পাহাড়, নদী ও মানুষের সহাবস্থান
মমতাজ উদ্দিন আহমদ
প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশকে আমরা প্রায়ই নদীর দেশ, পলিমাটির দেশ, ধানের সবুজ ঢেউয়ের দেশ বলেই জানি। কিন্তু এ সমতল ভূখণ্ডের বুকেই দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে আছে এক অন্যতর বাংলাদেশ। যেখানে মাটি হঠাৎ ঢেউ খেলানো হয়ে ওঠে। পথ উঠে যায় মেঘের দিকে! নদী পাথরের বুক চিরে গোপন সুরে বয়ে চলে। যে ভূখণ্ডের নীরবতা কখনও কখনও শব্দের চেয়েও গভীর ভাষা হয়ে ওঠে। সেই বাংলাদেশের নাম বান্দরবান।
আলোর ভেতরেও এ পার্বত্য ভূখণ্ডের কিছু অঞ্চল ছায়াময়। যার বহু উপত্যকা অন্তর্বিহীন মৌননিস্তব্ধতায় ডুবে থাকে। বান্দরবান যেন প্রকৃতির নিজের হাতে লেখা এক দীর্ঘ পত্র। পাহাড়ের গায়ে গায়ে সবুজ, তার ভেতর মেঘের চলাচল, দূরে বাঁক নেওয়া রাস্তা, নিচে নদীর স্রোত সব মিলিয়ে মনে হয়, পৃথিবী এখানে একটু ধীরে শ্বাস নেয়।
বান্দরবানের নীলাচল, নীলগিরি, চিম্বুক, বগালেক, ডিম পাহাড়, দামতুয়া ঝরনা, দেবতাখুম, অমিয়াখুম, নাফাখুম, বড় পাথর, রূপমুহুরী ঝরনা কিংবা ঐতিহাসিক আলীর সুড়ঙ্গ! কী নেই এই বান্দরবানে। পাহাড়ি নদী কিংবা উপজাতীয় পল্লি এসব নাম একেকটি দরজা মাত্র। আসল বান্দরবান শুরু হয় তখন, যখন পর্যটক ক্যামেরা নামিয়ে চারপাশের শব্দ শুনতে শেখে।
সকালে পাহাড়ের গায়ে আলো এসে পড়ে। কুয়াশা তখনও উপত্যকার গায়ে শুয়ে থাকে। কোনো অচেনা পাখি অল্পস্বরে ডেকে ওঠে। বাঁশবনের ভেতর দিয়ে বাতাস যায়, যেন কেউ অদৃশ্য আঙুলে সবুজ পাতার তার বাজাচ্ছে। দূরের কোনো পাড়ায় রান্নার ধোঁয়া উঠছে, পাহাড়ি পথ ধরে মানুষ হাঁটছে, আর সাঙ্গু-মাতামুহুরীর শীতল স্রোত নিজের ছন্দে নীরবে বয়ে চলেছে। শহরের মানুষ যে নীরবতাকে নিস্তব্ধতা বলে মনে করে, বান্দরবানের নীরবতা তার চেয়ে বেশি। এটি এক বহুস্বরের সংযম।
সমতলে আমরা দিগন্তকে চোখের সামনে মেলে ধরি। পাহাড়ে দিগন্ত ভাঁজ হয়ে ভাঁজ হয়ে আসে। তাই পাহাড়ের কাছে গিয়ে মানুষ নিজের ভেতরের অস্থিরতাকেও নতুন করে দেখতে পায়। সে বুঝতে শেখে সব পথ সোজা নয়, সব উচ্চতায় পৌঁছাতে দ্রুততা লাগে না, সব সৌন্দর্যকে শব্দে ব্যাখ্যা করা যায় না। বান্দরবানের পাহাড়ি ভূদৃশ্যকে বুঝতে নদীগুলোকে আলাদা করে দেখা যায় না। নদী এখানে পাহাড়, জনপদ, কৃষি, জীবিকা, লোকস্মৃতি ও যাতায়াতের সঙ্গে জড়িত এক জীবন্ত ব্যবস্থা।
পাথরের গায়ে ধাক্কা খেয়ে সাঙ্গুর পানি কখনো স্বচ্ছ, কখনো বর্ষার মাটিতে ঘোলা। নদীর বাঁকে বাঁকে পাহাড়ের ছায়া পড়ে। দুপুরের সূর্য সেখানে এসে ভেঙে যায় অসংখ্য রুপালি টুকরোয়। মাতামুহুরীর তীরেও একইভাবে দেখা যায় পাহাড়ি জীবনের জটিল সহাবস্থান জল, বন, পাথর, কৃষিজমি ও মানুষের বসতি।
নদী স্থানীয় মানুষের পানির উৎস, জীবিকার অংশ, কৃষি ও পরিবেশের অবলম্বন। প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট, সাবান বা রাসায়নিক নদীতে ফেলে দেওয়া মানে একটি ছবির সৌন্দর্য নষ্ট করা নয়; একটি জীবন্ত জলব্যবস্থার ওপর আঘাত করা। নদীর সঙ্গে পর্যটনের সম্পর্ক তাই ভোগের নয়, শ্রদ্ধার হওয়া উচিত। নদীর তীরে বসে তার শব্দ শুনতে হয়; কিন্তু নদীর শরীরে নিজের আবর্জনা রেখে আসা যায় না।
বান্দরবানের ঝরনাগুলো পাহাড়ের সঞ্চিত জীবনীশক্তির মুক্তি। বৃক্ষ, মেঘ, বৃষ্টি, মাটি ও পাথরের দীর্ঘ সম্পর্কের ফল হয়ে জল নেমে আসে নিচে। বর্ষায় ঝরনার স্রোত পূর্ণতা পায়, শুকনো মৌসুমে তার শরীর সরু হয়। এ ওঠানামাই তার স্বাভাবিক জীবন। পর্যটন যদি এই স্বাভাবিকতাকে নষ্ট করে, তাহলে কোনো ঝরনার ছবি হয়তো থাকবে; কিন্তু ঝরনার আত্মা থাকবে না। পাথর ভাঙা, অনিয়ন্ত্রিত স্থাপনা, পাহাড় কাটা, বর্জ্য ফেলা, নদীর তীরে বিষাক্ত তামাক চাষ ও অতিরিক্ত পর্যটক চাপ এসব পাহাড়ি নদী ও খালগুলোকে ক্রমশ বিপন্ন করে চলেছে।
বান্দরবানের সৌন্দর্য মানুষের বহুবর্ণ জীবনেও। বাঙ্গালী, বম, ম্রো, মারমা, ত্রিপুরা, চাক, খুমি, তঞ্চঙ্গ্যা, চাকমা ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ভাষা, পোশাক, খাদ্য, ঘরবাড়ি, কৃষিচর্চা ও উৎসব এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে সমৃদ্ধ করেছে। সত্যিকারের পর্যটন তখনই সফল, যখন অতিথি ফিরে যাওয়ার পরে পাহাড়ে শুধু স্মৃতি রেখে যায় আর স্থানীয় মানুষের জীবনে কিছু আয়, সম্মান ও সুযোগ রেখে যায়।
প্রকৃতি ও দৃশ্যভিত্তিক পর্যটন : মেঘ, পাহাড়, সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত, নদী ও ঝরনার দৃশ্য বান্দরবানের সবচেয়ে পরিচিত সম্পদ। তবে ভিউপয়েন্টে ভিড় বাড়িয়ে নয়, নির্দিষ্ট বহনক্ষমতা ঠিক করে এ পর্যটন গড়ে তুলতে হবে।
ট্রেকিং ও দায়িত্বশীল অ্যাডভেঞ্চার : পাহাড়ি পথ, ঝিরি, বন ও দূরবর্তী জলপ্রপাত তরুণ পর্যটকদের আকর্ষণ করে। প্রশিক্ষিত স্থানীয় গাইড, আবহাওয়াভিত্তিক রুট নির্বাচন, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা এবং দলগত নিরাপত্তা ছাড়া ট্রেকিংকে উৎসাহ দেওয়া উচিত নয়। পাহাড়ে সাহস মানে ঝুঁকি অস্বীকার করা নয়; ঝুঁকিকে বুঝে চলা।
কমিউনিটি-ভিত্তিক পর্যটন : স্থানীয় পরিবার পরিচালিত হোমস্টে, গ্রামভিত্তিক খাদ্য, কৃষি-অভিজ্ঞতা, তাঁত ও হস্তশিল্প, স্থানীয় গল্প ও ঐতিহ্য এসব পর্যটনকে কেবল ভ্রমণ নয়, পারস্পরিক শিক্ষায় পরিণত করতে পারে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর বদলে স্থানীয় পরিবার সরাসরি লাভবান হবে।
নদী ও জলভিত্তিক পর্যটন : সাঙ্গু ও অন্যান্য জলধারাকে কেন্দ্র করে নৌভ্রমণ বা নদীতীরভিত্তিক অভিজ্ঞতা তৈরি করা সম্ভব। তবে নিরাপত্তা, মৌসুমি প্রবাহ, লাইফ জ্যাকেট, নৌযানের মান এবং নদীর পরিবেশগত সীমা বাধ্যতামূলকভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
গবেষণা ও শিক্ষাভিত্তিক পর্যটন : বান্দরবান জীববৈচিত্র্য, পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, জলপ্রবাহ, স্থানীয় কৃষি ও সংস্কৃতি নিয়ে মাঠপর্যায়ের শিক্ষা ও গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়, পরিবেশবিদ, নৃতত্ত্ববিদ ও শিক্ষার্থীদের জন্য অনুমতিনির্ভর গবেষণা-ভ্রমণ গড়ে তোলা যায়। পর্যটন বাড়বে, কিন্তু পাহাড় যেন হারিয়ে না যায় : পর্যটনের সাফল্য সাধারণত পর্যটকের সংখ্যা দিয়ে মাপা হয়।
কিন্তু পাহাড়ের ক্ষেত্রে এটি বিপজ্জনক মাপকাঠি। কোনো স্থানে এক দিনে দশ হাজার মানুষ গেলে যদি বন, নদী, পথ, স্থানীয় সংস্কৃতি ও বর্জ্যব্যবস্থা তা বহন করতে না পারে, তাহলে পর্যটন উন্নয়ন নয় পরিবেশগত ঋণ তৈরি করে। বান্দরবানের জন্য তাই প্রয়োজন পর্যটন পরিকল্পনা। কোনো ঝরনা বা পাহাড়ি পথে প্রতিদিন কতজন পর্যটক প্রবেশ করতে পারবে, কোথায় রাত্রিযাপন নিষিদ্ধ হবে, কোথায় প্লাস্টিক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, কোথায় স্থানীয় গাইড বাধ্যতামূলক এসব নির্ধারণ করা দরকার। বর্ষাকালে পাহাড়ি পথে ভূমিধস, আকস্মিক স্রোত ও যোগাযোগঝুঁকি বাড়তে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারী বৃষ্টির সময় বান্দরবানের পর্যটনকেন্দ্রগুলো সাময়িক বন্ধ রাখার খবর প্রকাশিত হয়েছে। এটি পর্যটনবিরোধী সিদ্ধান্ত নয়; জীবন ও পরিবেশ রক্ষার দায়িত্বশীল ব্যবস্থা। তাই ভ্রমণের আগে জেলা প্রশাসন, পর্যটন কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় নিরাপত্তা নির্দেশনা যাচাই করা জরুরি।
পর্যটনের নামে পাহাড় কেটে রিসোর্ট বানানো, নদীর তীরে অপরিকল্পিত কংক্রিট, পাহাড়ের ঢালে বর্জ্যস্তূপ, অতিরিক্ত শব্দ ও যানবাহনের চাপ এসব বান্দরবানের নীরব সৌন্দর্যের বিপরীত। উন্নয়ন হতে হবে এমন, যা পাহাড়কে ঢেকে দেয় না; পাহাড়কে দৃশ্যমান রাখে।
বান্দরবানের অর্থনীতি পর্যটন থেকে লাভবান হতে পারে এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই লাভ যদি কেবল বড় শহরের মালিকানাধীন রিসোর্ট, বাইরের পরিবহন ও মধ্যস্বত্বভোগীর হাতে জমা হয়, তাহলে পাহাড়ের মানুষের জীবন বদলাবে না। পর্যটনের প্রকৃত সাফল্য হবে তখন, যখন স্থানীয় তরুণেরা দক্ষ গাইড, পরিবেশরক্ষক, উদ্যোক্তা, রাঁধুনি, কারুশিল্পী, সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যাকারী ও ডিজিটাল প্রচারক হিসেবে কাজের সুযোগ পাবে। স্থানীয় নারীদের হস্তশিল্প, খাদ্য, কৃষিপণ্য ও হোমস্টে-ভিত্তিক উদ্যোগকে নিরাপদ ঋণ, প্রশিক্ষণ ও বাজারসংযোগ দিতে হবে। পাহাড়ি অঞ্চলের শিশুরা যেন পর্যটনের দর্শক নয়, ভবিষ্যতের দক্ষ অংশীদার হয় তার জন্য ভাষা, প্রযুক্তি, পরিবেশ ও আতিথেয়তা বিষয়ে শিক্ষা প্রয়োজন। পর্যটন তখনই সবুজ, যখন সবুজের লাভও স্থানীয় মানুষের জীবনে পৌঁছে যায়। গাছ বাঁচবে, নদী বাঁচবে, সংস্কৃতি বাঁচবে আর মানুষও উন্নত জীবনের সুযোগ পাবে।
বান্দরবানকে দেখতে হলে প্রথমে নিজেকে একটু নীরব করতে হয় : শহরের মানুষ বান্দরবানে যায় নিজের ভেতরের শব্দ থেকে পালাতে। কিন্তু সেখানে গিয়েও যদি সে মাইকের মতো কথা বলে, গাড়ির হর্ন বাজায়, ময়লা ফেলে, পাহাড়কে জয় করার ছবি তোলে এবং স্থানীয় মানুষকে কেবল পটভূমি ভাব্তেতাহলে সে বান্দরবান দেখেনি; সে নিজের শহরকেই পাহাড়ের মধ্যে নিয়ে গেছে।
বান্দরবানকে দেখতে হলে নিজের ভেতরে একটু জায়গা খালি করতে হয়। পাহাড়ের কাছে গিয়ে অহংকার নামাতে হয়। নদীর পাশে বসে বুঝতে হয়, আমাদের দ্রুততা প্রকৃতির কাছে কোনো ক্ষমতা নয়। ঝরনার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়, পতনও কখনো সুর তৈরি করতে পারে। বাঁকানো পাহাড়ি রাস্তা শেখায় সোজা পথে না গেলেও গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। এই কারণেই বান্দরবান শুধু ভ্রমণ নয়; এটি এক অন্তর্জাগতিক অভিজ্ঞতা। এখানে গিয়ে মানুষ নিজের মনের ভিড়ের মধ্যে একটি নির্জন জানালা খুঁজে পায়।
পাহাড়ের কাছে আমাদের অঙ্গীকার : পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে আমরা যদি নিচের নদীকে কেবল দৃশ্য ভাবি, তবে আমাদের দৃষ্টি অসম্পূর্ণ। নদী যেমন পাহাড়কে বাঁচায়, পাহাড়ও নদীকে বাঁচায়; মানুষ যেমন প্রকৃতি থেকে নেয়, প্রকৃতিকেও ফিরিয়ে দিতে হয় যত্ন, সংযম ও সুরক্ষা। বান্দরবান বাংলাদেশের একটি জীবন্ত ঘর। তার বন ছাদ, নদী শিরা, পাহাড় স্তম্ভ, আর মানুষ তার আত্মা। তাই পর্যটনের নতুন মন্ত্র হোক দেখব; কিন্তু দখল করব না; যাব, কিন্তু ক্ষত রেখে আসব না; ছবি তুলব, কিন্তু মানুষের মর্যাদা কেড়ে নেব না; আয় করব, কিন্তু প্রকৃতিকে নিঃস্ব করব না। যে বান্দরবান আজ মেঘের আড়ালে নীরব, আগামী প্রজন্মের কাছেও যেন সে একইভাবে সবুজ, স্বচ্ছ ও সম্মানময় থাকে এই হোক আমাদের ভ্রমণ, উন্নয়ন ও ভালোবাসার অঙ্গীকার।
লেখক : সাংবাদিক
