকলের জমি, অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি রাষ্ট্রের সম্পদ। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত রেখে এসব সম্পদ নষ্ট করার চেয়ে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় দক্ষ উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে। তবে এর সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি হবে কতগুলো মিলের চুক্তি হয়েছে তা নয়; বরং কতগুলো মিল টেকসইভাবে উৎপাদনে ফিরেছে, কত মানুষের স্থায়ী কর্মসংস্থান হয়েছে এবং কতটা রপ্তানি ও মূল্য সংযোজন ঘটেছে।

পাটকল চালুর এ উদ্যোগ তাই শুধু শিল্প পুনরুজ্জীবনের কর্মসূচি নয়— এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পাটশিল্পকে নতুন বাস্তবতায় দাঁড় করানোর একটি সুযোগ।