আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস

সম্মানিত শব্দটি কী শিক্ষকতা পেশার অর্থনৈতিক উন্নতির প্রধান বাধা?

মো. আজিনুর রহমান

প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষক হলেন মানুষ গড়ার কারিগর। জাতি গঠনের কারিগর। পৃথিবীতে মানুষকে মানুষ হিসাবে তৈরির আর কোনো মাধ্যম আছে বলে মনে হয় না। এজন্য বলা হয়, শিক্ষকতা একটি সম্মানিত পেশা। শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো আমাদের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের অংশ। এক্ষেত্রে শিক্ষকের সম্মান কী তার ন্যায্য অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার বিকল্প হতে পারে? অনেকসময় মনে হয় 'সম্মানিত পেশা' কথাটিই শিক্ষকদের অর্থনৈতিক দাবি নিয়ে সমাজে এক ধরনের অদৃশ্য চাপ তৈরি করে। যেন শিক্ষক সম্মানিত হলেই তার ভালো বেতন, নিরাপদ জীবন, আবাসন, চিকিৎসা, অবসরকালীন নিরাপত্তা কিংবা জীবনযাত্রার ব্যয় অনুযায়ী আয়— এসব দাবি করার প্রয়োজন কমে যায়।

কিন্তু সম্মান এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা পরস্পরের বিকল্প নয়। বরং এটি সভ্য সমাজে দুটিই পাশাপাশি থাকার কথা। একজন শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন, তখন তিনি একটি নির্দিষ্ট সময়ের পাঠদান করেন না। পাঠ তৈরি, খাতা দেখা, প্রশ্ন তৈরি, ফলাফল প্রস্তুত, অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ, শিক্ষার্থীদের মানসিক ও সামাজিক সমস্যা মোকাবিলা— সবমিলিয়ে শিক্ষকতার কাজ শ্রেণিকক্ষের সময়ের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত।

তারপরেও শিক্ষক যখন নিজের বেতন-ভাতা নিয়ে কথা বলেন, তখন প্রায়ই তাকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়— আপনারা তো সম্মানিত পেশায় আছেন। প্রশ্ন হলো— সম্মান দিয়ে বাজার থেকে চাল-ডাল কেনা যায় কী? সন্তানের শিক্ষার ব্যয় মেটানো যায় কী? বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত কিংবা অবসরকালীন নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পাওয়া যায় কী? যদি 'না' হয়, তাহলে অর্থনৈতিব দাবি আর সামাজিক সম্মানকে এক করে দেখার প্রবণতা আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। একটি পেশাকে সম্মানিত বললেই সেই পেশার মর্যাদা বাড়ে না। পেশাটির সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবনযাত্রার মান, সামাজিক নিরাপত্তা, পেশাগত স্বাধীনতা, কাজের পরিবেশ এবং পারিশ্রমিক তার মর্যাদার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিক্ষকতার পেশাকে আকর্ষণীয় করার ক্ষেত্রে শুধু সামাজিক সম্মান নয়, বেতন কাঠামো, পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ, প্রশিক্ষণ, কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আমাদেরও প্রশ্ন— আমরা কী শিক্ষককে শুধু শ্রদ্ধা করতে চাই, নাকি শিক্ষকতা পেশাটিকে এমনভাবে গড়ে তুলতে চাই, যাতে মেধাবী ও যোগ্য মানুষ দীর্ঘমেয়াদে এ পেশায় থাকতে আগ্রহী হন। 'শিক্ষকতা মহান পেশা'— এ বাক্যটি শিক্ষকের আত্মমর্যাদা বাড়াতে পারে। কিন্তু যদি এই বাক্য তাঁর ন্যায্য পারিশ্রমিকের প্রশ্নকে পাশ কাটানোর হাতিয়ার হয়ে যায়, তখন সেই প্রশংসাই একসময় সমস্যার অংশ হয়ে দাড়াতে পারে। তরুণদের কাছে শিক্ষকতাকে আকর্ষণীয় পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে তাদের সামনে একটি যুক্তিসঙ্গত ক্যারিয়ার কাঠামো থাকতে হবে।

একজন তরুণ যদি দেখেন যে, দীর্ঘদিন কাজ করার পরও তার জীবন যাত্রার মৌলিক নিরাপত্তা অনিশ্চিত, তাহলে শুধু 'সম্মানিত পেশা' কথাটি তাকে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে। সমস্যাটি 'সম্মানিত' শব্দের মধ্যে নয়; সমস্যা তখনই, যখন এই শব্দটি শিক্ষকের অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা বন্ধ করে দেয়। শিক্ষককে সম্মান করতে হলে তাঁর হাতে ফুল দিতে হবে— এটা যেমন সত্য, তেমনি তার শ্রমের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করাও সম্মানের অংশ।

শিক্ষক দিবসে প্রশংসার বক্তব্য দেওয়া সহজ; কিন্তু একজন শিক্ষক যেন মাসের শেষ সপ্তাহে সংসারের হিসাব নিয়ে দুশ্চিন্তায় না থাকেন সেটি নিশ্চিত করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষককে শুধু 'জাতি গঠনের কারিগর' হিসেবে দেখলেই হবে না; তাকে একজন পেশাজীবী মানুষ হিসাবেও দেখতে হবে। তাঁর নিজের পরিবার আছে, প্রয়োজন আছে, স্বপ্ন আছে এবং অর্থনৈতিক অধিকার আছে। প্রশ্ন হচ্ছে- আমরা কী এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে শিক্ষকরা সম্মানিত কিন্তু অর্থনৈতিক অনিরাপদ? নাকি এমন একটি ব্যবস্থা চাই, যেখানে সম্মান ও ন্যায্য পারিশ্রমিক— দুটিই শিক্ষকের প্রাপ্য হিসেবে বিবেচিত হবে? শিক্ষকের সম্মান কমানো নয়, বরং সম্মানের ধারণাটিকেই আরও অর্থবহ করা প্রয়োজন। কারণ প্রকৃত সম্মান কখনও মানুষের প্রয়োজনকে অস্বীকার করে না। বরং যে সমাজ তার শিক্ষকদের জ্ঞান, শ্রম ও সময়ের যথাযথ মূল্য দেয়, সেই সমাজই তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি সবচেয়ে বাস্তব সম্মান প্রদর্শন করে। এবারের শিক্ষক দিবসে শিক্ষকতা পেশার অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সকল বাধা কেটে উঠুক এমন প্রত্যাশা করি।

 

লেখক : শিক্ষক, মিয়া পাড়া, চাপানী হাট, ডিমলা, নীলফামারী