শিশুর 'আমিত্ব' শৈশব কি ডিভাইসের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ছে?
জান্নাতুল রুহী
প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বেশ কয়েকমাস আগে টেলিভিশনে ক্রিকেট খেলা দেখছিলাম। সেইসময় আমার ছেলে, 'আমি এখন কী করব'— এ প্রশ্নের উত্তরে তাকে বললাম, 'আসো, আমরা খেলা দেখি।' সে তাৎক্ষণিকভাবে উত্তর দিল, 'না, টেলিভিশনে খেলা দেখতে আমার ভালো লাগে না। ওখানে ওরাই শুধু খেলে। ওখানে আমি কেউ না!' উত্তরটি আপাততভাবে খুবই সরল মনে হতে পারে। কিন্তু তার তাৎক্ষণিক এ উত্তরটি আমাকে বিস্মিত করে তোলে! এটা তো সত্যিই যে— সে ওই খেলার কিছুই না, সে শুধু দর্শক। আর শুধু দর্শক হয়ে খেলা দেখতে সে নারাজ। এ কথাটার নিপাট একটা অর্থ হলো, তার অভিজ্ঞতায় দর্শক হয়ে থাকা আর অংশগ্রহণ করার মধ্যে পার্থক্যটা তৈরি হয়ে গেছে! তাহলে কি আমরা ধীরে ধীরে এমন এক শৈশবের দিকে যাচ্ছি, যেখানে শিশুকে শুধু কিছু দেখানো বা শোনানো যথেষ্ট নয়। বরং তাকে সেই অভিজ্ঞতারও কোনো না কোনো অংশে বিদ্যমান বা সংশ্লিষ্ট থাকতে হবে?
গল্পের বইয়ের নায়কও শিশু নিজেই : কয়েকদিন আগে ফেসবুকে একটা অনলাইনশপের বিজ্ঞাপন নজরে এলো। বিজ্ঞাপনটির শিরোনাম, 'এবার আপনার সন্তানই হবে গল্পের সুপারহিরো।' বিজ্ঞাপনটিতে শিশুর জন্য বই তৈরি করতে অভিভাবকের কাছ থেকে সন্তানের নাম আর বয়স চাওয়া হয়েছে। অর্থ বরাদ্দ দিয়ে যে অভিভাবক এটা করবেন, বইতে সেই শিশুটিই হবে নায়ক! বই খুললেই শিশু দেখবে, রোমাঞ্চকর অভিযানের মূল চরিত্র সে নিজেই! প্রকাশিত হওয়ার আগে খসড়া দেখে নেওয়ার সুযোগও আছে। বিজ্ঞাপনে এমনকি সম্ভাব্য শিশুর প্রতিক্রিয়াটিও কল্পনা করে বলা হয়েছে 'মা, এ গল্পটা তো আমাকে নিয়ে!' অর্থাৎ এখানে শিশুকে শুধু একটা বই পড়ার জন্যই দেওয়া হচ্ছে না।
একইসঙ্গে বইটির গল্পের প্রধান চরিত্রও তাকেই করা হচ্ছে। অন্য কারও গল্পের পাঠক না হয়ে শিশুটি হয়ে উঠছে নিজের গল্পের পাঠক, আর সেই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রও। বই প্রস্তুতকারীদের শিশুটিকে নায়ক করার আগ্রহটা আসলে কোথা থেকে আসছে? আমরা কি পাঠক হয়ে থাকাটাকে আর যথেষ্ট মনে করছি না?
খেলনাতেও এখন শিশুর সক্রিয় অংশগ্রহণ : শুধু গল্পের বই-ই না। বাজারে কিছু অফলাইন ও শিক্ষনীয় খেলনার মধ্যেও একই বৈশিষ্ট্যটা চোখে পড়ে। এগুলোও শিশুকে মোটেও শুধু চুপচাপ বসে দেখার বা ব্যবহার করার অবস্থায় রাখে না। খেলনাগুলো তাকে কিছু একটা করতে বলে; যেমন: কোনো চরিত্র নির্বাচন করতে, অভিনয় করতে, হাত ঘোরাতে, সাড়া দিতে নির্দেশ করে। মাল্টিপ্লিকেশন রোলারবা ফোর-ইন-ওয়ান ম্যাথ রোলার সেটের কথাই ধরা যাক। এখানে নামতা শেখা মানে শুধু পড়া বা মুখস্থ করা নয়, বরং রোলারটা হাতে নিয়ে চালানো হয়।
রোল-প্লে অ্যান্ড প্রিটেন্ড প্লে-র খেলনায় শিশু তার পছন্দের চরিত্র; যেমন: ডাক্তার, শেফ বা দোকানদার সেজে নিজেকে অন্য ভূমিকায় কল্পনা করে। আবার সেন্সর-বেসড বিভিন্ন খেলনায় শিশুর ছোঁয়ায় কিছু একটা ঘটে; যেমন: আলোর মাধ্যমে বিভিন্ন ছবির প্রতিফলন হওয়া। এলসিডি রাইটিং ট্যাবলেটে সে লেখে, মুছে ফেলে, আবার নতুন করে শুরু করে।
এ পণ্যগুলো ভালো না মন্দ, তাদের উদ্দেশ্য কী, মূল্য বেশি, নাকি কম, এটা বিচারের কাজ আমার না। শুধু এই কয়েকটা উদাহরণ মিলিয়ে পাঠ করলে একটা বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে: শিশুর অফলাইনের শৈশবের অভিজ্ঞতাকেও যেন ক্রমেই সক্রিয় অংশগ্রহণের বৈশিষ্ট্যে রুপান্তরিত করা হচ্ছে। তাহলে এটা কি আদৌ খেলনা আর শেখার উপকরণ বানানোর স্বাভাবিক বিবর্তন? নাকি শিশুর শৈশব অভিজ্ঞতা কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়ে আমাদের দেখার চোখটাই পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে?
তাহলে কী ডিজিটাল মিডিয়া শৈশবের বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন করছে : আমরা একদিকে চাই শিশু স্ক্রিন থেকে দূরে থাকুক। টেলিভিশন কম দেখুক, মোবাইল ফোন কম ব্যবহার করুক। আর এগুলোর পরিবর্তেবই পড়ুক, খেলুক, মাঠে যাক।
অর্থাৎ বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করুক। অথচ অন্যদিকে আমরাই তার অফলাইন অভিজ্ঞতাকে অনলাইনের বৈশিষ্ট্য দিচ্ছি! তার গল্পের বইকে পারসোনালাইজড করছি। খেলনাকে ইন্টারঅ্যাকটিভ করে বানাচ্ছি। তার স্পর্শে কিংবা কাজের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়ার ব্যবস্থাও করছি। এমনকি তাকে বাছাই বা নির্বাচন করার সুযোগও তৈরি করে দিচ্ছি। আবার তাকেই গল্প বা খেলার কেন্দ্রিয় চরিত্র বানিয়ে দিচ্ছি। এর অর্থ কি এমন যে, ডিজিটাল মিডিয়াই শিশুর শৈশবের বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন করছে? আর সেটা আমরাই গ্রহণ করছি?
এটা সত্য যে কয়েকটা বিজ্ঞাপন আর খেলনার বৈশিষ্ট্য দেখে বড় কোনো পরিবর্তনের কথা বলা যায় না। হয়তো এ সবই একেবারেই বিচ্ছিন্ন উদাহরণমাত্র। কারণ শিশুকে নিজের গল্পের চরিত্র বানানোর ধারণাও নতুন নয়। রোল-প্লে তো শিশুর খেলার সঙ্গে বহুকালের সম্পর্ক। আমাদের শৈশবে 'যেমন খুশি তেমন সাজো'-তে আমরাও নিজেদের ইচ্ছে মতো সেজেছি, অভিনয় করেছি। কাজেই এগুলোকে সরাসরি ডিজিটাল মিডিয়ার প্রভাব বলার মতো প্রমাণ হাতে নেই— এটা নিরেট সত্য। তবুও কয়েকটা দৃশ্য পাশাপাশি রাখার পর প্রশ্নটা এড়ানোও যায় না। বর্তমানে শিশুর জন্য আমরা যে অভিজ্ঞতা সাজাচ্ছি, সেখানে তার নিজের উপস্থিতি, অংশগ্রহণ, পছন্দ আর প্রতিক্রিয়াকে কি পূর্বের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি না? যদি এ আশঙ্কা, কিছুটাও যথার্থ হয়, তাহলে এই গুরুত্ব দেওয়ার পেছনে ডিজিটাল মিডিয়ার নতুন এ মিথস্ক্রিয়াপূর্ণ সংস্কৃতির কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটাই বরং ভাবার বিষয়।
সক্রিয় অংশগ্রহণকারীর বিপরীতটার সঙ্গে পরিচয় : শিশুকে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী করে দেখানো যে মন্দ, এমন মোটেও নয়। নিজের মতো করে কিছু করা, পছন্দ করার সুযোগ পাওয়া, প্রশ্ন করা, যে কোনো ধরনের অভিজ্ঞতার অংশ হওয়া, এসব শিশুর শেখা আর বেড়ে ওঠার অবশ্য জরুরি অংশ। তবে এর বিপরীত বৈশিষ্ট্যগুলোতেও তো তাকে বিচরণ করতে হবে। অর্থাৎ অন্যের গল্প দেখার ধৈর্য, অন্য কারও খেলা দেখে যাওয়া, একটু অপেক্ষা করা, এমনকি কিছুতে বিরক্ত হয়ে নিজের মতো সময় কাটানোও হয়তো শিশুর অভিজ্ঞতারই অংশ। বলাবাহুল্য, এমন জগতের সঙ্গেও পরিচয় হওয়া দরকার, যেখানে সে নিজে কেন্দ্রীয় কোনো চরিত্র নয়। তবুও সেখানে যেন সে কিছু দেখতে, ভাবতে, উদঘাটন করতে পারে।
শিশুর শৈশব নিয়ে প্রয়োজন সম্মিলিত সিদ্ধান্ত : আয়ারল্যান্ডের উপকূলীয় শহর গ্রেস্টোনসের উদ্যোগটা আসলেই অর্থবহ। 'ইট টেঙ্ আ ভিলেজ'— শিরোনামের এ আন্দোলনটা গুরুত্বপূর্ণও বটে।
প্রথমত : সেখানে শুধু কয়েকজন অভিভাবক নিজেদের সন্তানকে স্মার্টফোন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেননি। বরং অভিভাবক ও শিক্ষকরা মিলে শিশুদের জন্য প্রযুক্তি-মুক্ত শৈশবের পরিবেশ তৈরি করতে একটা যৌথ, সম্মিলিত সামাজিক উদ্যোগ ও নীতিমালা গ্রহণ করেছেন। একই কমিউনিটির পরিবারগুলো একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে কোনো একটা শিশুকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় না যে, 'আমার বন্ধুদের সবার ফোন আছে, শুধু আমার নেই।' অর্থাৎ বলা জরুরি, প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্তটা শুধু একটামাত্র পরিবারের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়। বরং এটা শিশুদের ঘিরে থাকা সমাজের প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠানের একটা সম্মিলিত সামাজিক সিদ্ধান্ত।
দ্বিতীয়ত : গ্রেস্টোনস শহরে ডিভাইস সরিয়ে দেওয়াকেই চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। শিশুদের খেলাধুলা, সামাজিকতা, স্থানীয় বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নেওয়া এবং প্রযুক্তির বাইরের সময় ও অভিজ্ঞতার সুযোগ তৈরি করার বিষয়টি নিয়েও পরিকল্পনা করা হয়েছে। কারণ শুধু ডিভাইস না থাকাটাই তো আসলে শৈশবের বিকল্প কোনো অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে না।
তাহলে শিশুকে ডিজিটাল অভিজ্ঞতা থেকে দূরে রাখতে চাইলে কি শুধু তার হাত থেকে ডিভাইস সরিয়ে দিলেই হবে? নাকি তার চারপাশের প্রযুক্তির বাইরের শৈশবটাকেও নতুন করে ভাবনায় নিতে হবে? আসলে স্মার্টফোন ব্যবহার করে, কি করে না, প্রশ্ন শুধু সেটাই নয়। স্মার্টফোন থেকে সরিয়ে নিয়ে তার পারিপার্শ্বিকতাকে আমরা ডিজিটাল মিডিয়ার বৈশিষ্ট্যের আলোকেই আবার তৈরি করে দিচ্ছি কি না, সেটা ভেবে দেখাটাই বরং গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক : সাংবাদিক ও লেখক
