উৎস থেকে নির্মূল না করলে রক্ষা নেই
নীরব ঘাতক পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণ
ওসমান গনি
প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই নদী মানুষের জীবনিকা, যোগাযোগ ও সংস্কৃতির প্রাণপ্রবাহ হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আজ সেই প্রাণপ্রবাহের নদীগুলোই পরিণত হচ্ছে পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যের বিশাল ভাগাড়ে। শুধু নদী নয়, মানুষের জীবনকে তছনছ করে দিয়েছে এই নীরব ঘাতক পলিথিন। এটি যে শুধু মানবস্বাস্থ্যকে ধ্বংস করছে তা নয়, বরং এ পৃথিবীর সর্বক্ষেত্রেই সবকিছুর জন্য পলিথিন চরম ক্ষতিকর। বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন সরকার পলিথিন বন্ধ করার জন্য নানা উদ্যোগ ও ঘোষণা দিলেও তা কোনোভাবেই বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না।
প্রশ্ন হলো, পলিথিন বন্ধ করা সম্ভব হবে কী করে? যেখান থেকে পলিথিনের উৎপাদন হয়, সবার আগে সেই গোড়াতেই আঘাত হানতে হবে। গাছের যেমন গোড়া না কেটে শুধু উপরের ডালা কাটলে গাছ মরে না, পলিথিনের রোগও ঠিক তেমনই। পলিথিন উৎপাদনকারী কারখানাগুলো একবারে নির্মূল করতে না পারলে এটি কখনও কোনোভাবেই বন্ধ করা যাবে না।
আমাদের দেশে যখনই পলিথিনের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়, তখন দেখা যায় খোলা বাজারের সাধারণ দোকানদার বা খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপর চড়াও হওয়া হয়। খুচরা বিক্রেতাদের নিকট থেকে সামান্য কিছু পলিথিন জব্দ করেই দায়িত্ব শেষ করা হয়। কিন্তু এভাবে ফুটপাথ বা খুচরা বাজারে অভিযান চালিয়ে কখনও পলিথিন বিক্রি বন্ধ করা যাবে না। শুধু পলিথিন নয়, যেকোনো নিষিদ্ধ বা ক্ষতিকর পণ্যের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য, যে পর্যন্ত না উৎপত্তিস্থল বা কারখানাগুলো চিরতরে ধ্বংস করা যাচ্ছে, সে পর্যন্ত তা প্রতিরোধ করা অসম্ভব। তাই যারা পলিথিন উৎপাদন করছে, সেই কুশীলবদের খুঁজে বের করে তাদের কারখানা চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া উচিত। তাহলে আর কখনও বাজারে পলিথিন খুঁজে পাওয়া যাবে না। পলিথিন উৎপাদনকারী কারখানাগুলো দিব্যি সচল রেখে খোলা মাঠে লোকদেখানো অভিযান চালিয়ে পলিথিন নির্মূল করা যায় না। যেকোনো অপরাধ বা ক্ষতিকর বস্তু একবারে বিনষ্ট করতে হলে প্রথমে তার শেকড় বা গোড়ায় কোপ দিতে হবে।
প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহতার চিত্রটি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন মিডিয়ায় বারবার প্রকাশিত হলেও তা দেখেও না দেখার ভান করে থাকে কর্তৃপক্ষ। পলিথিন একবারে চিরতরে নির্মূল করার জন্য কর্তৃপক্ষের যেন কোন মাথা ব্যাথা নেই। দেশের বিভিন্ন জায়গার দিকে তাকালে নদ-নদী, খাল বিল, স্থল জল সর্বত্রই শুধু পলিথিন আর পলিথিন দেখা যাচ্ছে। দেশ গ্রামে বিভিন্ন জায়গায় চাষাবাদ ও গাছ গাছালি লাগাতে গিয়ে মাটি খুড়লে অনেক নিচে পাওয়া যায় পলিথিন। মাটির নিচে যখন পলিথিন থাকে সেক্ষেত্রে শুধু গাছ গাছালি নয়, কোন ফসলেরই উৎপাদন হয় না।
দেশ গ্রামের পুকুর, খাল বিল, নদীগুলোর দিকে তাকালে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নদীর পানিতে ও তলদেশে বছরের পর বছর ধরে জমছে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক। দূষিত হচ্ছে মাছ ও জলজ পরিবেশ, আর খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে খালি চোখে অদৃশ্য ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক। নদীতে ফেলা পলিথিন, বোতল ও প্যাকেটের দূষণ শেষ পর্যন্ত ঘুরেফিরে মানুষের খাবারের থালায় এসে পৌঁছাচ্ছে। ফলে প্লাস্টিক দূষণ আজ শুধু কোনো স্থানীয় পরিবেশগত সংকট নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক বিশাল অস্তিত্বের সংকট।
দেশের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের মতে, বুড়িগঙ্গার ১৫ ফুট গভীরেও প্লাস্টিক বর্জ্য পাওয়া গেছে। বর্জ্যের লেবেল পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সেগুলোর কিছু ১৫ থেকে ১৭ বছর আগে ফেলা হয়েছিল, অথচ তা দেখতে প্রায় নতুনের মতো। ২০২৩ সালে শুরু হওয়া তাদের গবেষণা থেকে জানা যায়, বোতল ও খাদ্যপণ্যের প্যাকেজিংয়ে বহুল ব্যবহৃত পলিইথিলিন টেরেফথ্যালেট বা পিইটি প্লাস্টিক সম্পূর্ণ ক্ষয় হতে আনুমানিক প্রায় ৪৫০ বছর সময় লাগতে পারে। সময়ের বিবর্তনে এসব দীর্ঘস্থায়ী প্লাস্টিক ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিক তৈরি করে পুরো প্রকৃতি ও পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। শত শত বছর ধরে পলিথিন ও প্লাস্টিক পরিবেশে টিকে থাকায় আজকের এই বর্জ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও এক মারাত্মক দূষণের বোঝা হয়ে থাকছে। প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণের প্রভাব শুধু নদীর ঘোলা পানিতে সীমাবদ্ধ নেই। ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা জলজ প্রাণীর দেহে প্রবেশ করে খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে অবলীলায় মানুষের শরীরেও বাসা বাঁধছে। ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বঙ্গোপসাগরের মাছের তুলনায় বুড়িগঙ্গা থেকে ধরা মাছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এর আগে ২০২৩ সালের আরেক গবেষণায় বুড়িগঙ্গার মাছ, কাঁকড়া ও নদীর তলানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছিল।
বর্তমানে শুধু মাছ নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহৃত লবণ, তেল ও চিনির মতো অতিপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে বলে, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত বিশেষজ্ঞদের মতামত থেকে জানা যায়। মানবদেহে এসব ক্ষতিকারক কণার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা চলছে। তবে বিভিন্ন চিকিৎসা ও পরিবেশগত গবেষণায় মানুষের প্রজনন স্বাস্থ্য, পরিপাকতন্ত্র ও শ্বাসতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতির সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিশেষ করে কোমলমতি শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক, যা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্লাস্টিক ও পলিথিনের দূষণের হাত থেকে দেশের প্রাকৃতিক ও সংরক্ষিত বনাঞ্চলও রেহাই পাচ্ছে না। সুন্দরবনের মতো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী অঞ্চলেও এর কালো ছায়া পড়েছে। ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় সুন্দরবনের পানিতে প্রতি লিটারে গড়ে ২৩.২৫টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে, যেখানে পিইটি প্লাস্টিককে প্রধান দূষক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, আমাদের দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে ১ হাজার ৪১৫টি নদ-নদী রয়েছে, যেগুলোর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪ হাজার ১৪০ কিলোমিটার। এসব নদীর প্রায় প্রতিটিই আজ পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যে জর্জরিত, যা সামগ্রিক জলজ পরিবেশ ও পানিপ্রবাহের স্বাভাবিক গতিকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
নগরজীবনের চিত্রও এর চেয়ে আলাদা কিছু নয়। যত্রতত্র ফেলে দেওয়া পলিথিন ও ওয়ান-টাইম খাবারের প্যাকেট বৃষ্টির সময় শহরের অলিগলির নালা-নর্দমা সম্পূর্ণ আটকে দেয়, ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে চরম জনদুর্ভোগ দেখা দেয়। দেশের বিভিন্ন শহরগুলোতে নর্দমার কারণে বৃষ্টির পানি আটকে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। তখন এই নর্দমার প্রতিবন্ধকতা দূর করতে এবং শহরকে জলাবদ্ধতামুক্ত রাখতে লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, ব্যয়বহুল পরিচ্ছন্নতা অভিযানের কিছুদিন পরেই নর্দমাগুলো আবার পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যে বন্ধ হয়ে যায়।
আইন ও নিষেধাজ্ঞার বাস্তবায়নহীনতাই এ সংকটের মূল কারণ। বাংলাদেশে ২০০২ সালে প্রথম পলিথিনের শপিংব্যাগ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিগত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এই নিষেধাজ্ঞা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে, অথচ বাজারে এর যত্রতত্র ব্যবহার রমরমিয়ে চলছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল মহল থেকে অবৈধ পলিথিন কারখানার বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নানা প্রস্তুতি ও হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করার বিভিন্ন পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে হাইকোর্ট বুড়িগঙ্গার তীরে ইসলামবাগ, লালবাগ ও কামরাঙ্গীরচর এলাকায় অবিলম্বে প্লাস্টিকসহ অন্যান্য বর্জ্য অপসারণের কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। তবে শুধু নির্দেশ জারি করলেই হবে না, বরং সেই নির্দেশ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন এবং তার দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করাটাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় ও কঠিন চ্যালেঞ্জ।
জাতীয় কর্মপরিকল্পনায় ২০২৫ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার, ২০২৬ সালের মধ্যে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ৯০ শতাংশ পর্যায়ক্রমে বন্ধ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে প্লাস্টিক উৎপাদন ৩০ শতাংশ কমিয়ে আনার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে এসব লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে বাস্তবে কতটা অগ্রগতি হয়েছে, তার স্বচ্ছ ও হালনাগাদ তথ্য জনগণের সামনে আসা জরুরি। কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির উৎপাদিত পণ্য নদী বা পরিবেশ দূষিত করলে সেই দূষণ পরিষ্কার করার সম্পূর্ণ আর্থিক ও আইনি দায়ভার সেই প্রতিষ্ঠানকেই নিতে হবে এমন একটি আইন করা যেতে পারে, তাহলে হয়তো দুষণের মাত্রটা একটু কমে আসবে। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা অসম্ভব কিছু নয়, যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আইনের কঠোর প্রয়োগ থাকে।
পরিবেশবিদ ও নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নদীর আবর্জনা পরিষ্কার করার লোক দেখানো উদ্যোগ নিলেই চলবে না; বরং বর্জ্যের উৎসে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক পুনর্ব্যবহারযোগ্য অবকাঠামোর উন্নয়ন, উৎপাদনকারী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্ণ দায়বদ্ধতা এবং প্রচলিত আইনের নিরপেক্ষ ও ধারাবাহিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বুড়িগঙ্গার তলদেশে জমে থাকা স্তূপীকৃত প্লাস্টিক অতীতের দায়িত্বহীনতার নীরব সাক্ষ্য বহন করছে। আজ আমরা অসচেতনভাবে যে বোতল বা পলিথিন প্যাকেট নদীতে ফেলছি, তার ক্ষুদ্র কণা বহু যুগ পরও প্রকৃতিতে টিকে থাকবে এবং আমাদেরই ক্ষতি করবে।
তাই নদী ও প্রকৃতিকে বাঁচানোর এ উদ্যোগ শুধু পরিবেশ রক্ষার গতানুগতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি মানুষের বিশুদ্ধ খাদ্য, সুস্বাস্থ্য এবং আগামী প্রজন্মের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার এক অবিকল্পিত প্রশ্ন। পলিথিনের বিরুদ্ধে এই সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় লড়াইয়ে জিততে হলে সবার আগে গোড়ায় কোপ দিতে হবে, অর্থাৎ উৎপাদন কারখানার চিমনি বন্ধ করতে হবে চিরতরে।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
