কিশোরগঞ্জে সার সংকট ও উত্তরণে করণীয়
মো. শরীফুল ইসলাম
প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কিশোরগঞ্জ জেলায় প্রতি বছরে বিপুল পরিমাণে ধান চাষ করা হয়। বাংলাদেশের হাওরাঞ্চলের মধ্যে কিশোরগঞ্জ জেলা কে প্রবেশদ্বার বলা হয়। এ ছাড়াও দেশের সবচেয়ে নিচু জেলা হিসেবেও পরিচিত। হাওর অধ্যুষিত এই জেলায় মৌসুমে প্রায় ২,৭৭,৪১৬ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়। এ জেলার চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পর্যাপ্ত পরিমাণে ধান রপ্তানি করা হয়। ধান চাষে বিপুল পরিমাণ বিভিন্ন জাতের রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয়। তাই নির্ধারিত সময়ে জমিতে সার দেওয়া না হলে ধানের চারা স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। ফলে কৃষকদের সোনালী ধানের উৎপাদনের পরিমাণ আশঙ্কা জনকভাবে কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলাফল স্বরূপ এর প্রভাব পড়বে সারা দেশে।
কৃষক যদি ফসল উৎপাদন না করতে পারে তাহলে দেশে চরম খাদ্যের অভাব এবং আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ। এদেশের অর্থনীতির সিংহভাগই কৃষি থেকে আসে। একটি দেশ যখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে তখন সেই দেশ কারো উপর নির্ভরশীল থাকতে হবে না। সম্প্রতি, সার সংকটের কারণে কৃষকদের সোনালী ধান আজ চরম হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। যার ফলে কৃষকদের কে প্রতিনিয়ত হতাশা ও চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। অনেক কৃষক সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সারের ডিলারের সামনে লাইনে অপেক্ষা করেও নিত্য-প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছেন না। অনেকে শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরছে।
এখন কৃষকদের মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তারা সোনালী ধান এর আবাদ করতে পারবে? সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, রাতের আঁধারে ডিলারের কাছ থেকে দোকানে সার সরবরাহ হচ্ছে।
অথচ মাঠ পর্যায়ে কৃষক সার পাচ্ছে না। কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার যদি কৃষকের কাছে না পৌঁছে অন্য কোন সারের দোকানে চলে যায়। পরবর্তীতে সেই সার সিন্ডিকেট করে চরম মূল্যে বিক্রয় করা হয়। কাজেই প্রতিনিয়ত কৃষকের পরিশ্রম,অর্থ ও সময় নষ্ট হচ্ছে। কৃষকের মুখে হাসি নেই, হতাশা ও কষ্টে তারা জীবন যাপন করছে। অনেকে অন্যের জমি বর্গা এবং টাকা ঋণ নিয়ে প্রতিবছর চাষাবাদ করে থাকে। সাধারণ কৃষক তার শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে একদম নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত ?। সাধারণ মানুষ জীবিকার তাগিদে গ্রাম ছেড়ে শহরে পাড়ি দিচ্ছে। সাধারণ মানুষ শুধু গৃহহীন নয় বরং তাদের জীবন-জীবিকা প্রতিনিয়ত হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। বর্তমানে অনেক তরুণরা চাকরি করার পাশাপাশি কৃষিকাজ কে জীবিকার অন্যতম উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে বেঁচে নিয়েছে।
এখন সার সংকটের কারণে তরুণদের কৃষির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে। এখন জনমনে প্রশ্ন জাগে যে সার সংকটের কারণ কি? এই সংকটে সমাধান বা উত্তরণে করণীয় কি ? এই ভয়াবহ কৃষি পণ্য উৎপাদন বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে হলে বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। প্রথমত, গ্যাস সংকট নিরসন করতে হবে। কারণ গ্যাসের ঘাটতির কারণে দেশের সার কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই সার সংকট সৃষ্টি হচ্ছে।
এজন্য দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে সার উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যারা কৃত্তিম উপায়ে এই সংকট তৈরি করছে তাদের কে আইনের আওতায় আনতে হবে। তৃতীয়ত, মাছ চাষে বিপুল পরিমাণে রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয়। রাসায়নিক সারের ব্যবহারের মাত্রা কমাতে হবে। তাই রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসেবে সবুজ ঘাস, ধানের কাঁচা খড়,খুরা ও কুচুরিপানা ব্যবহার করা যেতে পারে। ফলে সার সংকট অনেকটা কমানো সম্ভব। চতুর্থত, মাঠ পর্যায়ে প্রকৃত কৃষকের হাতে নির্ধারিত সময় ও ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে।
পঞ্চমত, যারা সারের ডিলার তাদের বরাদ্দ ও বিক্রির হিসাব নিয়মিত তদারকি করা জরুরি। ষষ্ঠত, ডিলার বা গোডাউনের সামনে সার্বক্ষণিক সিসি ক্যামেরা দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সপ্তমত, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সার্বক্ষণিক টহল দিতে হবে। সর্বোপরি, প্রতিটি ক্ষেত্রে সকলের জবাবদিহিতা বাধ্যতামূলক নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি
