নিরাপত্তা ও মর্যাদায় বেড়ে উঠুক শিশু

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শিশুর হাসি একটি পরিবারের আনন্দ, সমাজের আশা এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের নাগরিক, নেতৃত্ব, কর্মশক্তি ও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করবে। তাই একটি শিশুর নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা শুধু তার পরিবারের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব।

প্রতিবছর অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার বিশ্ব শিশু দিবস পালন করা হয়। একই সঙ্গে শিশুর অধিকার, সুরক্ষা এবং উন্নয়ন ও বিকাশে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরও সচেতন ও উদ্যোগী করার লক্ষ্যে ২ থেকে ৮ অক্টোবর শিশু অধিকার সপ্তাহ পালন করা হয়। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য— 'শিশুর ভবিষ্যৎ হোক সুরক্ষিত'। এ প্রতিপাদ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিশুকে শুধু বর্তমান বিপদ থেকে রক্ষা করাই যথেষ্ট নয়; তার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানসিক বিকাশ, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করে একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে হবে।

শিশুর অধিকার কেন গুরুত্বপূর্ণ : শিশুর অধিকার বলতে শুধু বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগকে বোঝায় না। বেঁচে থাকা, সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা, পুষ্টিকর খাবার ও চিকিৎসা পাওয়া, শিক্ষা গ্রহণ, খেলাধুলা, পরিবারে ভালোবাসা ও নিরাপত্তা পাওয়া, নিজের মতামত প্রকাশ এবং নির্যাতন, শোষণ ও বৈষম্য থেকে মুক্ত থাকার অধিকারও এর অন্তর্ভুক্ত।একটি শিশু জন্মের পর থেকেই নানা সম্ভাবনা নিয়ে বেড়ে ওঠে। কিন্তু দারিদ্র্য, অপুষ্টি, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, নির্যাতন, পারিবারিক অবহেলা কিংবা শিক্ষার সুযোগের অভাব তার স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই শিশুর অধিকার রক্ষা মানে তার সম্ভাবনাকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া।

নিরাপদ শৈশবের প্রয়োজন : শৈশব মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিকাশপর্ব। এই সময়ে শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ, ভাষা, আবেগ, সামাজিক আচরণ ও ব্যক্তিত্বের ভিত্তি তৈরি হয়। ফলে শৈশবে নিরাপদ ও ইতিবাচক পরিবেশ পাওয়া অত্যন্ত জরুরি।পরিবারে নিয়মিত ঝগড়া, মারধর, ভয় দেখানো, অপমান বা অবহেলা শিশুর মনে দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিপরীতে স্নেহ, ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও উৎসাহ শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। তাই শিশুর প্রথম নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে পরিবারকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।

শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা : শিক্ষা শিশুর ভবিষ্যৎ গঠনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। শিশুকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর পাশাপাশি নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দারিদ্র্য, শিশুশ্রম, পারিবারিক সংকট, বিদ্যালয়ের দূরত্ব কিংবা নিরাপত্তাহীনতার কারণে কোনো শিশু যেন শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ঝরে না পড়ে, সেদিকে নজর দিতে হবে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্যও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহায়ক শিক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষাকে শুধু পরীক্ষার ফলাফল ও সনদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। শিশুর চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ বিকাশও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।

শিশুশ্রম বন্ধে উদ্যোগ : শিশুশ্রম শিশুর শৈশব কেড়ে নেয় এবং শিক্ষার সুযোগ সীমিত করে। যে বয়সে শিশুর বিদ্যালয়ে যাওয়ার, খেলাধুলা করার ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার কথা, সে বয়সে কঠিন শ্রমে যুক্ত হওয়া তার অধিকার লঙ্ঘনের শামিল। শিশুশ্রম বন্ধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনতে হবে। শিশুর শিক্ষা অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশু নিয়োগের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

নির্যাতন ও সহিংসতা প্রতিরোধ : শিশুর ওপর শারীরিক আঘাত, মানসিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, অবহেলা, ভয় দেখানো কিংবা অপমান— কোনোটিই গ্রহণযোগ্য নয়। অনেক শিশু নির্যাতনের শিকার হলেও ভয় বা লজ্জার কারণে তা প্রকাশ করতে পারে না।তাই অভিভাবক ও শিক্ষকদের শিশুর আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তনের দিকে নজর রাখতে হবে। কোনো শিশু অভিযোগ করলে তাকে দোষারোপ না করে তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। শাসনের নামে মারধর বা অপমানের সংস্কৃতি থেকেও বেরিয়ে আসা জরুরি। ভালোবাসা, বোঝাপড়া ও ইতিবাচক শৃঙ্খলার মাধ্যমে শিশুকে দায়িত্বশীল করে তোলা সম্ভব।

বাল্যবিবাহ রোধ : বাল্যবিবাহ বিশেষ করে কন্যাশিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানসিক বিকাশ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করে। অল্প বয়সে বিয়ের কারণে অনেক মেয়েশিশু শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে এবং নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখোমুখি হয়। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে পরিবার, বিদ্যালয়, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা ও সামাজিক সংগঠনকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। কন্যাশিশুকে বোঝা নয়, সম্ভাবনাময় মানবসম্পদ হিসেবে দেখতে হবে।

শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব : শিশুর শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক অশান্তি, বন্ধুত্বের সমস্যা, বিদ্যালয়ে হয়রানি, সামাজিক তুলনা, একাকিত্ব বা নির্যাতনের অভিজ্ঞতা শিশুর মানসিক অবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে। শিশু হঠাৎ চুপচাপ হয়ে গেলে, বিদ্যালয়ে যেতে না চাইলে, অতিরিক্ত ভয় পেলে, ঘুম বা খাওয়ার ধরনে পরিবর্তন দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। শিশুকে বকাঝকা না করে তার কথা শুনতে হবে। প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা : শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত ও সুষম পুষ্টি প্রয়োজন। অপুষ্টি শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ও শেখার সক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বয়স অনুযায়ী পুষ্টিকর খাবার, নিরাপদ পানি, পরিচ্ছন্নতা, টিকাদান ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি।

পরিবারকে শিশুদের অতিরিক্ত অস্বাস্থ্যকর খাবার, কোমল পানীয় ও অতিপ্রক্রিয়াজাত খাদ্যের অভ্যাস সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম ও খেলাধুলায় উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন।

খেলাধুলা ও সৃজনশীলতার সুযোগ : শিশুর বিকাশ শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। খেলাধুলা, বই পড়া, ছবি আঁকা, গান, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও বিজ্ঞানচর্চা শিশুর সৃজনশীলতা, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক দক্ষতা বাড়ায়। নগরায়ণের ফলে খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত জায়গা কমে যাওয়ায় শিশুদের স্বাভাবিক খেলাধুলার সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। শিশুদের জন্য নিরাপদ খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

ডিজিটাল নিরাপত্তা : ডিজিটাল প্রযুক্তি শিশুদের শিক্ষার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। তবে অনলাইন হয়রানি, প্রতারণা, ক্ষতিকর বিষয়বস্তু, অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারের ঝুঁকিও রয়েছে। শিশুকে প্রযুক্তি থেকে পুরোপুরি দূরে রাখার পরিবর্তে নিরাপদ ব্যবহার শেখানো প্রয়োজন। ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি অপরিচিত ব্যক্তির কাছে না দেওয়া, সন্দেহজনক যোগাযোগ এড়িয়ে চলা এবং অনলাইনে কোনো অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে অভিভাবক বা বিশ্বস্ত বড়দের জানাতে হবে।

প্রতিবন্ধী শিশুর অধিকার : প্রতিবন্ধী শিশুরাও সমান অধিকারসম্পন্ন। তাদের শিক্ষা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন, খেলাধুলা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিবন্ধিতাকে কেন্দ্র করে উপহাস বা বৈষম্য শিশুর আত্মমর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, গণপরিবহন ও সরকারি স্থাপনাগুলোকে আরও প্রতিবন্ধীবান্ধব করা প্রয়োজন। পরিবারকেও প্রয়োজনীয় সহায়তা ও পরামর্শ দিতে হবে।

দুর্যোগে শিশুর সুরক্ষা : বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা ও তাপপ্রবাহসহ বিভিন্ন দুর্যোগে শিশুরা বিশেষভাবে ঝুঁকিতে পড়ে। দুর্যোগের সময় খাদ্য, নিরাপদ পানি, চিকিৎসা, স্যানিটেশন ও নিরাপত্তার পাশাপাশি শিশুদের মানসিক সুস্থতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। দুর্যোগের পর দ্রুত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।

রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব : শিশুর অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রকে আইন ও নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। শিশুশ্রম, নির্যাতন, বাল্যবিবাহ ও শোষণ প্রতিরোধে মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়াতে হবে। দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিও আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব রয়েছে। শিশুদের নিয়ে সংবাদ প্রকাশের সময় তাদের পরিচয়, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো শিশুকে সংবাদ বা প্রচারের কারণে যেন নতুন ঝুঁকিতে পড়তে না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

পরিশেষে বলা যায়, বিশ্ব শিশু দিবস ও শিশু অধিকার সপ্তাহ আমাদের দায়িত্ব নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। একটি নির্দিষ্ট দিনে আলোচনা বা সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচির মধ্যেই শিশুর অধিকার রক্ষার দায়িত্ব সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এটি হতে হবে প্রতিদিনের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার।প্রতিটি শিশুর রয়েছে নিরাপদে বেঁচে থাকা, শিক্ষা গ্রহণ, সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা, খেলাধুলা করা, নিজের কথা বলার এবং মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপনের অধিকার। কোনো শিশু যেন দারিদ্র্য, সহিংসতা, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, বৈষম্য বা অবহেলার কারণে তার সম্ভাবনা হারিয়ে না ফেলে— এটাই হওয়া উচিত আমাদের সম্মিলিত প্রত্যয়। আজকের শিশুর নিরাপদ শৈশবই আগামী দিনের নিরাপদ বাংলাদেশ। তাই শিশুদের শুধু ভবিষ্যতের নাগরিক হিসেবে নয়, আজকের অধিকার সম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। তাদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠবে মানবিক, দক্ষ, সমৃদ্ধ ও দায়িত্বশীল বাংলাদেশ।

লেখক : কলাম লেখক