প্রবীণ নাগরিকদের নিয়ে ভাবনা
হরেন্দ্র কুমার নাথ
প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ষাট বছর বা তার বেশি বয়সীরাই প্রবীণ। প্রবীণ মানে দক্ষ, সুনিপুন, অভিজ্ঞ, অবসরকারী জনগণ। তারা চোখে কম দেখতে পান,কানে কম শোনে, তাদের স্মৃতিশক্তি দিন দিন কমে যায়। তাদের সহনশীলতা ও ধৈর্য কমে যায়। প্রস্রাবের যন্ত্রণা, ফুসফুস ও হার্টের সমস্যা, বদহজম, বুকজ্বালা করা, পায়ে ও হাঁটুতে ব্যথা, ডায়াবেটিস,উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি নানা প্রকার রোগবালাই তাদের শরীরে বাসা বাঁধে। তাদের শারীরিক ও মানসিক দুর্বলতার কারণে তারা ক্রমশই আবেগপ্রবণ, খিটখিটে ও সন্দেহপ্রবণ হয়ে উঠেন। তাদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থ জীবনের জন্য সবার আগে তাদের চাহিদাগুলোতে মনোযোগ দিতে হবে। তাদের চাহিদাগুলো মূলত শারীরিক পরিবর্তন, আর্থ-সামাজিক অবস্থা এবং পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
শারীরিক ও স্বাস্থ্যগত চাহিদা : বাত-ব্যথা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডিমেনশিয়া ইত্যাদি বার্ধক্যজনিত দীর্ঘমেয়াদি রোগের সহজ ভাবে চিকিৎসা পাওয়ার ব্যবস্থা সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রবীণদের জন্য আলাদা ইউনিট, বিনামূল্যে ওষুধ ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেবার সুবিধা।
রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা : বয়স্ক ভাতা, সর্বজনীন পেনশন যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার বৃদ্ধি পাওয়ায় গৃহহীন বা অবহেলিত প্রবীণদের জন্য প্রবীণ নিবাস তৈরি করা।
মানসিক ও সামাজিক চাহিদা : একাকিত্ব ও বিষণ্ণতা দূর করতে সমবয়সীদের সাহচর্য, গল্প করার সুযোগ এবং ডে-কেয়ার-বিনোদনকেন্দ্র পরিবার ও সামাজিক সিদ্ধান্তে তাদের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে মূল্যায়ন সরকারিভাবে মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা ও একাকিত্ব কাটাতে কাউন্সিলিং- বেড়াতে যাওয়া। ধর্মকর্ম করার সুযোগ পাওয়া বিভিন্ন প্রকার খেলাধুলা ও গল্প করার পরিবেশ পাওয়া।
অবকাঠামো ও পরিবেশগত চাহিদা : গণপরিবহন, স্টেশন, এয়ারপোর্ট ও হাঁটার রাস্তায় প্রবীণবান্ধব অবকাঠামো— যেমন : রেম্প, লিফট, আলাদা আসন এবং অগ্রাধিকার সুবিধা। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও ব্যাংকিং ব্যবহারে প্রবীণদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান।
আইনি ও অধিকারগত চাহিদা : পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন ২০১৩ এর কার্যকর প্রয়োগ। সন্তানের কাছ থেকে আইনগত সুরক্ষা ও জীবনের মৌলিক চাহিদা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা নিশ্চিতকরণ।
জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা বাস্তবায়ন : প্রবীণদের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের গৃহীত নীতিগুলোর দ্রুত ও যথাযথ বাস্তবায়ন। প্রবীণ নিজে মানতে চায়না তার শারীরিক বয়স হয়েছে। তারা সাধারণত বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কানে কম শুনতে পান, খাদ্য গ্রহণে রুচি হারান, খিটখিটে হয়ে যান, অনেক বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেন। মেজাজ ধরে রাখার ক্ষমতা হারাতে থাকেন। ছোটখাটো কালক্ষেপণে তাদের মনে হতে পারে তাদের অবহেলা করা হচ্ছে। অবহেলা বা দেরী করলে প্রবীণরা তাই বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসা ও ওষুধপত্র ব্যবহারে যথেষ্ট সতর্কতার আশ্রয় নিতে হবে। প্রবীণ ব্যক্তিকে স্বাস্থ্যকর পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। প্রবীণ বয়সে পুরুষ ৬০০ ক্যালোরি এবং নারী ৩০০ ক্যালোরি খাবার কম গ্রহণ করবেন। শরীরের যত কেজি ওজন তত গ্রাম প্রোটিন গ্রহণ করতে হবে।
যে সব প্রবীণ চলাফেরা করতে পারে না অনেক সময় তাদের সেবাযত্ন ঠিকমত হয় না। কাপড়চোপড় বিছানাপত্র পরিষ্কর থাকে না।অনেক সময় দুর্গন্ধ মারাত্মক আকারধারণ করে। তাদের ঘ্রাণশক্তি কমে যায় বলে দুর্গন্ধ বুঝতে পারে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, আমরা প্রবীণকে সব চাইতে নিম্নমানের জায়গায় থাকতে দিই। যে রুমে আলো বাতাস কম, স্যাঁতস্যাঁতে, পুরোনো, নড়বড়ে, মাকড়শা ও মশামাছিতে ভরপুর।অনেক প্রবীণের জায়গা হয় বারান্দায়।
যেখানে রোদবৃষ্টি বাতাসের কোনো বাধা থাকে না। তারা সেখানে রোদে পোড়েন, বৃষ্টিতে কষ্ট পান।অথচ আমরা সবাই জানি প্রবীণরা শীত গরম কোনোটাই সহ্য করতে পারে না।
প্রবীণ বয়সে মানুষের আয় কমে যায়। অনেকেই কোনো আয় করতে পারে না। ছেলে-মেয়েদের উপর নির্ভরশীল থাকতে হয়।ফলে তার ভেতরে নানা প্রকার মানসিক চাপ, চাহিদা মেটাতে না পারা, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া, পরিবারে খবরদারি করতে না পারার মতো মনোযাতনা তৈরি হয়। তারা অনেক কিছু ভুলে যাই। নিকটতম ঘটনা মনে রাখতে পারে না। স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষমতা প্রায় ৪০ ভাগ হ্রাস পায়। নিজের উপর অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না। আবার কেউ কেউ খুবই অভিমানী হয়ে উঠেন। প্রবীণ নারী অনেকটা কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠেন। এরকম সংকটকালে প্রবীণ অনেক সময়ই কাঙ্ক্ষিত আচরণ করতে পারেন না। তাই বলে প্রবীণ বা বয়স্ক নাগরিকরা শুধু বয়সের ভারে অচল নন, বরং তারা জ্ঞান, মেধা ও বহু বছরের অভিজ্ঞতার এক অদৃশ্য ভাণ্ডার। তাদের যথাযথ সুযোগ দেওয়া হলে তারা পরিবারের ওপর বোঝা না হয়ে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
পরামর্শক বা কনসালটেন্ট হিসেবে সরকারি-বেসরকারি খাত : ব্যাংক বা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান থেকে অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী পার্ট-টাইম কনসালটেন্ট বা অ্যাডভাইজার হিসাবে দিকনির্দেশনা দিতে পারেন। বিনামূল্যে বা খণ্ডকালীন শিক্ষাদান অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বা শিক্ষিত প্রবীণরা পিছিয়ে পড়া শিশু, পথশিশুদের কিংবা বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষাদান করতে পারেন।
সালিশি ব্যবস্থা ও বিরোধ নিষ্পত্তি : গ্রাম বা স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক কোন্দল, পারিবারিক দ্বন্দ্ব বা জমিজমা সংক্রান্ত ছোটখাটো বিরোধ নিষ্পত্তিতে প্রবীণদের সালিশকারী বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজে লাগানো যায়। তাদের বিচারবুদ্ধি ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা আইনি চাপ কমাতে সাহায্য করে।
সামাজিক সচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলন : মাদকবিরোধী অভিযান, বাল্যবিবাহ রোধ, যৌতুক প্রথা দূরীকরণ এবং পরিবেশ রক্ষায় সামাজিক সচেতনতামূলক প্রচারণায় প্রবীণরা প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করতে পারেন। তরুণ সমাজ তাদের কথা শ্রদ্ধার সাথে মেনে নেয়। যৌথ পরিবারে শিশুদের সঙ্গদান ও নৈতিক শিক্ষা : কর্মজীবী পিতা-মাতার সন্তানদের গল্প শোনানো, তাদের সঠিক নৈতিক শিক্ষা দেওয়া ও পারিবারিক ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ শেখানোর কাজে প্রবীণরা সেরা মাধ্যম হতে পারেন। এতে প্রবীণদের একাকিত্ব দূর হয় এবং নতুন প্রজন্ম সঠিক মূল্যবোধ শিখতে পারে। শিল্প, উদ্ভাবন, হস্তশিল্প কৃষি ও কুটির শিল্প : গবেষণা, শিল্পকারখানা, উদ্ভাবনী কাজে প্রবীণরা তাদের জীবনের ফেলে আসা কর্মক্ষেত্রে পরামর্শক হিসেবে কাজ করতে পারেন। প্রবীণ কৃষকদের দীর্ঘ বছরের অভিজ্ঞতা আধুনিক কৃষিতে নতুনদের সহায়তার কাজে আসে। প্রবীণ নারীদের ঐতিহ্যবাহী কাজ : যেমন : নকশী কাঁথা সেলাই, হস্তশিল্প, পিঠা তৈরি বা প্রক্রিয়াজাত খাদ্য প্রস্তুত। সামাজিক ব্যবসা বা কুটির শিল্পের মাধ্যমে আয়ের উৎস হিসেবে গড়ে তোলা যায়।
স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম ও এনজিও : বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, রেড ক্রিসেন্ট, লাইব্রেরি, মসজিদ-উপাসনালয় বা ট্রাষ্ট পরিচালনা এবং দাতব্য কাজের তদারকিতে তাদের দক্ষতা কাজে লাগানো সম্ভব।
মেন্টরশিপ ও তরুণ উদ্যোক্তা উন্নয়ন : নতুন উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক দিকনির্দেশনা প্রদান, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শেখানো এবং পেশাগত জীবনের নেটওয়ার্ক তৈরিতে প্রবীণরা মেন্টর বা অভিভাবক হিসেবে কাজ করতে পারেন। গবেষণা ও জাতীয় নীতি নির্ধারণ : জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন নীতি নির্ধারণী কমিটি, জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসনে প্রবীণ সদস্য হিসেবে পরামর্শক হিসেবে, জাতীয় আর্কাইভ তৈরি, ইতিহাসের নথিপত্র সংরক্ষণ এবং বিভিন্ন গবেষণাকাজে তাদের দীর্ঘ জীবনভিত্তিক অভিজ্ঞতা তথ্যসূত্র হিসেবে অবদান রাখতে পারে।
প্রবীণদের মেধা, জ্ঞান, সততা এবং অভিজ্ঞতার আলোকের উপর ভিত্তি করে আগামী প্রজন্মের তারুণ্যের যে কোন কাজে সহযোগিতা করা। প্রবীণ ব্যক্তিরা তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে পরবর্তী প্রজন্মকে অগ্রসর ও নির্ভুল তথ্য দিয়ে যোগ্য করে তুলতে পারেন।
পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রবীণরাই পরামর্শকের নেতৃত্ব দিতে পারে। সরকারি— রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে অথবা বেসরকারি সংস্থার ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের প্রায় ২ কোটি। এই সংখ্যা দিন দিন জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রবীণকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে দুর্দান্ত অগ্রগতি অর্জন করতে পারে।
তাই প্রবীণদের গুরুত্ব দিন। তাদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। প্রবীণদের সম্মান ও গুরুত্ব দিন। আপনার পরিবার ঝলমল করবে। দেশ এগিয়ে যাবে। প্রবীণের বুড়ো হাড়ের ঝলক কাজে লাগান। প্রবীণদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আগামী প্রজন্মের জন্য উন্নয়নের মহীসোপান তৈরি করুন।
লেখক : জীবন সদস্য
বাংলাদেশ সিনিয়ার সিটিজেন ফোরাম ঢাকা ও প্রাক্তন প্রধান বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী বাংলাদেশে রেলওয়ে
