হারিয়ে যাচ্ছে প্রবীণদের কষ্ট

মো. শামীম মিয়া

প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি স্বাধীন ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে প্রবীণ নাগরিকদের জীবনমান নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান নৈতিক দায়িত্ব। যে মানুষগুলো জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ব্যয় করেছেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁদের ন্যূনতম নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। অথচ বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর দিকে তাকালে বয়স্ক ভাতার নামে যা দেওয়া হয়, তাকে প্রবীণদের প্রতি একপ্রকার নির্মম পরিহাস ছাড়া আর কিছু বলা চলে না। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা মাসিক ৬০০ বা সামান্য বাড়িয়ে ৭০০ টাকা ভাতার পরিমাণ করার কথা তবুও প্রক্রিয়াধীন।

বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে শুধু অপ্রতুলই নয়, অনেক ক্ষেত্রে তা প্রবীণ মানুষের বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ। একজন মানুষের এক মাসের খাবার, ওষুধ, চিকিৎসা কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর খরচের তুলনায় এই অর্থ অত্যন্ত সামান্য। ফলে বয়স্ক ভাতা পেলেও একজন অসহায় প্রবীণের জীবনযাত্রায় খুব বেশি পরিবর্তন আসে না। বর্তমানের ঊর্ধ্বমুখী বাজারদরে চাল, ডাল, তেল, সবজি কিংবা অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একজন মানুষের চিকিৎসার প্রয়োজন সাধারণত বাড়ে। অনেক প্রবীণের নিয়মিত ওষুধ প্রয়োজন হয়। কারও উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা অন্যান্য বয়সজনিত সমস্যার জন্য প্রতিমাসে নির্দিষ্ট অর্থ ব্যয় করতে হয়। এমন বাস্তবতায় মাসিক কয়েকশ টাকা ভাতা দিয়ে তাঁদের জীবনযাত্রার ন্যূনতম প্রয়োজন পূরণ করা কতটা কঠিন, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

একজন বয়স্ক মানুষ হয়তো ভাতা পাওয়ার পর প্রথমেই ভাবেন— এ টাকা দিয়ে খাবার কিনবেন, নাকি ওষুধ কিনবেন? নিত্যপ্রয়োজনীয় কোনো একটি খরচ মেটাতে গিয়ে অন্য প্রয়োজনটি বাদ দিতে হয়। অনেকের সন্তান বা পরিবারের সদস্য থাকলেও তাদের নিজেদের আর্থিক সংকট থাকে। ফলে প্রবীণ বাবা-মা অনেক সময় সন্তানদের ওপরও বোঝা হয়ে যাওয়ার ভয় করেন। কেউ কেউ নিজের প্রয়োজনের কথা পর্যন্ত বলতে চান না। অথচ এই প্রবীণরাই তাঁদের জীবনের পুরোটা সময় শ্রম দিয়ে আজকের সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে অবদান রেখেছেন। কৃষক মাঠে কাজ করেছেন, শ্রমিক কারখানায় শ্রম দিয়েছেন, কেউ ব্যবসা করেছেন, কেউ শিক্ষকতা করেছেন, কেউ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন।

একজন মা সন্তানকে মানুষ করতে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। একজন বাবা পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়তে নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছেন। বয়সের শেষ পর্যায়ে এসে তাদের প্রাপ্য হওয়া উচিত সম্মান, নিরাপত্তা ও স্বস্তি—অনিশ্চয়তা নয়। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল প্রান্তিক, অসহায় ও কর্মক্ষমতাহীন মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা এবং তাদের অন্তত ন্যূনতম জীবনযাত্রার নিশ্চয়তা দেওয়া। কিন্তু ভাতার অর্থের পরিমাণ যদি বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে। শুধু উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; উপকারভোগীরা যে অর্থ পাচ্ছেন, সেটি তাদের জীবনে বাস্তব অর্থে কতটা সহায়তা করছে, সেটিও বিবেচনা করা জরুরি। এর পাশাপাশি রয়েছে আরও একটি বড় সমস্যা— মূল্যস্ফীতি। কয়েক বছর আগে যে অর্থ দিয়ে একজন মানুষ কিছু প্রয়োজন মেটাতে পারতেন, বর্তমানে একই অর্থ দিয়ে সেই প্রয়োজন মেটানো কঠিন। অথচ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সামাজিক নিরাপত্তার ভাতা নিয়মিত পুনর্নির্ধারণ করা না হলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর প্রকৃত মূল্য কমতে থাকে। কাগজে-কলমে ভাতা থাকলেও বাস্তবে তার ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। আর সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের নানা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও একের পর এক আলোচিত ইস্যুর ভিড়ে প্রবীণদের এই সমস্যাগুলো অনেক সময় হারিয়ে যায়। প্রতিদিন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন নতুন বিষয় সামনে আসে। কোনো একটি ইস্যু নিয়ে আলোচনা, বিতর্ক, আন্দোলন কিংবা পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যম সরগরম হয়ে ওঠে। কিছুদিন পর আবার নতুন কোনো ইস্যু সেই আলোচনার জায়গা দখল করে নেয়। এসব জাতীয় ও রাজনৈতিক ইস্যুর গুরুত্ব অবশ্যই আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো— এ ইস্যুগুলোর ভিড়ে সাধারণ মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলো কোথায়? একজন বৃদ্ধের ওষুধ কেনার টাকা নেই, একজন বৃদ্ধা ঠিকমতো খাবার পাচ্ছেন না, কেউ চিকিৎসার অভাবে কষ্ট করছেন—এসব বিষয় নিয়ে আমাদের আলোচনা কতটা? রাজনৈতিক বিতর্কের উত্তাপের মধ্যে প্রবীণদের নীরব কষ্ট যেন ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। একজন প্রবীণ মানুষ সাধারণত নিজের অধিকার নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাবি জানাতে পারেন না। তারা বড় কোনো আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন নিজেদের সমস্যার কথা তুলে ধরেন না। তাদের কষ্ট অনেকটাই নীরব। আর এই নীরবতার কারণেই হয়তো তাদের সমস্যাগুলোও অনেক সময় নীতিনির্ধারণী আলোচনায় যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।

এখানেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব আরও বেশি। যারা নিজেদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হতে পারেন না, তাদের অধিকার রক্ষা করার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। বয়স্ক ভাতাকে কোনো দয়া বা অনুদান হিসেবে নয়, বরং সামাজিক সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

সময় এসেছে এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে আসার। কেবল নামমাত্র উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে বা সামান্য কিছু টাকা বাড়িয়ে প্রবীণদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা সম্ভব নয়। দ্রব্যমূল্যের বর্তমান বাস্তবতা, খাদ্যব্যয়, চিকিৎসা ব্যয় ও ওষুধের মূল্য বিবেচনায় নিয়ে বয়স্ক ভাতার পরিমাণ সম্মানজনক অঙ্কে উন্নীত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভবিষ্যতে ভাতার পরিমাণ পুনর্নির্ধারণের একটি কার্যকর ব্যবস্থা থাকা দরকার। শুধু ভাতার পরিমাণ বাড়ালেই অবশ্য সব সমস্যার সমাধান হবে না। প্রকৃত অসহায় ও দরিদ্র মানুষ যেন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন, যোগ্য কেউ যেন বাদ না পড়েন এবং অযোগ্য কেউ যেন সুবিধা না নেন—এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে। ভাতা বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, সহজ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। প্রবীণদের হয়রানি কমিয়ে তাদের হাতে দ্রুত ও নিরাপদে অর্থ পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর কাছেও এ বিষয়ে প্রশ্ন থাকা উচিত। দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা যেমন জরুরি, তেমনি দেশের প্রবীণ নাগরিকদের বর্তমান নিয়েও আলোচনা জরুরি। রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে মতপার্থক্য থাকবে, বিতর্ক থাকবে, আন্দোলন থাকবে— এটাই গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক বাস্তবতা। কিন্তু এসবের কারণে যেন একজন অসহায় বৃদ্ধের জীবনসংগ্রাম আড়ালে চলে না যায়। একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু বড় বড় অবকাঠামো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা রাজনৈতিক সাফল্যের হিসাব দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। রাষ্ট্র তার সবচেয়ে দুর্বল ও অসহায় নাগরিকদের কতটা নিরাপত্তা দিতে পারছে, সেটিও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। জীবনের শেষ বয়সে একজন প্রবীণ যদি খাবার ও ওষুধের চিন্তায় রাত কাটান, তাহলে আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

 

লেখক : শিক্ষার্থী ফুলছড়ি সরকারি কলেজ

জুমারবাড়ী, সাঘাটা, গাইবান্ধা