পুলিশ জনগণের প্রতিপক্ষ নয়, বরং আস্থার প্রতীক

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটা রাষ্ট্রের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পুলিশ অন্যতম। নাগরিকের জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা প্রাসঙ্গিকভাবে লক্ষ্য করা যায়। নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা, ন্যায়বিচার ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে পুলিশের ভূমিকা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।

তাই পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই পুলিশকে শুধুমাত্র আইন প্রয়োগকারী বাহিনী হিসেবে দেখা হয় না; তাদের রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে আস্থার অন্যতম প্রধান সেতু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গণতান্ত্রিক ও উন্নত রাষ্ট্রে পুলিশের প্রকৃত শক্তি অস্ত্র, ক্ষমতা বা প্রশাসনিক কর্তৃত্বে না হয়ে জনগণের বিশ্বাস ও গ্রহণযোগ্যতার মধ্যে নিহিত থাকে।

বাংলাদেশেও পুলিশের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা একই। সাধারণ নাগরিক বিপদের সময় প্রথম যার দ্বারস্থ হয়, তারা হলো পুলিশ। রাস্তার নিরাপত্তা থেকে শুরু করে পারিবারিক বিরোধ, অপরাধ দমন, দুর্যোগকালীন সহায়তা, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা কিংবা রাষ্ট্রীয় সংকট মোকাবিলায় পুলিশ জনগণের সবচেয়ে কাছের। দেশের অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর তুলনায় পুলিশ প্রতিদিন সরাসরি সাধারণ মানুষের সঙ্গে কাজ করে। ফলে পুলিশের প্রতিটি আচরণ, সিদ্ধান্ত ও দায়িত্ব পালনের ধরন জনগণের চোখে পুরো রাষ্ট্রের কার্যকারিতার প্রতিফলন তৈরি করে।

তবে একই সঙ্গে বাস্তবতা হলো, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে মাঝেমধ্যে বিতর্কও সৃষ্টি হয়। এসব বিতর্ককে শুধু পুলিশের বিরুদ্ধে সমালোচনা হিসেবে না দেখে তাদের আরও শক্তিশালী করার সুযোগ হিসেবে দেখা প্রয়োজন। কারণ আধুনিক রাষ্ট্রে জনগণের আস্থা অর্জনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর প্রতিদিনের আচরণ, পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে তৈরি করতে হয়। সম্প্রতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফলে নেতিবাচক পুলিশ প্রতিবেদনের কারণে প্রায় ২,৫০০ প্রার্থী বাদ পড়ার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে এবং তারা কর্মসূচিও পালন করেছেন।

এ ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে, সেটি হলো, কোনো নাগরিকের ভবিষ্যৎ, চাকরি বা সামাজিক মর্যাদার ওপর প্রভাব ফেলে এমন পুলিশ প্রতিবেদন কতটা স্বচ্ছ, নির্ভুল ও প্রমাণভিত্তিক হওয়া উচিত? রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে যাচাই-বাছাই অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে একজন নাগরিকের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের নীতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

একইভাবে, রাজধানীর রাড্ডা এমসিএইচ এফপি সেন্টারে পুলিশের উপস্থিতির মধ্যেই দুর্বৃত্তদের মালামাল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ সংক্রান্ত সংবাদও জনমনে প্রশ্ন তৈরি করেছে। যদি কোনো অপরাধ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে ঘটে বা পুলিশের দায়িত্ব পালনে ঘাটতি দেখা দেয়, তাহলে সেটি শুধু একটি অপরাধের ঘটনা নয়; বরং জনগণের নিরাপত্তাবোধ ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

তবে এসব ঘটনা দিয়ে পুরো পুলিশ বাহিনীকে বিচার করা সঠিক নয়। পৃথিবীর কোনো দেশেই কোনো প্রতিষ্ঠান শতভাগ ত্রুটিমুক্ত নয়। প্রত্যেক বড় প্রতিষ্ঠানের মতো পুলিশের মধ্যেও যেমন দায়িত্বে অবহেলা, ভুল সিদ্ধান্ত বা অনিয়মের ঘটনা ঘটতে পারে, তেমনি অসংখ্য সদস্য নিষ্ঠা, সততা ও সাহসিকতার সঙ্গে মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, একটি রাষ্ট্র কীভাবে এমন একটি পুলিশ ব্যবস্থা তৈরি করবে, যেখানে ভালো কাজগুলো উৎসাহিত হবে এবং ব্যর্থতা বা অনিয়মের ক্ষেত্রে কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।

আধুনিক পুলিশিং তত্ত্বে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় 'কমিউনিটি পুলিশিং' বা জনগণভিত্তিক পুলিশিং ধারণাকে। এই ধারণার মূল বক্তব্য হলো, পুলিশ জনগণের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকারী প্রতিষ্ঠান নয়। জনগণের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে নিরাপত্তা নিশ্চিতকারী সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুলিশ কাজ করবে।

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, জাপানসহ অনেক উন্নত দেশে পুলিশ ব্যবস্থার একটি বড় পরিবর্তন এসেছে এই দর্শনের মাধ্যমে। সেখানে পুলিশের সফলতা শুধু অপরাধীর সংখ্যা, গ্রেপ্তারের হার বা মামলার পরিমাণ দিয়ে পরিমাপ না করে জনগণের আস্থা, অপরাধের শিকার ব্যক্তির সহায়তা পাওয়া, সামাজিক সহযোগিতা এবং অপরাধ প্রতিরোধের সক্ষমতাও বিবেচনা করা হয়।

উন্নত রাষ্ট্রগুলোর পুলিশ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, আইনের প্রয়োগে নিরপেক্ষতা। একজন ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং একজন সাধারণ নাগরিকের ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগের মানদণ্ড একই হওয়া উচিত, এটাই আধুনিক রাষ্ট্রের মূল নীতি। কারণ পুলিশ যদি জনগণের চোখে নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, তাহলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে জনগণের সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়। বিপরীতে, পুলিশ সম্পর্কে যদি পক্ষপাতিত্ব বা অনাস্থার ধারণা তৈরি হয়, তাহলে মানুষ অনেক সময় অপরাধের তথ্য দিতে বা সহযোগিতা করতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পুলিশি সিদ্ধান্তের জবাবদিহিতা। উন্নত দেশগুলোয় পুলিশকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দেওয়া হয়। কিন্তু সেই ক্ষমতার ব্যবহারের ওপর শক্তিশালী নজরদারিও থাকে। কারণ ক্ষমতা ও জবাবদিহিতা একে অপরের পরিপূরক। কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন, তদন্ত বা আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ প্রমাণ, যাচাই প্রক্রিয়া এবং সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা থাকা জরুরি। এতে যেমন অপরাধী শনাক্ত করা সহজ হয়, তেমনি নিরপরাধ মানুষের অধিকারও সুরক্ষিত থাকে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও পুলিশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো জনগণের আস্থা আরও শক্তিশালী করা। পুলিশকে শুধু অপরাধ ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্বে না থেকে অপরাধ প্রতিরোধকারী, জনগণের সহায়ক এবং সামাজিক নিরাপত্তার অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।

পুলিশ সদস্য যখন একজন অসহায় মানুষের অভিযোগ মনোযোগ দিয়ে শোনেন, যখন কোনো দুর্বল নাগরিককে আইনি সহায়তা দেন, যখন অপরাধের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ অবস্থান নেন, তখনই পুলিশের প্রকৃত ভাবমূর্তি তৈরি হয়।

একই সঙ্গে রাষ্ট্রেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। আধুনিক ও কার্যকর পুলিশ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে শুধু পুলিশকে দায়িত্ব দিলেই হবে না; তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, জনবল, পেশাগত স্বাধীনতা এবং উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা সীমিত সম্পদ, অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং নানা প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে দায়িত্ব পালন করেন। তাই কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া শুধু ব্যক্তিগত আচরণ পরিবর্তনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি উন্নতি সম্ভব নয়।

রাষ্ট্রকে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে পুলিশ আইন অনুযায়ী কাজ করতে পারে এবং একই সঙ্গে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে। রাজনৈতিক, সামাজিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবমুক্ত পেশাদার পুলিশ ব্যবস্থা একটি উন্নত রাষ্ট্রের অন্যতম ভিত্তি। কারণ পুলিশের নিরপেক্ষতা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র ও সুশাসনের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে হবে, পুলিশ ও জনগণ একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়। নিরাপদ সমাজ গড়ে উঠতে হলে জনগণের সহযোগিতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন জনগণের আস্থাভাজন পুলিশ বাহিনী। মানুষ এমন পুলিশ চায়, যাকে দেখে ভয় নয়, নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি হবে; যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর হবে; কিন্তু নিরপরাধ মানুষের অধিকার রক্ষায় মানবিক থাকবে।

উন্নত রাষ্ট্রের পরিচয় শুধু তার অর্থনীতি, অবকাঠামো বা প্রযুক্তিতে হয় না। রাষ্ট্রের নাগরিকরা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কতটা আস্থা রাখে, তার মধ্যেও নিহিত থাকে। সেই আস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো পুলিশ। তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পুলিশিংয়ের লক্ষ্য ক্ষমতার প্রদর্শন না হয়ে জনগণের বিশ্বাস অর্জনের বাহিনীতে রূপ নেওয়া উচিত।

 

অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়