দেয়াল বন্দি ইতিহাস : বাংলাদেশে জাদুঘরচর্চা নীরব ভবন, মুখর প্রশ্ন

রাশেদুল আলম প্রদীপ

প্রকাশ : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকার শাহবাগে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সামনে দাঁড়ালে এক ধরনের গাম্ভীর্য টের পাওয়া যায়। ভেতরে ঢুকলে সে গাম্ভীর্যের পাশে অন্য কিছুও চোখে পড়ে। কোনো গ্যালারিতে আলোর অভাব, কোথাও লেবেল পুরোনো বা অসম্পূর্ণ, কোথাও ভিড়ে ঠাসা স্কুলপড়ুয়া দল, যাদের শিক্ষক আর যাই হোন জাদুঘর-শিক্ষক নন। আবার পাশের কক্ষেই হয়তো দেখা যায় একটি চমৎকার সংগ্রহ, যার গল্প বলার সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি।

এ দৃশ্য বাংলাদেশের জাদুঘর-পরিসরের একটি ছোট প্রতিচ্ছবি। এ দেশের জাদুঘরগুলো একদিকে অসাধারণ সংগ্রহের উত্তরাধিকার বহন করে, অন্যদিকে পেশাগত কাঠামো, অর্থায়ন, গবেষণা ও জনসম্পৃক্ততার দিক থেকে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে চলে।

জাদুঘর কাকে বলে : সাধারণ মানুষ জাদুঘর বলতে বোঝে পুরোনো জিনিসপত্র সাজিয়ে রাখার একটি ভবন। কিন্তু পেশাদার জগতে জাদুঘরের সংজ্ঞা নিজেই একটি বিতর্কিত ও পরিবর্তনশীল বিষয়। আইকম ২০২২ সালে প্রাগ সাধারণ সম্মেলনে জাদুঘরের একটি নতুন সংজ্ঞা গ্রহণ করে। এর সারকথা হলো, জাদুঘর একটি অলাভজনক, স্থায়ী প্রতিষ্ঠান, যা সমাজের সেবায় নিয়োজিত। সে গবেষণা করে, সংগ্রহ করে, সংরক্ষণ করে, ব্যাখ্যা করে এবং মূর্ত ও অমূর্ত ঐতিহ্য প্রদর্শন করে। সংজ্ঞাটি জাদুঘরকে উন্মুক্ত, সবার জন্য প্রবেশগম্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে বলে এবং বৈচিত্র্য ও টেকসই উন্নয়নের কথা বলে।

আরও বলে, জাদুঘর নৈতিকভাবে ও পেশাদারভাবে পরিচালিত হবে, জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে কাজ করবে এবং তার লক্ষ্য হবে শিক্ষা, আনন্দ, প্রতিফলন ও জ্ঞান আদান-প্রদান।

এ সংজ্ঞায় লক্ষ করার বিষয় হলো, জাদুঘরকে শুধু 'সংরক্ষণাগার' হিসেবে দেখা হয়নি, দেখা হয়েছে 'সমাজের সেবক' ও 'অংশগ্রহণমূলক পরিসর' হিসেবে। ২০১৯ সালে জাপানের কিয়োটোতে সংজ্ঞা বদলের প্রস্তাব নিয়ে তীব্র মতবিরোধ হয়েছিল। ঔপনিবেশিক অতীত, বিতর্কিত সংগ্রহ আর জাদুঘরের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে অস্বস্তিকর প্রশ্ন উঠছিল, সেই বিতর্কে তাই প্রতিফলিত হয়েছিল। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ সংজ্ঞা আমাদের জন্য একটি আয়নার কাজ করে।

আমাদের জাদুঘরগুলো এ মাপকাঠিতে কোথায় দাঁড়িয়ে? 'সবার জন্য উন্মুক্ত' বলতে আমরা কী বুঝি? প্রতিবন্ধী দর্শক কি অনায়াসে ভেতরে যেতে পারেন? আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ইতিহাস কি তাদের নিজেদের কণ্ঠে বলা হচ্ছে, নাকি অন্যের ব্যাখ্যায়? এ প্রশ্নগুলোই নিরীক্ষার মূল সুর।

ইতিহাসের পথরেখা : এ অঞ্চলে আধুনিক অর্থে জাদুঘরের ধারণা এসেছে ঔপনিবেশিক আমলে। উপমহাদেশে জাদুঘরের ইতিহাসে কলকাতার ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম (১৮১৪) এক মাইলফলক। বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রাচীনতম উদ্যোগগুলোর মধ্যে রাজশাহীর বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর (প্রতিষ্ঠা ১৯১০) বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এটি স্থানীয় উদ্যোগে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান। বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রত্নবস্তু, শিলালিপি, ভাস্কর্য ও পুঁথি সংগ্রহের পেছনে ছিল স্থানীয় জমিদার, গবেষক ও ইতিহাসানুরাগীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। এই সূচনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এ ভূখণ্ডে জাদুঘরচর্চার একটি শক্তিশালী ধারা নাগরিক উদ্যোগ থেকেই এসেছে।

ঢাকা জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১৩ সালে। পরে ১৯৮৩ সালে এটি জাতীয় জাদুঘর হিসেবে পুনর্গঠিত হয় এবং ২০২২ এর বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর আইনে পরিচালিত হতে থাকে। বর্তমানে এটি দেশের বৃহত্তম ও সর্বাধিক পরিচিত জাদুঘর। এর গ্যালারিগুলোতে প্রাকৃতিক ইতিহাস, শিল্পকলা, নৃবিজ্ঞান ও মুক্তিযুদ্ধসহ বিচিত্র বিষয়ের সংগ্রহ নিয়ে ৪৬টি গ্যালারি রয়েছে। আছে অপ্রতুল জায়গায় গাদাগাদি করা নিদর্শন স্টোর আর একটি আধুনিক কনজারভেশন ল্যাব (কোইকা প্রজেক্টের বরে প্রাপ্ত)।

স্বাধীনতার পর : স্বাধীনতার পর জাদুঘরের কাছে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়। জাদুঘর শুধু অতীতের স্মারক নয়, একটি নবীন রাষ্ট্রের পরিচয় নির্মাণের মাধ্যম হয়ে ওঠে। জয়নুল আবেদিনের উদ্যোগে ১৯৭৫ সালে সোনারগাঁওয়ে লোকশিল্প জাদুঘর এবং ময়মনসিংহে জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশের জাদুঘর-ভাবনায় লোকজ ও শিল্পের ধারাকে প্রতিষ্ঠিত করে।

নব্বইয়ের দশক ও তারপর : ১৯৯৬ সালে ঢাকায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠা এ দেশের জাদুঘরচর্চায় একটি যুগান্তকারী ঘটনা। ট্রাস্টের মাধ্যমে পরিচালিত, জনসাধারণের দান ও সংগ্রহের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এ প্রতিষ্ঠান প্রমাণ করেছে, নাগরিক উদ্যোগ একটি জাদুঘরকে শুধু টিকিয়ে রাখে না, তাকে সামাজিক আন্দোলনের স্তরেও নিয়ে যেতে পারে। এ জাদুঘর ধারাবাহিকভাবে স্মৃতি সংগ্রহ, মৌখিক ইতিহাস সংরক্ষণ, তরুণদের সঙ্গে কাজ এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনীর মতো কর্মসূচি চালিয়েছে, যা এ দেশে তুলনামূলকভাবে বিরল। একই সময়ে বা তার কাছাকাছি সময়ে ঢাকার আহসান মঞ্জিল জাদুঘর, বিভিন্ন স্মৃতি জাদুঘর, বঙ্গবন্ধু-সংশ্লিষ্ট জাদুঘর, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক সংগ্রহশালা, ব্যক্তিগত উদ্যোগের সংগ্রহশালা এবং স্থানীয় ঐতিহ্য জাদুঘর গড়ে ওঠে। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে দেশে জাদুঘরের সংখ্যা শতাধিক বলে বিভিন্ন হিসাবে বলা হয়, যদিও সব হিসাবের ভিত্তি অভিন্ন নয়। এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার ইঙ্গিত আছে। দেশে কতটি জাদুঘর আছে, তার একটি হালনাগাদ, মানসম্মত ও সর্বজনস্বীকৃত নিবন্ধন-তালিকা আমাদের হাতে আছে কি?

প্রাতিষ্ঠানিক মানচিত্র—

ক. রাষ্ট্রীয় জাদুঘর : এর মধ্যে আছে জাতীয় জাদুঘরের মতো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, বিশেষায়িত সম্পূর্ণ সরকারি জাদুঘর হিসেবে একমাত্র তোশাখানা জাদুঘর এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত স্থানীয় ও সাইট জাদুঘর। মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর, ময়নামতি, কান্তজির মন্দির এলাকা ও অন্যান্য প্রত্নস্থলের জাদুঘরগুলো এ ধারার অংশ। উল্লেখ্য, পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহার ১৯৮৫ সালে ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায়।

খ. স্বায়ত্তশাসিত বা আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান : যেমন বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন, বিভিন্ন স্মৃতি-ট্রাস্ট।

গ. বিশ্ববিদ্যালয়-ভিত্তিক সংগ্রহশালা : এসব সাধারণত গবেষণা ও শিক্ষার প্রয়োজনে গড়া, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে জনদর্শকের কাছে প্রায় অদৃশ্য, যেমন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর।

ঘ. ট্রাস্ট বা নাগরিক উদ্যোগে জাদুঘর : মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ।

ঙ. ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সংগ্রহশালা : কেউ নিজের সংগৃহীত পুরাকীর্তি, মুদ্রা, বই, শিল্পকর্ম বা দৈনন্দিন জীবনের সামগ্রী নিয়ে উদ্যোগ নিয়েছেন। এদের মধ্যে কিছু অসাধারণ কাজ করছে, আবার কিছু কেবল সংগ্রহের স্তূপ হয়ে আছে। যেমন— পুরান ঢাকার জাহানারা ফাউন্ডেশন জাদুঘর, নওগাঁ কৃষি জাদুঘর প্রভৃতি।

চ. সম্প্রদায়-ভিত্তিক ও স্থানীয় উদ্যোগ : ছোট শহর, গ্রাম বা বিশেষ জনগোষ্ঠীর (যেমন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী) উদ্যোগে গড়া সংগ্রহশালা, যেখানে সংগ্রহ ও ব্যাখ্যা দুটোই স্থানীয় মানুষের হাতে। এ বহুমাত্রিকতা আমাদের শক্তি।

কিন্তু এর পাশাপাশি একটি কাঠামোগত দুর্বলতাও আছে। বিভিন্ন ধরনের জাদুঘরের জন্য একটি অভিন্ন পেশাগত মান, নিবন্ধন-ব্যবস্থা বা সহযোগিতার কাঠামো এখনো দঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। ফলে একটি জাদুঘরের ভালো অভিজ্ঞতা সহজে অন্যটিতে পৌঁছায় না।

সংগ্রহ-ব্যবস্থাপনা : জাদুঘরের প্রথম ও মৌলিক দায়িত্ব হলো সংগ্রহ সম্পর্কে জানা। কী আছে, কোথা থেকে এসেছে, কী অবস্থায় আছে, কোথায় রাখা হয়েছে। এই ধারাবাহিক নথিবদ্ধকরণই জাদুঘরের 'স্মৃতি'। অনেক জাদুঘরে সংগ্রহের তালিকা আছে, কিন্তু তা হয় হস্তলিখিত খাতায়, নয়তো অসম্পূর্ণ স্প্রেডশিটে।

আন্তর্জাতিক মানের নথিকরণ-পদ্ধতি (যেমন অবজেক্ট আইডি বা অনুরূপ কাঠামো) সব জায়গায় অনুসৃত হয় না। যখন কোনো বস্তু চুরি হয়, বিতর্কিত হয় বা অন্য জাদুঘরে ধার দিতে হয়, তখন এ নথির অভাব ভয়ংকর দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায়। প্রশ্ন হলো, আমাদের কোন কোন জাদুঘরের পূর্ণাঙ্গ ও আলোকচিত্রসহ সংগ্রহ-ক্যাটালগ আছে? এর উত্তর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অস্বস্তিকর।

সংরক্ষণ : বাংলাদেশের জলবায়ু সংরক্ষণকর্মীর জন্য কঠিন। উচ্চ আর্দ্রতা, উচ্চ তাপমাত্রা, মৌসুমি বৃষ্টি, বন্যা, পোকামাকড় ও ছত্রাকের উপদ্রব কাগজ, কাপড়, কাঠ, চামড়া ও ধাতব বস্তুর জন্য ক্ষতিকর। পুঁথি, পাণ্ডুলিপি, চিত্রকলা, লোকজ বস্ত্র ও কাঠের ভাস্কর্য বিশেষভাবে ঝুঁকিতে থাকে। এর বিপরীতে দেখা যায়—

প্রশিক্ষিত সংরক্ষণকর্মীর তীব্র অভাব। সংরক্ষণ-বিজ্ঞান একটি বিশেষায়িত পেশা, অথচ দেশে এর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও পেশাগত পথ সীমিত। জলবায়ু-নিয়ন্ত্রিত ভাণ্ডার বা স্টোরের ঘাটতি। এতে সংগ্রহের একটি বড় অংশ অনুপযুক্ত পরিবেশে থাকে। দুর্যোগ-প্রস্তুতির অভাব। বন্যা, অগ্নিকাণ্ড বা ভূমিকম্পে সংগ্রহ রক্ষার লিখিত পরিকল্পনা কতগুলো জাদুঘরে আছে, সেই প্রশ্ন গুরুতর। বিশেষত আমরা এমন এক ভূমিকম্প-ঝুঁকিপূর্ণ ভূখণ্ডে বাস করি, যেখানে ঢাকার ঘনবসতি ও পুরোনো ভবন ঝুঁকিকে আরও বাড়ায়।

পেশাদার জনবল : আমাদের দেশে জাদুঘরবিদ্যার একাডেমিক চর্চা আছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে এ বিষয়ে পাঠদান বা সংশ্লিষ্ট কোর্স রয়েছে, আর প্রত্নতত্ত্ব, ইতিহাস ও শিল্পকলা বিভাগে এর সংলগ্ন পাঠ হয়। কিন্তু জাদুঘরে নিয়োগ ও পদোন্নতির কাঠামো সব সময় বিশেষায়িত দক্ষতাকে যথার্থ মূল্য দেয় না। প্রায়ই একজন কর্মকর্তা বদলি হয়ে এক জাদুঘর থেকে অন্য দপ্তরে চলে যান, আর সঞ্চিত অভিজ্ঞতা হারিয়ে যায়।

জাদুঘরের ভালো শুধু কিউরেটর দিয়ে হয় না। প্রয়োজন সংরক্ষণকর্মী, রেজিস্ট্রার (সংগ্রহ-নথিভুক্তকারী), প্রদর্শনী-নকশাকার, জাদুঘর-শিক্ষাবিদ, ডিজিটাল-বিশেষজ্ঞ, নিরাপত্তাকর্মী ও দর্শক-সেবা কর্মী।

প্রদর্শনী ও ব্যাখ্যা : আধুনিক জাদুঘরচর্চার একটি মূল কথা হলো, বস্তু নিজে কথা বলে না। কিউরেটর তার প্রেক্ষাপট, অর্থ ও গল্প তৈরি করেন। অনেক সময় আমাদের প্রদর্শনী "কালানুক্রমিক তালিকার মতো হয়ে যায়। একটি কাচের বাক্সে বস্তু, পাশে ছোট লেবেল, শিরোনাম ও সাল। সেই লেবেল আবার প্রায়ই শুধু এক ভাষায়, হয়তো ইংরেজিতে অথবা বাংলায়, আর শিশু, প্রবীণ বা নতুন দর্শকের জন্য আলাদা ব্যাখ্যার ব্যবস্থা থাকে না। এক্ষেত্রে আলোচ্য হতে পারে এমন: আমাদের প্রদর্শনী কি শুধু 'মহান অতীত' দেখায়, না কঠিন, অস্বস্তিকর ও বহুমাত্রিক ইতিহাসকেও জায়গা দেয়? প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, নারী, শ্রমজীবী মানুষ ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের ইতিহাস কতটা উপস্থিত? আমাদের প্রদর্শনী কি দর্শককে ভাবতে প্ররোচিত করে, নাকি শুধু তথ্য গেলায়?

এ প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের মতো প্রতিষ্ঠান থেকে সাধারণ মানুষের স্মৃতি, চিঠি, ব্যবহার্য সামগ্রী ও মৌখিক বর্ণনাকে প্রদর্শনীর কেন্দ্রে আনার চর্চা অনুসরণযোগ্য।

এতে ইতিহাস শুধু 'বড় ঘটনা'র তালিকা না থেকে মানুষের অভিজ্ঞতায় রূপ নেয়। বর্তমানে সংস্কার চলমান তোশাখানা মিউজিয়ামও গল্পকে মাথায় রেখেই কিউরেটিং-এর দিকে নজর দিচ্ছে।

দর্শক ও শিক্ষা : ঈদ, ছুটি বা বিশেষ দিবসে জাদুঘরে ভিড় হয়।

কিন্তু দর্শক-সংখ্যা আর অর্থপূর্ণ সম্পৃক্ততা এক জিনিস নয়। অনেক স্কুলের শিক্ষাসফর মানে এক ঘণ্টায় কয়েকটি গ্যালারি ঘুরে আসা, যেখানে শিক্ষার্থীরা কী দেখল, কী শিখল, তা নিয়ে কোনো পূর্বপ্রস্তুতি বা পরবর্তী আলোচনা থাকে না।

জাদুঘর-শিক্ষা একটি স্বতন্ত্র শাখা। এতে শ্রেণিকক্ষের পাঠ্যক্রমের সঙ্গে সংযোগ, শিশুদের জন্য হাতে-কলমে কর্মশালা, শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ, প্রবীণদের স্মৃতি-কর্মসূচি এবং প্রতিবন্ধী দর্শকের জন্য সহজগম্য উপকরণের কথা ভাবা হয়। এ ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতি মূলত ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও কয়েকটি জাদুঘরের মধ্যে সীমিত। এর সঙ্গে আছে প্রবেশগম্যতার প্রশ্ন। র‍্যাম্প, লিফট, স্পর্শনির্ভর প্রদর্শন, বড় হরফের লেবেল, অডিও-গাইড, ইশারা ভাষা-সহায়তা, সবই আইকমের সংজ্ঞায় থাকা 'প্রবেশগম্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক' হওয়ার অংশ। আমাদের জাদুঘরগুলোর বড় একটি অংশ এখনও এই মান থেকে দূরে।

অর্থায়ন ও আইনি কাঠামো : জাদুঘর একটি ব্যয়বহুল প্রতিষ্ঠান, আর তা অলাভজনক। সরকারি জাদুঘর বার্ষিক বরাদ্দের ওপর নির্ভর করে, যার বড় অংশ বেতন ও রক্ষণাবেক্ষণে চলে যায়। গবেষণা, সংরক্ষণ, প্রদর্শনী-নবায়ন ও কর্মী-প্রশিক্ষণের জন্য অর্থ প্রায়ই অপ্রতুল। বেসরকারি জাদুঘরগুলো দাতা, ট্রাস্ট বা ব্যক্তিগত অনুদানের ওপর নির্ভর করে, যা অনিশ্চিত।

আইনি দিকে প্রত্নসম্পদ রক্ষার আইন (প্রত্নসম্পদ আইন), জাতীয় জাদুঘর আইন ও অন্যান্য বিধান আছে। কিন্তু ব্যক্তিগত জাদুঘরের নিবন্ধন, মান-নির্ধারণ, সংগ্রহের বৈধতা যাচাই এবং বিদেশে পাচার ঠেকানোর ক্ষেত্রে প্রয়োগ ও সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। প্রত্নসম্পদের অবৈধ বাণিজ্য ও পাচার দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে একটি পুরোনো সমস্যা। এ ক্ষেত্রে আইকম রেড লিস্ট (ঝুঁকিপূর্ণ সাংস্কৃতিক সামগ্রীর তালিকা) ও আন্তর্জাতিক চুক্তির কথা মনে রাখা জরুরি।

ডিজিটাল যুগ : গত এক দশকে বিশ্বের জাদুঘরগুলো ডিজিটাইজেশনের দিকে ঝুঁকেছে। অনলাইন ক্যাটালগ, ভার্চুয়াল ট্যুর, থ্রিডি স্ক্যান, ডিজিটাল আর্কাইভ। কোভিড-১৯ মহামারি এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করে। আমাদের দেশেও কিছু জাদুঘর অনলাইনে উপস্থিত হয়েছে, সামাজিক মাধ্যমে প্রদর্শনী ও ঘটনার প্রচার করছে। তবে এখানে কয়েকটি সতর্কতা আছে। প্রথমত, ডিজিটাইজেশন মানে শুধু ছবি তুলে ওয়েবসাইটে দেওয়া নয়। এর জন্য আদর্শ মেটাডাটা, ফাইল-সংরক্ষণ নীতি, ব্যাকআপ-ব্যবস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ লাগে। সার্ভার বন্ধ হলে বা ওয়েবসাইট মেয়াদোত্তীর্ণ হলে ডিজিটাল ঐতিহ্যও হারিয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, মেধাস্বত্ব ও সাংস্কৃতিক মালিকানার প্রশ্ন। কোন ছবি কে ব্যবহার করতে পারবে? সম্প্রদায়ের পবিত্র বা স্পর্শকাতর সামগ্রী কি অবাধে অনলাইনে দেওয়া উচিত? তৃতীয়ত, ডিজিটাল বৈষম্য। ইন্টারনেটে প্রবেশাধিকার যাদের কম, তাদের কাছে ডিজিটাল জাদুঘর আসলে পৌঁছায় না। সুতরাং ডিজিটাল উদ্যোগ ভৌত জাদুঘরের বিকল্প নয়, সম্পূরক।

আইকম : আইকম প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৬ সালে, ইউনেসকোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে। এর সদর দপ্তর প্যারিসে। বিশ্বের বহু দেশের জাদুঘর ও জাদুঘরকর্মীরা এর সদস্য। আইকমের কাঠামোয় আছে জাতীয় কমিটি, আন্তর্জাতিক কমিটি (বিষয়ভিত্তিক, যেমন সংরক্ষণ, জাদুঘর-শিক্ষা, নৃবিজ্ঞান ও লোকজ সংগ্রহ, ডিজিটাল ইত্যাদি) এবং আঞ্চলিক জোট। আইকম বাংলাদেশ হলো আইকমের বাংলাদেশ জাতীয় কমিটি।

সম্ভাবনার ক্ষেত্র : আইকম কোড অব এথিকসের বাংলা অনুবাদ পেশাগত নীতিমালা, ব্যাখ্যা ও সহজবোধ্য নির্দেশিকা তৈরি করে দেশের ছোট-বড় সব জাদুঘরে পৌঁছে দেওয়া একটি মৌলিক কাজ হতে পারে। অনেক ব্যক্তিগত বা স্থানীয় জাদুঘর হয়তো ভালো উদ্দেশ্যে কাজ করছে, কিন্তু নৈতিক মানদণ্ডের সঙ্গে পরিচিত নয়। দেশের জাদুঘরগুলোর একটি সমন্বিত জরিপ ও ডেটাবেস তৈরি করা, কোথায় কী আছে, কী অবস্থায আছে, কার কী প্রয়োজন তা নিয়ে জাদুঘর-নিবন্ধন ও সমীক্ষা করা যেতে পারে। নীতিনির্ধারকদের কাছে এ তথ্যই সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি। শিক্ষার্থী, নবীন কর্মী ও ইন্টার্নদের জন্য মেন্টরশিপ, বৃত্তি ও আন্তর্জাতিক সুযোগের তথ্য-সরবরাহের মাধ্যমে জাদুঘরকেন্দ্রীক তরুণ পেশাজীবী তৈরি করা যেতে পারে। সংগ্রহ-নথিকরণ, প্রতিরোধমূলক সংরক্ষণ, দুর্যোগ-প্রস্তুতি, প্রদর্শনী-নকশা ও জাদুঘর-শিক্ষা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা ও কর্মশালা আয়োজন করা যায়। জাদুঘর-নীতি, জাদুঘর-আইন সংস্কার ও পেশাগত স্বীকৃতির প্রশ্নে আইকম বাংলাদেশের মতো একটি পেশাদার সংগঠনের পরামর্শ মূল্যবান হতে পারে।

জাদুঘর কার জন্য : প্রযুক্তি, কাঠামো ও অর্থের আলোচনার পেছনে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়। জাদুঘর আসলে কার? রাষ্ট্রের? পণ্ডিতদের? পর্যটকদের? নাকি সেই সাধারণ মানুষের, যার পূর্বপুরুষের হাতে গড়া মৃৎপাত্র, কাঁথা বা লাঙলের ফলা এখন কাচের বাক্সে?

দেয়ালের ওপােও : বাংলাদেশের জাদুঘরচর্চা একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে আছে সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার, নাগরিক উদ্যোগের গৌরবময় উদাহরণ ও তরুণ প্রজন্মের নতুন আগ্রহ। অন্যদিকে আছে কাঠামোগত দুর্বলতা, সম্পদের অপ্রতুলতা, পেশাগত দক্ষতার ঘাটতি ও সমন্বয়ের অভাব। এ সন্ধিক্ষণে আইকম বাংলাদেশের মতো পেশাদার সংগঠনকে কাজে লাগাতে হবে শুধু আন্তর্জাতিক সংযোগ রক্ষায় নয়, দেশীয় জাদুঘর-সমাজকে ভেতর থেকে শক্তিশালী করায়ও।

লেখক : কিউরেটর, তোশাখানা জাদুঘর, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও সেক্রেটারি, আইকম-বাংলাদেশ