প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা ও আস্থাও তৈরি করতে হবে

ড. লিপন মুস্তাফিজ

প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর উদ্যোগ সময়োপযোগী। কিউ আর কোডভিত্তিক লেনদেন এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একজন গ্রাহক মোবাইল ফোন ব্যবহার করে দোকান, রেস্তোরাঁ বা বিভিন্ন সেবার মূল্য পরিশোধ করতে পারবেন এতে লেনদেনের সময় ও খরচ কমবে, বাড়বে স্বচ্ছতা। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের জন্য কিউআর কোড হতে পারে সহজ ডিজিটাল লেনদেনের একটি কার্যকর মাধ্যম। তবে এখানে একটি মৌলিক বিষয় শুরুতেই বিবেচনায় নেওয়া জরুরি কিউআর কোড স্থাপন করা আর কিউআর কোডের ব্যবহার নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। একটি দোকানের সামনে কিউআর কোড ঝুলিয়ে দেওয়া হলো, ব্যাংক বা মোবাইল অ্যাপে স্ক্যান করার ব্যবস্থা করা হলো এতেই মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ডিজিটাল লেনদেনে অভ্যস্ত হয়ে যাবেন, এমনটি ভাবার কারণ নেই। প্রযুক্তি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রযুক্তি ব্যবহারে মানুষের সক্ষমতা, নিরাপত্তা ও আস্থা।

বাংলাদেশে এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ ডিজিটাল লেনদেনে পুরোপুরি অভ্যস্ত নন। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ, প্রযুক্তিতে অনভিজ্ঞ গ্রাহক, স্বল্পশিক্ষিত জনগোষ্ঠী এবং শহরের বাইরে বসবাসকারী মানুষের একটি অংশের কাছে কিউআর কোড এখনও নতুন বিষয়। তাদের অনেকেই জানেন না কোথা থেকে স্ক্যান করতে হবে, কীভাবে টাকা পাঠাতে হবে, টাকা পাঠানোর আগে কোনো তথ্য যাচাই করতে হবে কিংবা লেনদেনে সমস্যা হলে কোথায় অভিযোগ করতে হবে। অতএব, কিউআর কোডের প্রসার ঘটাতে হলে অবকাঠামো তৈরির পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে গ্রাহক প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। প্রথম দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের এ উদ্যোগে নেতৃত্ব দিতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংককে। শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেনের জন্য একটি অভিন্ন জাতীয় গ্রাহক সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। এ কর্মসূচির আওতায় কী শেখানো হবে, কীভাবে শেখানো হবে, মার্চেন্টের দায়িত্ব কী হবে, ব্যাংক ও মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব কী হবে এবং প্রতারণা হলে গ্রাহক কীভাবে সুরক্ষা পাবেন এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা উচিত। একই সঙ্গে কিউআর লেনদেনের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য সহজ ও কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। একজন গ্রাহক যেন সমস্যায় পড়ে ব্যাংক, মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস প্রতিষ্ঠান, মার্চেন্ট ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে ঘুরতে না থাকেন।

ব্যাংক ও মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস প্রতিষ্ঠানকে শুধু সেবা দিলেই চলবে না, এদের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা লাখ লাখ গ্রাহকের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে গ্রাহককে কিউ আর ব্যবহারে শেখানোর দায়িত্বও তাদের নিতে হবে। অ্যাপ খুললেই জটিল নির্দেশনা দেখানো যথেষ্ট নয়। নতুন ব্যবহারকারীর জন্য ধাপে ধাপে সহজ নির্দেশনা থাকতে হবে।

প্রয়োজনে ভিডিও, অডিও, বাংলা ভয়েস নির্দেশনা ও ছবিভিত্তিক গাইড তৈরি করা যেতে পারে। একজন গ্রাহক যখন প্রথমবার কিউ আর ব্যবহার করবেন, তখন অ্যাপ তাকে সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দিতে পারে স্ক্যান করুন? প্রাপকের নাম যাচাই করুন? টাকার পরিমাণ মিলিয়ে নিন? তারপর অনুমোদন দিন। এ চারটি ধাপ মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করা জরুরি। ব্যাংক ও মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের শাখা, এজেন্ট পয়েন্ট ও গ্রাহকসেবা কেন্দ্রে নিয়মিত কিউআর প্রশিক্ষণ বুথ চালু করতে পারে। সেখানে যে কোনো গ্রাহক কয়েক মিনিটে হাতে-কলমে শিখে নিতে পারবেন। মার্চেন্ট হবেন প্রথম সারির প্রশিক্ষক।

কিউআর ব্যবস্থার সবচেয়ে কার্যকর প্রচারক হতে পারেন দোকানদার নিজেই। কারণ গ্রাহক যখন টাকা দিতে দোকানে আসবেন, তখন তার প্রথম প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মানুষটি ব্যাংকের কর্মকর্তা নন দোকানদার। তাই কিউ আর গ্রহণকারী প্রতিটি মার্চেন্টকে ন্যূনতম গ্রাহক সহায়তা প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। তবে নিরাপত্তার বিষয়টি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মার্চেন্ট গ্রাহককে কীভাবে লেনদেন করতে হবে তা দেখাবেন, কিন্তু কখনোই গ্রাহকের পিন কোড, ওটিপি বা অন্য কোনো গোপন তথ্য জানতে বা ব্যবহার করতে পারবেন না। অর্থাৎ মার্চেন্ট হবেন প্রশিক্ষক; কিন্তু গ্রাহকের হয়ে লেনদেনকারী নন। প্রথম লেনদেনকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রথম অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমবার একজন গ্রাহক যদি সফলভাবে কিউ আর ব্যবহার করতে পারেন, তাহলে দ্বিতীয়বার তাকে শেখানোর প্রয়োজন হয় না। বিপরীতে প্রথমবার যদি তিনি ভুল করেন, বিভ্রান্ত হন বা টাকা নিয়ে সমস্যায় পড়েন, তাহলে তার মধ্যে ভয় তৈরি হতে পারে। তাই 'প্রথম কিউআর লেনদেনে সহায়তা' নামে একটি কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। বাজার, শপিংমল, হাসপাতাল, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, সরকারি সেবাকেন্দ্রসহ জনবহুল এলাকায় প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক বা সহায়তাকর্মী রাখা যেতে পারে। তারা গ্রাহকের হয়ে লেনদেন করবেন না; বরং গ্রাহককে নিজের হাতে লেনদেন করতে শেখাবেন।

বিশেষ করে বয়স্ক নাগরিকদের জন্য এ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যারা জানেন না, তাদের কীভাবে জানানো হবে? এ প্রশ্নের উত্তর হতে হবে বাস্তবভিত্তিক। সবাই স্মার্টফোন ব্যবহার করেন না, সবাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকেন না, আবার সবাই বিজ্ঞাপন দেখে প্রযুক্তি শেখেনও না। তাই সচেতনতার জন্য একাধিক মাধ্যম ব্যবহার করতে হবে। টেলিভিশন ও রেডিওতে সহজ ভাষার প্রচারণা চালানো যেতে পারে। বাজার ও দোকানে পোস্টার এবং স্টিকার লাগানো যেতে পারে। মোবাইলে এসএমএস ও ভয়েস মেসেজ পাঠানো যেতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছোট ভিডিও প্রচার করা যেতে পারে। গ্রাম ও প্রত্যন্ত এলাকায় স্থানীয় প্রশাসন, ইউনিয়ন পরিষদ, বাজার কমিটি ও কমিউনিটি সংগঠনকেও কাজে লাগানো যেতে পারে। যারা পড়তে পারেন না বা প্রযুক্তিগত লেখা বুঝতে অসুবিধা হয়, তাদের জন্য বাংলা ভয়েস নির্দেশনা ও ভিডিও টিউটোরিয়াল বেশি কার্যকর হতে পারে। কিউ আর শেখানোর সঙ্গে প্রতারণা প্রতিরোধও শেখাতে হবে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রতারণার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তাই কিউ আর প্রশিক্ষণকে শুধু 'কীভাবে টাকা পাঠাবেন' এ সীমায় রাখা যাবে না।

গ্রাহককে শেখাতে হবে, টাকা পাঠানোর আগে প্রাপকের নাম দেখতে হবে। অপরিচিত ব্যক্তির দেওয়া কিউ আর কোড স্ক্যান করা যাবে না। পিন কোড বা ওটিপি কাউকে বলা যাবে না। ফোনে কেউ ব্যাংক বা মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস প্রতিষ্ঠানের পরিচয় দিয়ে গোপন তথ্য চাইলে তা দেওয়া যাবে না। একটি সহজ বার্তা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে 'স্ক্যান করলেই টাকা দেবেন না, আগে নাম দেখুন।' এ একটি অভ্যাসই অনেক ভুল ও প্রতারণা ঠেকাতে পারে। ভুল লেনদেন হলে দ্রুত সমাধান চাই কিউ আর ব্যবস্থার প্রতি আস্থা তৈরির জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি।

একজন গ্রাহক ভুল করে টাকা পাঠালে বা টাকা কেটে গেলেও মার্চেন্টের হিসাবে না পৌঁছালে তাকে যেন অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে না হয়। প্রতিটি লেনদেনের জন্য পরিষ্কার রসিদ বা ডিজিটাল প্রমাণ থাকতে হবে। কোথায় অভিযোগ করতে হবে, কী তথ্য দিতে হবে এবং কত সময়ের মধ্যে সমাধান পাওয়ার কথা এসব গ্রাহককে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। ডিজিটাল লেনদেনের সাফল্য শুধু দ্রুত টাকা পাঠানোর মধ্যে নয়; ভুল হলে দ্রুত সমাধান পাওয়ার ব্যবস্থার মধ্যেও। প্রশিক্ষণের ফলাফলও পরিমাপ করতে হবে কত লাখ কিউ আর কোড বিতরণ বা স্থাপন করা হয়েছে এটি দিয়ে এ উদ্যোগের সাফল্য বিচার করা যাবে না। দেখতে হবে কতজন নতুন গ্রাহক প্রথমবার কিউ আর ব্যবহার করেছেন, তাদের কতজন নিয়মিত ব্যবহারকারী হয়েছেন এবং কোন বয়স বা শ্রেণির মানুষ বেশি সমস্যায় পড়ছেন। যে এলাকায় কিউআর আছে কিন্তু লেনদেন কম, সেখানে কারণ অনুসন্ধান করতে হবে। প্রয়োজনে সেখানে আবার প্রশিক্ষণ দিতে হবে। অর্থাৎ কিউ আর চালু করার পর 'কাজ শেষ' নয়, বরং 'কাজ শুরু' এ মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

কাউকে পেছনে রেখে ডিজিটাল অর্থনীতি নয়, কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেনের প্রসার একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হলেও এর প্রভাব হবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক। এর মাধ্যমে মানুষ দ্রুত, সহজ ও স্বচ্ছভাবে লেনদেন করতে পারবেন। কিন্তু এ সুবিধা তখনই অর্থবহ হবে, যখন সমাজের প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা মানুষটিও এর অংশ হতে পারবেন। তাই বাংলাদেশ ব্যাংককে নীতিগত নেতৃত্ব দিতে হবে, ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানকে প্রশিক্ষণ ও গ্রাহক সহায়তার দায়িত্ব নিতে হবে, মার্চেন্টকে প্রথম সারির সহায়ক হিসেবে তৈরি করতে হবে এবং সরকার ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচেতনতা কার্যক্রমে যুক্ত করতে হবে। সবশেষে মনে রাখতে হবে, কিউ আর কোডের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন অজ্ঞ গ্রাহককে বলা যাবে না 'আপনি জানেন না, তাই আপনার সমস্যা।' বরং ব্যবস্থা এমন হতে হবে, যাতে তিনি না জানলেও কেউ তাকে শেখান। কারণ একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল অর্থনীতি তখনই তৈরি হবে, যখন প্রযুক্তি মানুষের কাছে পৌঁছাবে শুধু মানুষকে প্রযুক্তির কাছে যেতে হবে না। কিউআর কোডের সফলতা তাই কতটি কোড স্থাপন হলো, তার ওপর নির্ভর করবে না; নির্ভর করবে কতজন মানুষ নিরাপদে, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এবং নিয়মিত তা ব্যবহার করতে পারছেন তার ওপর।

 

লেখক : ব্যাংকার, গবেষক এবং কলামিস্ট